বাবুল আনোয়ার
মানুষের কাছে, জীবনের কাছে, প্রিয় স্বদেশ, স্বজনের কাছে, কবিতার ভুবনে তিনি থাকতে চেয়েছিলেন নিবিড় বন্ধনে। হয়নি তা। জীবন বিমুখ করেছে। কিন্তু কবিতার পথ ধরেই তিনি রয়ে গেছেন নিজস্ব নির্মাণের ঐশ্বর্যময় ভুবনে। আবুল হাসান বাংলা কবিতার সমকাল পেরিয়ে তাই চিরকালীন, চিরায়ত ঐশ্বর্যময় কবি। কবিতার আলোকময় দিগন্তের উদ্বোধক। বেদনায় মথিত শিল্পের প্রতিভূ।
আবুল হাসান দহন ও দয়িতার কবি। মানবিক বোধ, প্রেম, প্রকৃতি, কষ্ট, অন্তর্গত অতল বেদনার আরেক নাম। অল্পসময় জুড়ে কবিতার ভুবনে ছিল তার বিচরণ। সে কথা মনে করে হূদয়ে বেদনাবোধ জাগে। সে বেদনা আরো প্রসারিত হয় কখনো কখনো। কবিতার উর্বর ভূমি কর্ষণের যথেষ্ট প্রতিভা, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দায় পালনের সে সুযোগ ও সময় না পাওয়ার কারণে। আবুল হাসানের প্রকাশিত, অপ্রকাশিত মিলে কবিতার সংখ্যা খুব কম নয়। এর মধ্য দিয়ে স্বমহিমায় বাংলা কবিতার ভুবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছেন। মাত্র ২৯ বছরের জীবনে তার সৃষ্টি পাঠক, গবেষকদের নানাভাবে দৃষ্টি কেড়েছে।
আবুল হাসানের প্রকাশিত কবিতার বই তিনটি। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘যে তুমি হরণ করো’ (১৯৭৪), তৃতীয় ও শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথক পালঙ্ক’ (১৯৭৫)। পৃথক পালঙ্কে শুয়ে শুভ্র কাফনে আবুল হাসান চিরদিনের মতো অনন্তলোকে পাড়ি দেন। এই অল্পসময়ে শব্দ, ছন্দ, আবেগ, অনুরাগ, আত্মগত উচ্চারণে যে ভূমি কর্ষিত হয়েছে, তার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এক বহমান নদী, যার নাম আবুল হাসান, অন্য নাম কবিতা। আবুল হাসানের কবিতা আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনিন্দ্য আখ্যান। আলোকিত ভোরের উদ্ভাস। কবি আবুল হাসান, কবিতার ব্যথিত যুবরাজ। জীবন ও কবিতা যেন তার একসূত্রে গাঁথা। তার কবিতার অনুষঙ্গ যেমন সমাজ, আন্দোলিত পরিবেশ, বিরুদ্ধ সময় তেমনি প্রেম, দুঃখবোধ, দুদর্শা, মানবিক আর্তি ও অন্তর্লোকের অবিচ্ছিন্ন দহন। তিনি দু’চোখ ভরে দেখেছেন, অনুভব করেছেন, বোধের দরোজা খুলে লিখেছেন। তাই সমকালীন জীবন, সমাজ, মানবিক আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে তার কবিতায় নির্লিপ্ত চেতনার অক্ষরে। এই নির্লিপ্ততার বুনন তার নিজস্ব। অন্তরের অন্তহীন বেদনার প্রকাশ। এর মধ্য দিয়ে আবুল হাসান নির্মাণ করেছেন কবিতায় স্বকীয় সত্তার এক নিজস্ব ভুবন। তৈরি করেছেন ‘পৃথক পালঙ্ক’ যেখানে তিনি একক অধীশ্বর। তার ব্যক্তিজীবন ও কবিতা অভিন্ন আর্তিতে হয়ে মূর্তমান হয়েছে। একই ধরনের সমস্যা, সম্ভাবনা একই বোধ, বিছিন্নতা দুই ভুবনকে একই সূত্রে বেঁধেছিল। তাই তার অনেক কবিতার প্রকাশ ঘটেছে আত্মজৈবনিক বাহনে। তিনি সরাসরি কবিতার আদলে নিজেকে তুলে ধরেছেন। কবিতার মধ্য দিয়ে নিজেই প্রকাশিত হয়েছেন বা নিজেকে প্রকাশ করার প্রয়াস চালিয়েছেন। এ এক অনন্য প্রকাশকৌশল। বাংলা কবিতায় এটিও আবুল হাসানের ভিন্নমাত্রার উপস্থাপন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘আবুল হাসান’-এ তার প্রতিফলন সহজেই লক্ষ করা যায়—
‘সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে,উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র,/মায়াবী করুণ/এটা সেই পাথরের নাম নাকি? এটা তাই?/এটা কি পাথর নাকি কোন নদী? উপগ্রহ? কোন রাজা?/ পৃথিবীর তিন ভাগ জলের সমান কারো কান্না ভেজা চোখ?/ মহাকাশে ছড়ানো ছয়টি তারা? তীব্র তীক্ষ তমোহর/কী অর্থ বহন করে এই সব মিলিত অক্ষর?’
আবুল হাসান অনেকটাই পৃথিবীর তিন ভাগ জলের সমান কান্নাভেজা চোখ যেন ধারণ করেছেন একাকী নিভৃতে। তা যতটা কবিতায় মূর্ত, তার চেয়েও বেশি অন্তর্লীন।
সামাজিক অস্থিরতা, হানাহানি, যুদ্ধজনিত হতাশায় তিনি আক্রান্ত হয়েছেন সবসময়। কবিতায় তার প্রতিধ্বনি ঘটেছে। তিনি শুধু নিজেকে আবিষ্কার করেছেন এর মাঝে তা নয়, অন্যদেরও মর্মবেদনাকেও ধারণ করেছেন সমানভাবে।
যেমন :
মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবেনা আমি তাই নিরপেক্ষ মানুষের কাছে,
কবিদের সুধী সমাবেশে/ আমার মৃত্যুর আগে বোলে যেতে চাই,/ সুধীবৃন্দ ক্ষান্ত হোন, গোলাপ ফুলের মতো শান্ত হোন/ কি লাভ যুদ্ধ কোরে? শত্রুতায় কী লাভ বলুন?
... ... ...
মানুষ চাঁদে গেল, আমি ভালোবাসা পেলুম
পৃথিবীতে তবু হানাহানি থামলো না
পৃথিবীতে তবু আমার মতোন কেউ রাত জেগে নুলো ভিখিরীর গান, দারিদ্র্যের এতো
অভিমান দেখলো না! (জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন, রাজা যায় রাজা আসে)
আবুল হাসান একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছেন। ত্রিশ লাখ মানুষ শহিদ হয়েছেন এ যুদ্ধে, দু’ লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন। অনেক ত্যাগ, অনেক বিনিদ্র রাতের বিনিময়ে বিজয় এসেছে। যারা হারিয়েছেন প্রিয়জন, সে ক্ষত তো আর পূর্ণ হবার নয়। স্বাধীনতার মহান অর্জনের মধ্য দিয়ে তাদের আত্মদান মহিমান্বিত হয়েছে। আবুল হাসান লাখো শহিদের উত্সর্গকৃত এ মহিমাকে নিজের বেদনাবোধ ও চেতনায় ধারণ করেছেন অসাধারণ শৈল্পিক বিন্যাসে—
লক্ষ্মী বউটিকে/ আমি আর কোথাও দেখি না,/ হাঁটি হাঁটি শিশুটিকে কোথাও দেখি না;/ কতগুলি রাজহাঁস দেখি,
... ... ...
ছোট ভাইটিকে আমি/ কোথাও দেখি না,
নরোম নোলক পরা বোনটিকে
আজ আর কোথাও দেখি না।
... ... ...
তবে কি আমার ভাই আজ/ ঐ স্বাধীন পতাকা?/ তবে কি আমার বোন, তিমিরের বেদীতে উত্সব?/
(উচ্চারণগুলি শোকের, রাজা যায় রাজা আসে)।
আবুল হাসান সমকালীন সামজিক পরিবেশ, রাজনীতির উত্তাল দিন, স্বাধিকার আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাপরবর্তী মানুষের না পাওয়ার ক্ষোভ, বিরূপ বিছিন্নতা প্রত্যক্ষ করেছেন গভীরভাবে। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, স্বদেশপ্রেম তাকে উদ্বেলিত করেছে, মননশীলতা ও হূদয়ের দুর্নিবার আবেগে। এর প্রকাশ ঘটেছে তার কবিতায় অতল, অজর, অভিমানী শব্দের আশ্রয়ে। এখানেই তিনি প্রকাশিত, ধ্বনিত, প্রজ্জ্বলিত নিজস্ব বোধের উজ্জ্বলতায়। তার ক্ষোভ, প্রতিবাদ, দুর্নিবার ও তীব্র ভাষায় উচ্চারিত হয়নি সেভাবে, প্রকাশিত হয়েছে অনন্য শাব্দিক শিল্পের পরিভাষায়। এ নাজুকতা, এ বিনম্র স্বভাব তার কবিতায় নির্মাণ করেছে এক ভিন্ন অবয়ব, আবুল হাসানের কবিতার নির্মিত নিজস্ব ভুবন।
যেমন :
দালান উঠছে তাও রাজনীতি, দালান ভাঙছে
তাও রাজনীত,/ দেবদারু কেটে নিচ্ছে নরোম কুঠার তাও রাজনীতি,
... ... ...
বেদনার বিষবাষ্পে জর্জরিত এখন সবার
চতুর্দিকে খাঁ, খাঁ, খল,/ তীব্র এক বেদেনির
সাপ খেলা দেখছি আমি; রাজনীতির তাও কি রাজনীতি?/ (অসভ্য দর্শন, রাজা যায় রাজা আসে)
অথবা
আমি আলোর ভিতরে শুধু ধ্বংস, হাড় হিপণ্ড, রোদনের স্রোত দেখে
এসেছি তোমার কাছে ফিরে ফিরে হে পাবক, অগ্নিশিখা হে তীব্র তামস
(শিকড়ে টান পড়তেই, রাজা যায় রাজা আসে)
আবুল হাসানের কবিতায় নারী, নিসর্গ, নির্জনতা ও কষ্টের ভার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নারীকে তিনি দেখেছেন প্রণয়ের সারথি, নিবিড় আশ্রয় ও প্রশ্রয়ের নির্ভশীলতার আধার হিসেবে। তার নিঃসঙ্গ, বেদনার্ত মনের নিবিষ্ট ঠিকানা হিসেবে। এখানেও তার সে চাওয়া প্রশ্নাতীতভাবে অপ্রাপ্তির বিবরে হারিয়ে গেছে। কবির এই অসহায়ত্ব কবিতার শরীরে কষ্টের অন্তর্গত অবলম্বনে উন্মোচিত হয়েছে। খুব সহজেই তার কবিতায় এ বিষয়গুলো প্রতিধ্বনিত, পরস্ফুিটিত হয়েছে শব্দের অতল ব্যঞ্জনায়—
‘যখোন আমরা শীতে গলাবন্ধে পশমী চাদর জড়িয়েছি/ কিশোরীর কামরাঙা কেড়ে নিয়ে দাঁত বসিয়েছি/ সেই সুখ পশমী চাদরে ছিল, কামরাঙা কিশোরীতে ছিল!’
(সেই সুখ, রাজা যায় রাজা আসে)।
অথবা
‘প্রিয়তম পাতাগুলি ঝরে যাবে মনেও রাখবে
না/ আমি কে ছিলাম, কি ছিলাম, সঙ্ঘমিত্রা
নাকি সূদূর/ সভ্যতাসন্ধির রাণী, অন্য কোন
অশোকের বোন,...’ (সেই মানবীয় কণ্ঠ, যে তুমি হরণ করো)
‘তোমার চিবুক ছোঁব, কালিমা ছোঁব না’ কবিতায় একই ধরনের অভিব্যক্তির প্রকাশ লক্ষ করা যায়; তোমার চিবুকে সেই গাভীর দুধের শাদা, সুবর্ণ রাখাল/ তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই কাছে আয় তৃণভূমি/ কাছে আয় পুরনো রাখাল!/ আমি কাছে যাবো আমি তোমার চিবুক ছোঁব, কালিমা ছোঁব না!’ (যে তুমি হরণ করো)।
‘রাজা যায় রাজা আসে’ এবং ‘যে তুমি হরণ করো’ কাব্যগ্রন্থ দুটির কবিতাগুলো পারস্পরিক ধারাবাহিকতার নিগঢ়ে। তবে শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথক পালঙ্ক’তে তিনি অনেকটা ঋদ্ধ ও পরিণত, বোধে আরো উজ্জ্বল। এখানে তিনি নিঃসীম ও নিগূঢ় অনুভবের নতুন দরোজা উন্মোচন করেন, নবতর ব্যাপ্তিতে। তবে বিষয়ের দিক থেকে সেই কষ্ট ও দহনের প্রকাশ আগের মতোই অনেকটা। তবে ‘পৃথক পালঙ্ক’তে এ জীবন ও জগতের প্রতি তার অকুণ্ঠ ভালোবাসা, মমত্ববোধ উচ্চকিত হয়েছে অত্যন্ত মানবিক আকুতিভরে। এ আকুতি পাঠকদেরও সমানভাবে স্পর্শ করে ব্যাকুল বেদনায়। সম্ভত আবুল হাসানের কবিতার জনপ্রিয়তা ও অধিকতর অনুরণনের অন্যতম প্রধান কারণ এটি।
যেমন—
‘হারানো পারের ঘাটে জেলে ডিঙ্গি, জাল তোলা কুচো মাছে/ কাঁচালী সৌরভ— শোনো/ সেখানে সংগুপ্ত এক নদীর নির্মল ব্রীজে/ বিশুদ্ধির বিরল উত্থানের মধ্যে আমি আছি...’
(নচিকেতা)
ভালোবাসার জন্য, একটি একান্ত নিবিড় নির্ভরতার জন্য, হূদয়ের দরোজা খুলে না বলা কথাগুলো বলার জন্য, অসুস্থ শরীরে কোমল স্পর্শের জন্য তিনি ব্যাকুল ছিলেন। তা অধরাই থেকে গেছে তার জীবনে। আর এ অনুভূতি, বেদনার্ত হাহাকারে মূর্তমান হয়েছে তার সৃষ্টি। তার কবিতা তাই সহজেই পাঠককে আপ্লুত করে। স্পর্শ করে হূদয়, ভাবিয়ে তোলে, বেদনায় আক্রান্ত করে, সহমর্মিতায় হূদয় করে ভারাক্রান্ত।
‘অসুখ আমার অমৃতের একগুচ্ছ অহঙ্কার!
আত্মার অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা ক্ষুধিত জানোয়ারের
রোমশ বলশালী শরীরের দুটি সূর্যসমান রক্তচক্ষু!
যা দেখে ঈশ্বর পর্যন্ত ভয়ে, ভয়াল হিমে শয্যাদায়গ্রস্ত হন!’
(অসুখ, পৃথক পালঙ্ক)
মানুষের কাছে, জীবনের কাছে, প্রিয় স্বদেশ, স্বজনের কাছে, কবিতার ভুবনে তিনি থাকতে চেয়েছিলেন নিবিড় বন্ধনে। হয়নি তা। জীবন বিমুখ করেছে। কিন্তু কবিতার পথ ধরেই তিনি রয়ে গেছেন নিজস্ব নির্মাণের ঐশ্বর্যময় ভুবনে। আবুল হাসান বাংলা কবিতার সমকাল পেরিয়ে তাই চিরকালীন, চিরায়ত ঐশ্বর্যময় কবি। কবিতার আলোকময় দিগন্তের উদ্বোধক। বেদনায় মথিত শিল্পের প্রতিভূ।