বিদায় কবি স্থপতি, স্বপ্নদ্রষ্টা

ফারুক মাহমুদ

জাতীয়তাবাদী চেতনা একটা রূপবৈশিষ্ট্য লাভ করে। সেই সময়ের পাকিস্তানি শাসকদের সীমাহীন শোষণ আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষের জেগে ওঠাটা ছিল ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি। শিল্প-সাহিত্যেও এই চেতনার প্রতিচ্ছাপ পড়ে। শুরু হয় নতুন চেতনার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ষাটের দশকের কবি-লেখকদের হাত দিয়ে এটা নতুন মাত্রা পায়। লক্ষ করার বিষয়, শিল্প-সাহিত্যে উচ্চকিত প্রকাশভঙ্গি থাকতে শুরু করেছে। এই প্রবণতাকে যাঁরা শিল্পময়তা দান করতে পেরেছেন, রবিউল হুসাইন তাঁদের অন্যতম

সবকিছু সহজ করে দেখার ও গ্রহণ করার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল রবিউল হুসাইনের। কত সংকট পার করেছেন সহজ আনন্দে। ব্যক্তিগত বেদনার বোঝা যতই ভারী হোক, বয়ে গেছেন নিজের মতো করে। কত কঠিন বিষয়কে দিয়েছেন সহজতার গৌরব। সব সমাজেরই প্রচল হচ্ছে—কুশল বিনিময়ের সময়ের প্রারম্ভে জিজ্ঞেস করা—‘কেমন আছেন?’ দেখা হলে বা টেলিফোনে কথা হলে রবিউল হুসাইন অর্থাত্ রবিদাকে এ কথাটি জিজ্ঞেস করা বারণ ছিল। কোনোদিন যদি অভ্যাসবশে জিজ্ঞেস করে ফেলতাম, উত্তর আসতো, আমি কখানো ভালো থাকি না। কেন এমন অদ্ভুত আচরণ! জানতে চাইলে বলতেন, ‘আমি ভালো থাকি না, এর অর্থ এই নয় যে, আমি সবসময় খারাপ থাকি। আমি একই সময় ভালো এবং মন্দ—দু’ অবস্থাতেই থাকি। কোনো মানুষ কখনোই নিরঙ্কুশ মন্দ বা ভালো থাকে না। এজন্যই আমি—‘ভালো আছেন’ এমন প্রশ্নের জবাব দিই না।’ রবিদার এমন দর্শনকথা আমরা সহজভাবেই মান্য করতাম। দর্শন এবং নির্মল আনন্দের বহু কথাই রবিদার ঠোঁটে-ঠোঁটে ফিরত।

‘স্থপতি’ এটা ছিল তাঁর পেশাগত পরিচয়। তিনি ছিলেন মূলত কবি। সমান্তরালে লিখেছেন প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্য। স্থাপত্যবিদ্যাকে তিনি শুধু গতানুগতিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। কথিত ‘রস-কষহীন’ এই বিষয়টিকে তিনি স্থাপন করেছিলেন সৃজনশীলতার বর্ণ ও রঙে। ফলে তার পেশাদারিত্বের বিষয়টি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয়ে উঠেছে শিল্পসম্ভারে পূর্ণ। ইট-পাথর-রড-সিমেন্টের স্থাপনা হয়ে গেছে নান্দনিক। বোধশক্তিহীন পাথুরে স্থাপনায় যেন ছায়া ফেলেছে নানা রঙের সৌন্দর্য, প্রাণময়তার আলো। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে আমাদের কবিতা ও স্থাপনা-নকশার জগতে একটা শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।

স্থাপনা নির্মাণ একটি বিজ্ঞানভিত্তিক কাজ। কিন্তু সৃজনশীলতার মাধ্যমে কোনো কোনো স্থাপনা যে শিল্প-সৌন্দর্যের আধার হয়ে ওঠে, রবিউল হুসাইনের অনেক কাজে এমন প্রমাণ মিলবে।

এই ‘স্থাপত্য শিল্পী’ পছন্দ করতেন ইটগাঁথুনির কাজ। তাঁর অধিকাংশ কাজে ইটের শিল্পময়তা লক্ষ করা যাবে। রবিউল হুসাইনের নকশা করা উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে—বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএআরসি) ভবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তি ও স্বাধীনতা তোরণ’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় গেইট, ভাসানী হল, বঙ্গবন্ধু হল, শেখ হাসিনা হল, খালেদা জিয়া হল, ওয়াজেদ মিয়া সায়েন্স কমপ্লেক্স, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটরিয়াম ও একাডেমিক ভবন কমপ্লেক্স ইত্যাদি। এসবের মধ্যে বিআরসি ভবন ছিল তাঁর অন্যতম প্রিয় স্থাপনা। তিনি লেখায়, বক্তৃতায়, সাক্ষাত্কার ও আলাপচারিতার এ প্রিয়তার কথা বলতেন। এসব স্থাপনায়, বহুবছর এই স্থপতির শিল্পবোধের স্বাক্ষর বহন করবে।

শৈশব থেকেই লেখালেখিতে যুক্ত হন। জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানলগ্ন কাগজে লিখলেও তাঁর লেখালেখির স্বস্তির জায়গা ছিল ‘ছোট কাগজ’। রবিউল হুসাইনের লেখালেখিতে বিষয়, প্রকরণে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রবণতা ছিল। বিচ্ছিন্নভাবে তিনি কোনো কোনো ছোট কাগজের সঙ্গে অদূরবর্তী সম্পর্কও রক্ষা করেছেন। একসময় তিনি ‘না’ গোষ্ঠী গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাজু চৌধুরী, কাজী শহিদ হাসান।

‘বিপুল প্রজ’ শব্দটি তাঁর লেখা সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও, এটা বলা যায় যে, তিনি নিরবছিন্নভাবে লেখা চালিয়ে গেছেন। তাঁর লেখালেখির পরিধিকাল ছোট নয়। কিন্তু একজন সচল লেখকের বইয়ের সংখ্যা মোটামুটি হয়। সেই বিবেচনায় তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তত বেশি নয়। এর অবশ্য কারণও আছে। তিনি লিখতে যতটা পছন্দ করতেন, বই বের করায় ছিলেন অমনোযোগী। অবশ্য পরিকল্পনা করে তথাগত কাজে তিনি মগ্ন থাকতে চাইতেন না। তাঁর লেখালেখিতে এর ছাপ পাওয়া যায়। নতুনত্বের অভিলাসী, বিশেষ করে অভিনবত্বে তাঁর আগ্রহ বেশি ছিল। গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে লিখতে চেয়েছেন, লিখেছেন, সন্তুষ্ট হলে তা প্রকাশ করেছেন।

সময়, প্রেক্ষাপট, পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রেই শিল্প-সাহিত্যে ছায়া ফেলে। শিল্পে মননের ব্যাপার থাকে, চিন্তা, কল্পনা, ইচ্ছার আলো-আঁধারি থাকে। তারপরও স্বকালের, অতীত-ভবিষ্যতের আনন্দ-যন্ত্রণাকে একেবারে উপক্ষো করা যায় না। এসব বিবেচনায় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ইতিহাসে ষাটের দশক বিশেষতা নিয়ে চিহ্নিত হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা একটা রূপবৈশিষ্ট্য লাভ করে। সেই সময়ের পাকিস্তানি শাসকদের সীমাহীন শোষণ আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষের জেগে ওঠাটা ছিল ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি। শিল্প-সাহিত্যেও এই চেতনার প্রতিচ্ছাপ পড়ে। শুরু হয় নতুন চেতনার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ষাটের দশকের কবি-লেখকদের হাত দিয়ে এটা নতুন মাত্রা পায়। লক্ষ করার বিষয়, শিল্প-সাহিত্যে উচ্চকিত প্রকাশভঙ্গি থাকতে শুরু করেছে। এই প্রবণতাকে যাঁরা শিল্পময়তা দান করতে পেরেছেন, রবিউল হুসাইন তাঁদের অন্যতম। স্লোগান দেওয়ার যত বিষয়কে তিনি কবিতার সৌন্দর্য দান করেছেন, কবিতা করে তুলেছেন অনেক বাঁকানো বিষয়কে। তাঁর কবিতা-স্রোত কখনো স্বচ্ছজলে ভেসেছে, ঘোলা জলেও আছে। তবে সেই স্রোতধারা বয়ে যেতে যেতে পৌঁছেছে ঘটনার মোহনায়, কোনো ডোবা চরের কাছে, ভাসা চরের পাশে। ওসব চরে সবুজের ছায়া মিলবে, বৃক্ষ দেখা যাবে, ফুল-পাখি-প্রজাপতিও বিরল নয়। পাঠের সহজতায় রবিউল হুসাইনের কবিতার মেজাজ চটজলদি ধরে ফেলা যায় না হয়তো। কিন্তু নিবিষ্টতা এবং অনুসন্ধানে কবিতার লালিত্য পাঠক ঠিকই আহরণ করবেন, এবং তখনই পাওয়া যাবে উত্কৃষ্ট কবিতা পাঠের আনন্দ। রবিউল হুসাইনের সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর বহন করছে তাঁর কাব্য, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, ছোটদের লেখা বইয়ে। ‘বাংলাদেশের স্থাপত্য সংস্কৃতি’ এই নামে তাঁর একটি চমত্কার গ্রন্থ রয়েছে। তিনি ছিলেন কৃতি শিল্পসমালোচক। জানি না এ বিষয়ে রবিউল হুসাইনের কোনো বই আছে কি না। থাকলে ভালো হতো। জানা যেত নিকট অতীত এবং সমকালের শিল্পভাষাটি।

আদর্শিক অবস্থান থেকে তিনি ছিলেন স্বচ্ছ এবং দৃঢ়। দেশের স্বাধীনতা, মৃক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় তিনি আপসহীন মানুষ। তাঁর পেশাগত সংগঠন ‘বাংলাদেশ স্থপতি পরিষদ’ ছাড়াও তিনি ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’, ‘বঙ্গবন্ধু জাদুঘর’, ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’, ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’, ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’, ‘কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা’ ইত্যাদি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় তাঁর সক্রিয় ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে আছে।

ঠুনকো আভিজাত্যের আড়াল ভেঙে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সহজবোধ্য, স্বচ্ছ এবং দৃঢ়চেতা মানুষ। মানুষ বুঝতেন, বুঝতেন মানুষের স্বপ্নপ্রাপ্তির আনন্দ এবং স্বপ্নভঙের বেদনা। সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এই শহরে এক ‘রঙিন মানুষ’। তাকে ঘিরে আমার স্মৃতিরেখাটি বেশ দীর্ঘ। রবিউল হুসাইনের কর্মস্থল ছিল গ্রিনরোডের জাহানারা গার্ডেন এলাকায়। কারণে-অকারণে কত শতবার গিয়েছি ওই অফিসে। ব্যস্ত মানুষ। কিন্তু আমাদের পেলে একেবারে নরম মাটি। আড্ডার পেছনে আড্ডা। একসময় আমি একটি নির্মাণপ্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। রবিউল হুসাইনের অফিসের কাছাকাছি ছিল ওই প্রকল্পএলাকা। আমি ছিলাম বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র। কাজ করতে হচ্ছে বাঘা বাঘা ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে। বিপদ আর বিপদ। ছুটে গেছি রবিদার কাছে। উপদেশ ভিক্ষা করেছি। তিনি সহাস্যে আমকে উপদেশ খয়রাত করেছেন। শুধু কৃতজ্ঞতা এই শব্দ ব্যবহারে সেই ঋণ শোধ হবে না।

পত্র-পত্রিকায় চাকরি করার সুবাদে আমাকে লেখকদের দ্বারস্থ হতে হতো। রবিউল হুসাইন ছিলেন আমার নির্ভরযোগ্য লেখক। যখনই যেই লেখা চেয়েছি পেয়েছি। বিমুখ করেননি কখনো। লেখক সম্মানী না দিতে পারায় কোনো কোনো লেখকের গালমন্দ শুনতে হয়েছে। কিন্তু রবিদা ছিলেন এ ব্যাপারে উদার। বলতেন, ‘যেই না লেখা এর জন্য আবার সম্মানী কী।’

অফিসকক্ষ তো কাজের জায়গা। ওটার একটা গত্বাধা বৈশিষ্ট্য থাকে। রবিদার অফিসটি ছিল অভিনব। বিরাট টেবিল। টেবিলের ওপর কাটা কম্পাস, সেট স্কয়ার, নানা ধরনের স্কেল, স্প্যাচুলা, ড্রাফটিং পেন, থ্রি বি, ফোর বি, ফাইব বি, সিক্স বি পেনসিল। এসব না হয় বুঝলাম নকশার করার জিনিস। কিন্তু দেয়ালজুড়ে যে বোর্ড, এতে ঘুড়ি টানানো কেন, কেন প্রজাপতির রঙিন পাখনা, কেন বিভিন্ন আকৃতির বাক্স, ভাঙা চিরুনি, সরা, নিমন্ত্রণপত্রের ছড়াছড়ি। এসব ছিল তাঁর খেয়ালি মনের বিনম্র খেয়াল।

বাঙালির গড় বয়সের তুলনায় রবিউল হুসাইনের চলে যাওয়াকে অকালপ্রয়াণ বলা যাবে না। তবে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু আমাদের ব্যথিত করেছে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ ছিলেন না, পোশাকে চলনে বলনে ছিলেন তারুণ্যদীপ্ত। তাঁর বেঁচে থাকা আরো দীর্ঘ হলে বাংলা কবিতা, সৃজনশীল স্থাপত্যশিল্প আরো সমৃদ্ধ হতো। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, থাকবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, চেতনা, স্মৃতি—রবিউল হুসাইনকে আমরা মনে রাখব। বাংলা কবিতা তাঁকে মনে রাখবে। কবি স্থপতি রবিউল হুসাইন, অনন্ত জীবনে আপনি ভালো থাকুন। প্রিয় রবিদা, তোমাকে শোকার্ত বিদায়।