বেশি কথা বলা চড়াই পাখি

শামীমা জাফরিন

চড়াই পাখির চঞ্চলতা মন্দ লাগে না। ফুড়ুত করে এই এখানে ওই ওখানে বসে কিচিরমিচির চিপচিপ করে ডাকাডাকি বেশ ভালোই লাগে সবার কাছে।

একটি ছোট চড়াই পাখির গল্প বলছি তোমাদের। যে পাখিটাকে সবাই খুব আদর করত, খুব পছন্দ করত—একটু বড়ো হওয়ার পর তাকে সবাই এড়িয়ে চলল।

চৌচালা টিনের ঘরের টুইয়ে খড়কুটা দিয়ে তৈরি বাসায় থাকে চড়াই পাখি। তারা চার ভাইবোন। ছোট চড়াই আর তার ভাইবোনেরা যখন বড়ো হলো তখন পুরনো বাসা ছেড়ে তার বাকি ভাইবোনেরা অন্য বাড়ি চলে গেল। আর তার মা-বাবা এ ঘরেরই অন্য কোথাও নতুন করে বাসা বেঁধেছে। সে পুরনো বাসার মায়া ছাড়তে পারেনি। জন্ম থেকে এতটুকু বড়ো হয়েছে এখানে। তাই সে এ বাসাতেই থেকে গেল। এই চড়াই পাখিটা ছিল খুবই সামাজিক। সমাজের সকল শ্রেণির পাখির সঙ্গে তার খুব জানাশোনা। মোটামুটি সবাই তাকে চেনে। সে যে বাসায় থাকে সে বাসার সব ছেলেমেয়ে তাকে পছন্দ করে। সকালবেলা তারা যখন ঘরের বারান্দায় পড়তে বসে বা কখনো বসে গল্প করে তখন সে বারান্দার পাশের রঙ্গন ফুলগাছে বসে চিপচিপ করে। কখনো লাফিয়ে বারান্দায় তাদের সামনে যায়, আবার ফুড়ুত করে উড়ে রঙ্গনগাছের ডালে গিয়ে বসে। কখনো বারান্দায় বসে মুড়ি খাওয়ার সময় ছেলেমেয়েরা তাকে মুড়ি ছিটিয়ে দেয়। সে মহানন্দে নেচে নেচে খায়।

এভাবেই বাড়ির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে চড়াই পাখির ভাব হয়ে যায়। সকালবেলা তাকে বারান্দায় কিংবা রঙ্গনগাছে না দেখলে কেউ না কেউ জিজ্ঞেস করবে চড়াইটার কথা। চড়াই পাড়ায়ও তার খুব কদর। ছোট-বড়ো সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক থাকার কারণে সবাই তার খবর রাখে।

দিন দিন তার পরিচিতির পালায় যোগ হয় পশুরাও। সেদিন ওদের বাড়ির কুকুরের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। এখন প্রায়ই কুকুর ও চড়াই খাবার ভাগ করে খায়। তারা দুজন পরস্পরের বন্ধু হয়ে গেল।

পরিচিতি বেড়ে যাওয়ায় চড়াই পাখির মনে কিছুটা বাহাদুরি ভাব দেখা দিল। স্বভাবটাও একটু বদলে যেতে লাগল। আজ এর এটা করে দেবে, কাল ওর ওটা করে দেবে—তার কাছে কোনো কাজই কঠিন নয়। সব সে বললেই হয়ে যায়। পাখিদের কোনো অসুবিধা হলে তা সমাধান করে দেওয়ার জন্যে সদাপ্রস্তুত থাকে।

প্রথম প্রথম কাজ হতো ঠিকই। যেখানে যায়, যার সঙ্গেই কথা বলে, সে এত বেশি বাড়িয়ে বলে যে, তার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ হয় কারো কারো। ইদানীং অনেকেই বিরক্ত হয় তার কথায়। সে কথা আরম্ভ করলে কোনো কোনো পাখি হয় মুখ গোমড়া করে রাখে কিংবা না-শোনার ভান করে, না হয় আস্তে করে তার থেকে উঠে চলে যায়।

পাখিদের মাসের কোনো এক মাসের পনেরো তারিখে শালিক পাখির নেতৃত্বে এবং চড়াই পাখির সভাপতিত্বে এক জরুরি সভা ডাকা হয়। সভায় চড়াইকে সভাপতি হিসেবে দেখে উপস্থিত সব পাখি চলে গেল। কারণ এ সভায় তার কথা শুনতে শুনতে সবার কান ঝালাপালা হতে পারে। তাই আগেভাগেই সবাই উঠে চলে গেল। ইদানীং তার কথার সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফিঙ্গে সবার কাছে চড়াই পাখির নামে কুত্সা রটিয়ে বেড়াচ্ছে। সে নাকি একদিন ময়না পাখিকে কী কাজ করে দেবে বলে ময়নার কাছ থেকে কলা খেয়েছে।

চড়াই পাখি আদৌ কলা খেয়েছে কি না—এ নিয়ে অন্যান্য পাখিদের মধ্যে আলাপ হচ্ছে। কোনো কোনো পাখি মন্তব্য করছে, সুসম্পর্কের কারণে সে হয়তো কলা খেয়েছে। এটা নিয়ে ফিঙ্গে আর ময়নার চড়াইয়ের নামে কুত্সা রটানো ঠিক হয়নি।

চড়াই যত বেশিই কথা বলুক না কেন, সে খারাপ তা ভাবা যায় না। এটা ফিঙ্গে ও ময়নার চড়াইয়ের প্রতি একধরনের হিংসেমি। তবে চড়াই পাখিটা বড়ো বেশি কথা বলে। তার এ বেশি কথা কেউ পছন্দ করছে না। অনেকে তাকে এড়িয়ে চলছে। তার অন্যান্য ভালো গুণ থাকা সত্ত্বেও বেশি কথা বলার কারণে সবাই তাকে সন্দেহের চোখে দেখছে, তাকে বাচাল বলছে।

কথাবার্তায় মার্জিত, শোভন ও পরিমিতিবোধ না থাকায়  চড়াই পাখিকে এ অবস্থায় পড়তে হয়েছে।

যারা বেশি কথা বলে তাদের কেউ পছন্দ করে না।