‘সেমিতে’ ধাক্কা খেলেন মোদী

টানা চার বছর ধরে ক্রমাগত সাফল্যের পর বড় ধাক্কা খেয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দল বিজেপি। গত মঙ্গলবার ঘোষিত পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফলে চরম বিপর্যয় দেখেছে দলটি। শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হিন্দি ভাষা-ভাষী রাজ্য রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে কংগ্রেসের কাছে হেরেছে তারা। তেলেঙ্গানা ও মিজোরামে জিতেছে স্থানীয় দুটি দল।  

তেলেঙ্গানা ও মিজোরাম বিজেপির জন্য ততটা দুশ্চিন্তার নয়, যতটা বাকি তিন রাজ্য। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড় ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোবলয় বা হিন্দি হার্টল্যান্ডের রাজ্য হিসেবে পরিচিত। ২০১৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই তিনটি রাজ্যেই কংগ্রেসকে ধরাশায়ী করেছিল বিজেপি। গঠন করেছিল রাজ্য সরকার। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এর ফল পেয়েছিল হাতেনাতে। গত লোকসভা নির্বাচনে এই তিন রাজ্যের ৬৫টি আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছিল ৬২টি আসনে। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করেছিল বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট। পাঁচ বছর পর এসে সেই তিন রাজ্যে এমন পরাজয় ভাবিয়ে তুলেছে বিজেপিকে। বড় কারণ হলো লোকসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস বাকি। তার আগে পাঁচ রাজ্যের এই নির্বাচনকে দেখা হচ্ছিলো সেমি-ফাইনাল হিসেবে। এই সেমিফাইনালের প্রতিফলন যে আগামী ফাইনাল নির্বাচনে থাকবে সেটা স্বীকার করছেন অনেক বিশ্লেষকই। এছাড়া এসব রাজ্যে হারের বার্তা হলো মোদীর বিজেপিও হারতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদীর বিজেপি যে অজেয় নয় সেটা এবারের নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এই ভোটের ফলে বিজেপি শিবিরে হতাশা নেমে এসেছে। হতাশা দেখা গেছে, বিজেপি জোটের শরিকদলের মধ্যেও। ফল প্রকাশের পর বিজেপিকে কটাক্ষ করেছে তাদের অন্যতম মিত্র শিবসেনা। দলটির মুখপাত্র সঞ্জয় রাউত বলেন, ভোটের ফলাফলের যা গতি-প্রকৃতি, তাতে বোঝা যায়, বিজেপির বিজয়রথ থেমেছে।

অন্য দিকে, এই পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে আবারো রাজনীতির মাঠে শক্তভাবে ফিরে এসেছে কংগ্রেস। হারতে হারতে পরাজয় মেনে নেওয়ার অভ্যাস করে ফেলেছিল দলটি। কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এখন দলটির নেতাকর্মীরা মনে করছেন, পরিস্থিতির বদল সম্ভব। কংগ্রেস ব্যর্থতা ঝেড়ে আস্থার সঙ্গেই লোকসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে। গত নির্বাচনের মতো মাত্র ৪৪টি আসন জয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না তারা। এই রাজ্যগুলোর ক্ষমতায় থাকা তাদের দলের সক্ষমতাও বাড়িয়ে দিবে। এ ছাড়া, লোকসভা নির্বাচনে আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে জোট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই জয়ে কংগ্রেসের জন্য আঞ্চলিক দলগুলোকে টানাও অনেক সহজ হবে। এ ছাড়া, এতদিন নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর তুলনা করাটা অসম্ভব মনে হতো। এই নির্বাচনে নিজের সক্ষমতাও প্রমাণ করেছেন রাহুল। একটা সময় যে কংগ্রেসকে মনে হয়েছে কোমায় চলে গেছে, তারা হঠাত্ করেই জেগে উঠেছে।

ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে হুট করেই বিপদে পড়ে গেলেন বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। বেশ কিছুদিন ধরেই বেকায়দায় আছেন তিনি। চলতি বছরে একের পর এক ধাক্কা সইতে হচ্ছে তাকে। বছরের শুরুতে দলিত সম্প্রদায়ের বিক্ষোভে কেঁপে উঠেছিল বিজেপি। উচ্চবর্ণের প্রতি দলটির একচোখা পক্ষপাতিত্বের তীব্র প্রতিবাদ হয়েছিল পুরো দেশে। কিছু এলাকায় দল বেঁধে অনেক দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ হিন্দু ধর্ম ত্যাগও করেছিলেন। বিক্ষোভের সেই আগুন এখনো ধিকি ধিকি জ্বলছে। গোরক্ষার নামে যে শুধু মুসলমানরাই হামলার শিকার হচ্ছে তাই নয়, দলিতদেরও নানা হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে। এই তত্পরতা ভারতের বেশির ভাগ মানুষই ভালোভাবে নেয়নি।

দলিতদের বিক্ষোভ সামলে ওঠার পর কোথায় মোদী একটু স্বস্তির শ্বাস ফেলবেন, তা না। পড়তে হলো রাফাল যুদ্ধবিমান কেনা নিয়ে ঝঞ্ঝাটে। এই বিতর্কে কংগ্রেসের তরফ থেকে উঠেছে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ। যদিও শেষ পর্যন্ত এ ঘটনায় বাঁচলেন মোদী। গত শুক্রবার ফ্রান্স থেকে ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান ক্রয়ের সরকারি সিদ্ধান্ত যাচাইয়ে তদন্তের দাবি খারিজ করে দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।

সিবিআই কাণ্ড নিয়েও কম পানি ঘোলা হয়নি। ভারতের অন্যতম প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (সিবিআই) দুই শীর্ষ কর্মকর্তার বিবাদ সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। নিজে কথা বলেও দুই শীর্ষ কর্তার পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ ও মামলা তদন্তের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো আটকাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকেই বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠায় সরকার। অভিযোগ উঠেছে, দলীয়করণের চূড়ান্ত প্রদর্শনী সাজিয়ে সিবিআইকে ধ্বংস করে দিয়েছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার।

এ দিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদত্যাগ করেছেন। অভিযোগ উঠছে যে, সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরেই পদত্যাগ করেছেন উরজিত প্যাটেল। এ ঘটনায় ভারতের ব্যাংক ও আর্থিক ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। যা মোদী সরকারকে আরো চাপে ফেলবে।

সমালোচক ও বিরোধীদের দাবি, একইভাবে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও প্রতিরক্ষা খাতেও রাজনৈতিক দলাদলি ঢোকাচ্ছে মোদীর সরকার। বিশ্লেষকেরা বলছেন, কৃষকদের অসন্তুষ্টিও কাল হয়েছে বিজেপির। কিছুদিন আগেই হাজার হাজার কৃষক দিল্লির পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিল করেছেন। বিজেপি তাদের আশ্বস্ত করতে চেয়েছিল শুকনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু বিজেপির চেয়ে কংগ্রেসেই আস্থা পেয়েছেন কৃষকেরা।

আগামী এপ্রিল-মে মাসেই লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। লোকসভা নির্বাচনে ঠিক হবে, কে বসবে দিল্লির মসনদে। রাজনীতির খেলায় কেউ হারে, কেউ জেতে। তবে সেমিফাইনালে জিতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই ফাইনালে এগিয়ে যায় জয়ী পক্ষ। নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল দেখে ধারণা করা হচ্ছে, সেমিফাইনালে হেরেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এবার মোদীর পিছিয়ে থেকে শুরু করার পালা।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, বিজেপির এই ভরাডুবি লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি কর্মীদের মনোবলে ধাক্কা দিতে পারে। যা শুধু এই তিন রাজ্যে সীমিত থাকবে না। গোটা বিজেপি বলয়ে সংক্রমণ ঘটতে পারে। সব মিলিয়ে লোকসভা নির্বাচনের আগে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছেন মোদী-অমিত শাহ।

দিল্লিতে লেখক-কলামিস্ট নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় বিবিসি’কে বলেন, ‘মোদী ম্যাজিক’ শেষ হতে চলেছে কি না এখনই বলা কঠিন, তবে পাঁচ রাজ্যের ফল বিজেপির জন্য অবশ্যই একটি অশনি সঙ্কেত। সবচেয়ে বড় কথা হলো ভারতীয় ভোটাররা এক নির্বাচনে কোনো দল বা রাজনীতিককে আলিঙ্গন করে কাছে টেনে নেয়, পরের নির্বাচনে তাদেরকে ভোট দিয়ে বের করে দেয়।