আবার আরব বসন্ত জাগ্রত দ্বারে?

সেই আরব বসন্তের কথা জানা আছে সবার। ২০১০ সালের শুরু থেকে আরব বিশ্বের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে যে আন্দোলনের সূচনা, তাকে সাংবাদিকেরা আখ্যা দিয়েছিলেন ‘আরব বসন্ত’। দীর্ঘ শীতকাল শেষে বসন্ত যেমন নতুন করে প্রকৃতিকে আলোড়িত করে, ঠিক তদ্রুপভাবে আরব বসন্ত সাড়া জাগিয়েছিল আরব বিশ্বে। আরব বিশ্বের একরকম চিরস্থায়ী সামন্তবাদের বিরুদ্ধে এ ছিল এক বিদ্রোহ ও বিপ্লব।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দেশে দেশে যে জাতীয়তাবাদের ঢেউ উত্থাপিত হয়, সেই ঢেউয়ে শাসক হিসেবে রাজতন্ত্রের পতন হলেও সমাজে সামন্ততন্ত্রের প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়ে যায়। সামন্তবাদের শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে আসে সামরিক স্বৈরতন্ত্র। ১৯৫২ সালে বিতাড়িত হন রাজা ফারুক। মিশরে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় জামাল আবদুন নাসেরের সামরিক স্বৈরতন্ত্র। ১৯৬৯ সালে বাদশাহ ইদ্রিসকে ক্ষমতাচ্যুত করে মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি লিবিয়ার শাসনভার গ্রহণ করেন। ১৯৬২ সালে ফরাসি উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয় আলজেরিয়া। কিন্তু জাতীয়তাবাদী নেতা বেন বেল্লাকে টিকতে দেয়নি সামরিক বাহিনী। সেই যে হুয়েরি বুমেদিয়েন ক্ষমতা দখল করেছিলেন, সেই ধারাবাহিকতায় আজও সামরিক বাহিনী সেখানে অধিষ্ঠিত। তিউনিশিয়ায় হাবিব বারগুইবা জনগণের দণ্ডমুণ্ডের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে বসেন। সুদানে স্বাধীনতার পর জাফর আল নিমেরির মতো সামরিক শাসকেরা অধিকাংশ সময় ক্ষমতা আঁকড়ে থেকেছেন। ইরাকে পঞ্চাশের দশকে কিশোর বাদশাহ ফয়সালকে হত্যা করে সমাজতন্ত্রী সামরিক নায়ক কর্নেল করিম কাশেম ক্ষমতা হাতিয়ে নিয়েছিলেন। রক্তপাত আর রক্তপাতের মধ্য দিয়ে সাদ্দাম হোসেন সেখানে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এখন যা কায়েম করেছে, তা সাদ্দামতন্ত্রের চেয়েও নিকৃষ্টতর। ইয়েমেনের উভয় অংশে স্বৈরতন্ত্র জেকে বসে। গৃহযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত সে দেশ। সৌদি আরব, জর্দান, কুয়েত, কাতার, আরব আমিরাত ও বাহরাইন—সর্বত্র রাজা-বাদশাহ, আমির-উমরাহ ও সুলতানদের একচ্ছত্র আধিপত্যের সামন্ততন্ত্র চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে বসেছে।

গোটা আরব বিশ্ব হয়ে উঠেছে যেন এক বিরাট বারুদাগার। দেশলাইয়ের একটি কাঠি সেখানে ঘটাতে পারে বিস্ফোরণ—যে কোনো সময়ে, যে কোনোখানে। তা-ই ঘটল তিউনিশিয়ায়। ২০১০ সালের শুরুতে সেখানে বাওয়াজিজি নামের এক যুবক নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে আত্মহত্যা করে। কারণ সেই বেকার যুবককে পুলিশ ফলের ফেরি করতেও বাধা দেয়। অনতিবিলম্বে সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে তিউনিশিয়ার জনপদে। সীমান্ত অতিক্রম করে সেই আগুনে ছারখার হয়ে যায় আরব বিশ্বের সবচেয়ে শক্ত স্বৈরতন্ত্রের প্রতিভূ হোসনি মোবারক। আগুনের সেই দাবানল এরপর গ্রাস করে লিবিয়া, ইয়েমেন ও সিরিয়াকে। সিরিয়া সেই রাষ্ট্র, যেখানে ২০০৩ সালে জ্বলে ওঠা আগুন এখনো দাউ দাউ করে জ্বলছে। শক্ত স্বৈরতন্ত্রের দেশ সৌদি আরব, কুয়েত ও আমিরাতে তরঙ্গায়িত হয়েছে আন্দোলন। আরব বিশ্বের প্রতিবেশী সোমালিয়া, মৌরিতানিয়া তথা আফ্রিকার অন্যত্রও রপ্তানি হয়েছে এই বিপ্লব। আরব বসন্তের সূচনার পর প্রায় দুই বছরে লিবিয়া, সিরিয়া, মিশর, তিউনিসিয়া, বাহরাইন ও ইয়েমেনের গন-আন্দোলনের কারণে মোট দেশজ উত্পাদনের ক্ষতি হয়েছে ২ হাজার ৫৬ কোটি ডলার। হিসাব পাশ্চাত্যের। আরব বসন্ত অবশেষে লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলাতে গিয়ে কোনো সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যাবে না। যে গণতন্ত্রের জন্য মিশরীয় জনগণ ঢেলে দিয়েছে নীল নদে অনেক রক্ত, সেখানে ফিরে এসেছে সামরিক স্বৈরতন্ত্র আরো নিকৃষ্ট অবয়বে। লিবিয়া গাদ্দাফি স্বৈরতন্ত্রের অধীনে যে সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল, তা তছনছ হয়েছে। দেশটি এখন বিভক্তি আর গৃহযুদ্ধের দাবানলে অনবরত জ্বলছে। প্রায় এক দশক অতিক্রান্ত হলেও কোনো আরব ভূমি স্থিতিশীলতা অর্জন করেনি। গণতন্ত্রও অর্জিত হয়নি। কিন্তু জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা অবদমিত হয়নি। যখনই যেখানে অগ্ন্যুত্পাতের সুযোগ ঘটছে, সেখানেই ঘটছে অঘটন। মানুষ সংগ্রাম করছে রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্র ও ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে।

এ বছরের প্রথমে আলজিরিয়ার্সের গণবিক্ষোভের কথাই ধরা যাক। বুত্ফালেকার পতন হয়েছে কয়েক মাস আগে। কিন্তু জনগণ আতঙ্কিত, স্বৈরতন্ত্রের কাঠামোতে আবার কোনো বুত্ফালেকা ফিরে না আসে। ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, এখন তারা সংগ্রাম করছে সামাজিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে। যেখানে সামরিকতন্ত্রের অবশেষ থাকবে না, প্রতিষ্ঠিত হবে নিরঙ্কুশ গণতন্ত্র। স্মরণ করা যেতে পারে যে দুই দশক আগে আলজেরিয়ায় প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত নিরপেক্ষ নির্ভেজাল নির্বাচনে ইসলামপন্থিরা নিরঙ্কুশ জয়লাভ করতে যাচ্ছিল। সামরিক বাহিনী সেই নির্বাচন বাতিল করে দেয়। এরপর দীর্ঘকাল ধরে আলজেরিয়ায় রক্তের বন্যা বয়েছে। সমাপ্তি ঘটেছে আবার স্বৈরতন্ত্রে। এখন আবার যাতে সামরিকতন্ত্র ফিরে না আসে, সে ব্যাপারে সতর্ক আন্দোলনকারীরা। গত বছরের ডিসেম্বরে সামরিক শাসক ওমর আল বশিরের বিরুদ্ধে সেখানে গণ-আন্দোলনের সূচনা ঘটে। সর্বত্র যা ঘটে, তার ব্যতিক্রম এখানে ঘটেনি। সামরিক বাহিনী দৃশ্যত উদ্ধারকারী হিসেবে অবতীর্ণ হয়। তারা ক্ষমতা গ্রহণ করে। কিন্তু জনগণ আগে যেহেতু শিক্ষা পেয়েছে—সামরিকতন্ত্রের বদলে সামরিকতন্ত্র নয়—গণতন্ত্রই লক্ষ্য। তাই কয়েক মাস ধরে জনগণ তাদের লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য ধাপে ধাপে আন্দোলনে এগিয়ে যায়। এখানে একটি তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হলো আন্দোলনে রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে সিভিল সোসাইটির নেতৃত্ব। অবশেষে সেখানে সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে গত আগস্টের ১৭ তারিখে ‘একটি সাংবিধানিক চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ভিত্তিতে দেশে যৌথ শাসন কায়েম হয়েছে। আগামী তিন বছর পর অনুষ্ঠিত হবে সাধারণ নির্বাচন।

এই সময়ে সবচেয়ে শক্ত আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে ইরাকে। অক্টোবরের প্রথম থেকে হাজার হাজার যুবক দুঃশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে। ইরাকের বড়ো বড়ো শহরে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। তারা প্রতিবাদ করছে অর্থনৈতিক দুর্দশার বিরুদ্ধে, প্রচণ্ড দলীয়করণ ও গোত্রীয়করণের বিরুদ্ধে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০১৮ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী ইরাক পৃথিবীর অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। ১৭৫টি দেশে পরিচালিত গবেষণার মধ্যে ইরাকের অবস্থান ১৬৮তম। বিক্ষোভকারীদের অধিকাংশ হচ্ছে যুবক। এদের মধ্যে শিয়া জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণই সর্বাধিক। তারা ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীকে সরকারি অর্থ লুটপাটের জন্য দায়ী করছে। তেলসমৃদ্ধ দেশটির তেলসম্পদ হাতিয়ে নিচ্ছে পশ্চিমা বিশ্ব। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে প্রতিষ্ঠিত সরকার। প্রতিষ্ঠিত শিয়া সরকারের বিরুদ্ধে শিয়া যুবকদের আন্দোলনকে অবশ্য অন্যভাবে ব্যাখ্যা করছে শিয়া ইরান। নিরপেক্ষ রাজনীতি বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এটি আসলে ইরাকি জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা তথা সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। যুবকেরা ইরাকের সার্বিক পরিবর্তন চায়। তারা কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্ব দ্বারা পরিচালিত নয়, বরং স্বাভাবিক ও সাধারণ নেতৃত্ব দ্বারা পরিচালিত। আলজেরিয়া, মিশর, লেবানন, মরক্কো ও সুদানের আন্দোলনগুলো দুর্নীতির মূলোত্পাটনের জন্য কাজ করছে। অক্টোবরের শুরুতে কথিত ইসলামি স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সফল নেতৃত্বদানকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওহাব আল সাদীকে প্রধানমন্ত্রী মাহাদি তার মর্যাদার নিচে পদায়ন করায় যুব ও জনগণ অসন্তোষ প্রকাশ করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা প্রধানমন্ত্রী মাহাদি সরকারের স্থিতিশীলতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। মিশরের সামরিক সরকার বিগত বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি নিষ্ঠুর ও নির্মম আচরণ করেছে।

লেবাননে সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হয়েছে। এতে দেশটির বড়ো শহরগুলোর রাস্তায় নেমে এসেছে লাখো মানুষ। অর্থনৈতিক সংকট ও ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য সরকারকে দায়ী করে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। হোয়াটস আপ ফোনকলের ওপর ট্যাক্স আরোপের সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এই বিক্ষোভের সূচনা। গত এক দশকে লেবাননে এত বড়ো গণ-আন্দোলন আর দেখা যায়নি। দ্রুতই সরকার ট্যাক্স আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। কিন্তু তাতে সাময়িকভাবে আন্দোলন হ্রাস পেলেও পরে সেটি সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে বড়ো হতে শুরু করে। আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রী সাদ আল হারিরির সরকারকে উত্খাত করতে চাইছে। এক্ষেত্রে লেবাননের মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে অভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট মাইকেল আউন টুইটারে এক ঘোষণায় অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের বিষয়ে আস্বস্ত করেছেন। যে আন্দোলন একটি সামান্য ব্যাপার নিয়ে শুরু হয়েছিল, তা এখন সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। এর ফলে আরব বসন্তের মূল আবেদনের রেশ এখানে লক্ষ করা যায়।

২২টি আরব দেশের মধ্যে ভাষাগত ও ধর্মীয় ঐক্য থাকলেও ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিরোধ প্রচুর। উপর্যুক্ত আন্দোলনগুলো ভিন্ন দেশে ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে পরিচালিত হলেও তার একটি সাধারণ আবেদন রয়েছে। আর সেটা হচ্ছে দীর্ঘকাল ধরে চাপিয়ে দেওয়া শোষণ ও ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ২০১০-১১ সালের আরব বসন্ত থেকে এই নতুন বসন্তের পার্থক্য এই যে আগেরটি ছিল আকস্মিক ও ব্যাপক। নতুন আরব বসন্ত সম্পর্কে সমাজতাত্ত্বিকদের ধারণা, এটি সমাজের গহিন-গভীরে প্রোথিত। এটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সুদূরপ্রসারী মনে হয়। কয়েক বছরের মধ্যে এটি একটি বাস্তব পরিণতির দিকে এগিয়ে যেতে পারে। কারণ অধিকাংশ আরব রাষ্ট্র যেমন স্বৈরাচার দ্বারা পরিচালিত, তেমনি দুর্নীতিগ্রস্ত। ‘দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্য থেকে যারা নিঃস্ব হয় এবং যখন কোনো শিক্ষিত ব্যক্তি কাজ পায় না, তখন তারা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে যেতে পারে এবং পরিবর্তন করতে পারে খুব দ্রুত।’ তবে এর মোকাবিলায় সামন্ত সামরিক চক্র স্বাভাবিকভাবেই শক্তি প্রয়োগ করে। সাময়িক কালের জন্য নিপীড়ন-নির্যাতনের কারণে আন্দোলন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। শাসকদের মনে রাখা উচিত যে একসময় শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা ফুরিয়ে যায়। জনতা জয়লাভ করে।

n লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়