সামাজিক অবক্ষয়ের ক্রান্তিলগ্নে

জাহান আরা রউফ

আমরা ভাবি—সত্যিকারের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা বলতে এখন কিছু নেই। মানুষ মানুষের জন্য—একথা যেন এখন অবিশ্বাস্য। তবে এটাও সত্যি যে, সমগ্র পৃথিবীজুড়েই বর্তমানে মানুষ এখন আত্মকেন্দ্রিক, ভোগবাদী এবং ভীষণ প্রতিযোগিতামুখী। কারো দিকে কারো খেয়াল করার সময় এখন নেই বললেই চলে।

সাপ যেমন গর্তে লুকিয়ে থেকে সুযোগ পেলেই ছোবল মারে, তেমনি এক শ্রেণির মানুষ অন্যের ক্ষতি করার জন্য, অন্যকে অপমান, অসম্মান করার জন্য সবসময় যেন মুখিয়ে থাকে। চলনে বলনে, কথাবার্তায় অপরকে অপদস্থ করাই যেন তাদের একমাত্র দুরভিসন্ধি থাকে। বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করার বদলে আরো দাবিয়ে রাখতে পারায় তাদের আনন্দ।

আমি বিশ্বাস করি—সরলভাবে, সহজভাবে, আড়ম্বরহীনভাবে পথ চললে সুযোগসন্ধানী, আত্মকেন্দ্রিক, সুবিধাবাদী, ভোগবাদী মানুষের কোপানল থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। তবে কে কোন দুরভিসন্ধি নিয়ে মন ভোলানো কথায় ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে, সে সম্পর্কে আমাদের কিছুটা হলেও উপলব্ধি থাকতে হবে। নয়তো আত্মসম্মান নিয়ে বর্তমান সামাজিক অবক্ষয়ের সময়ে টিকে থাকা কঠিন।

যাক, যা বলতে চাচ্ছি তা হলো এখনো কিন্তু আমাদের বর্তমান সামাজিক অবক্ষয় এবং নেতিবাচক দিকটা বাদ দিয়ে আমরা মাঝে মাঝে অফুরন্ত ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর সামাজিক মূল্যবোধের পরিচয় পাই।

এই তো সেদিন ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শুক্রবারে চারুকলা অনুষদের সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত হলো আমার লেখা ‘শিল্পী ও শিল্পকথা’ শীর্ষক গ্রন্থের প্রকাশনা উত্সব অনুষ্ঠান। সাহিত্যানুরাগী মুশতাক আহমেদ হেলালের সভাপতিত্বে একে একে বক্তব্য রাখলেন শিল্পী মামুন কায়সার, শিল্পী আবদুস সাত্তার, শিল্পী ফরিদা জামান, শিল্পী আবুল বারক আলভী ও শিল্পী সন্তু সাহা। আরো বক্তব্য রেখেছেন সাংবাদিক ও কলামিস্ট নাসিমা আরা হক মিনু। তাঁদের প্রাঞ্জল ভাষার আন্তরিক বক্তব্য দর্শক-শ্রোতা অভিভূত হয়ে উপভোগ করেছেন। সেই আবেগঘন মূহূর্তে আমার মনে হয়েছে দীর্ঘদিন এঁদের সঙ্গে আমার পথচলা সার্থক হয়েছে। নির্মল ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় আমি আপ্লুত হয়েছি। প্রবীণ এবং নবীন শিল্পীদের উপস্থিতি বিশেষ করে কালারস শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীদের নিজস্ব স্টাইলে উপস্থিতি আমাকে মুগ্ধ করেছে। সাধারণ দর্শক-শ্রোতার উপস্থিতিও আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।

একসময় চারুকলার পরিবেশ ছিল একটি বৃহত্ পরিবারের মতো। সবার প্রতি সবার যেন একটা অলিখিত দায়বদ্ধতা ছিল তখন! যাক, চারুকলা অনুষদ আমার একটি প্রিয় শিল্প-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। চারুকলার চত্বরে পা রাখলেই আমি কেমন যেন অভিভূত হয়ে পড়ি! সবার প্রিয় শিল্পী, শিল্পশিক্ষার গুরু শ্রদ্ধেয় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, শিল্পী কামরুল হাসান, শিল্পী আনোয়ারুল হক, শিল্পী শফিউদ্দিন আহমেদ, শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া, শিল্পী আমিনুল ইসলাম, শিল্পী আবদুর রাজ্জাক, শিল্পী জুনাবুল ইসলাম, শিল্পী কাজী আবদুল বাসেত, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, শিল্পী সমরজিত্ রায় চৌধুরী, শিল্পী মীর মোস্তফা আলী, শিল্পী রশীদ চৌধুরী, শিল্পী হাশেম খান, শিল্পী রফিকুন নবী, শিল্পী মাহমুদুল হক, শিল্পী মাহবুবুল আমীন, শিল্পী আবদুস শাকুর শাহ, শিল্পী মরণ চাঁদ পাল প্রমুখের অস্তিত্ব যেন আমার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে! জীবিত এবং মৃত সবার অস্তিত্বই যেন আমার চারপাশে মুক্ত হয়ে ওঠে! এতদিন পরেও তাঁদের সান্নিধ্য, তাঁদের সাহচর্য আমাকে উদ্বেলিত করে তোলে!

যা হোক, শ্রদ্ধা ভালোবাসা পেতে হলে অনেক সাধনা, মমত্ববোধ এবং সহনশীলতার প্রয়োজন। সমাজ থেকে ভালোবাসা শ্রদ্ধা একেবারে উধাও হয়ে গিয়েছে—একথা ভাবা বোধহয় ঠিক নয়। ভালোবাসা, শ্রদ্ধা সবসময়ই কমবেশি ছিল, আছে এবং থাকবে। নয়তো এই পৃথিবী চলবে কী করে!