রসুলুল্লাহর (স) আখলাক মুবারক

শাহ্ মুহাম্মাদ আহ্সানুজ্জামান

 

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তার হাবিব সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যেমনিভাবে সব দিক থেকে অনন্য করে তৈরি করেছেন ঠিক তদ্রুপ তার আখলাক মুবারককেও অনন্য করে রেখেছেন। তার মহান চরিত্র মাধুর্যকে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কালামে মাজিদে খুলুক্বে ‘আজীম’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার সেসব মহান চরিত্র মাধুর্যের সামান্য কিছু নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও ক্ষমাগুণ

রাসুলে আকরাম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উহুদের যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ও কঠিনতম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। কাফেররা তার মোকাবিলা করেছে, তার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে, কঠিনতম দুঃখ-যন্ত্রণা প্রদান করেছে। প্রচণ্ড নির্যাতন ভোগ করা সত্ত্বেও তিনি যে শুধু ধৈর্য ধারণ ও তাদের ক্ষমা করেছিলেন তাই নয় বরং তাদের প্রতি করুণা প্রদর্শন করেছেন। তাদের ভালোবাসায় অন্তর বিগলিত করে দিয়েছেন। তাদের মূর্খতা ও জুলুমবাজিকে হাসিমুখে বরণ করেছেন। এদের অক্ষম হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। হূদয় নিংড়ানো ভালোবাসার প্রসবণ থেকে উথলে উঠেছে মহান দোয়ার অমীয় বাণী, ‘হে আল্লাহ আপনি আমার কওমকে হেদায়াত করুন। এরা অবুঝ। এরা অজ্ঞ।’

রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষমাশীলতার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত লবিদ ইবনুল আ-সাম ইয়াহুদির ঘটনা, যে তাকে জাদু করেছিল এবং খায়বরের ঐ ইয়াহুদি নারীর ঘটনা, যে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিষমিশ্রিত বকরির রান খাইয়েছিল। দয়াল নবি তাদেরকে নির্দ্বিধায় ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

এ রকম অন্য আরেক দিনের ঘটনা, রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চক্ষু মুদ্রিত অবস্থায় কাইলুলা করছিলেন। হঠাত্ চোখ খুলে দেখতে পেলেন, এক আরব বেদুইন তার শির মুবারকের ওপর তরবারি উত্তোলন করে দাঁড়িয়ে আছে। বেদুইনটি বলল, ‘এখন আপনাকে আমার এ তরবারির আঘাত থেকে কে রক্ষা করবে? কে আপনার হেফাজত করবে?’ রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন হলেন না। শান্ত গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘আল্লাহ।’ ব্যস, এতটুকুই কথা। বেদুইনটির হাত কেঁপে উঠল। ঝন ঝন শব্দে তরবারি মাটিতে পড়ে গেল। রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তরবারিটি তুলে নিলেন। স্বাভাবিক স্বরে বললেন, ‘এখন তোমাকে কে বাঁচাবে?’ বেদুইনটি কেঁপে উঠল। তার সমস্ত শরীর থর থর করে কাঁপতে লাগল। দয়ার সাগর রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিশোধ নেবেন, তা কি হতে পারে? তিনি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে হেসে তাকে সান্ত্বনা দিলেন। মাফ করে দিলেন অনুতপ্ত আরব বেদুইনকে। এরপর লোকটি তার কওমের লোকদের কাছে গিয়ে বলতে লাগল, ‘ওহে! তোমরা শোন। আজ আমি সর্বোত্তম এক মহান ব্যক্তির কাছ থেকে এসেছি।’

আরেক দিনের ঘটনা, সাহাবায়ে কিরাম একটি লোককে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে এসে বললেন, ইয়া রসুলাল্লাহ! সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটি আপনার দুশমন। তার অভিপ্রায়, সুযোগ পেলে আপনাকে হত্যা করবে। আল্লাহর হাবিব ইরশাদ করলেন, ‘কোন চিন্তা করো না।’ তারপর লোকটিকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘তুমি যদি আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে এসে থাকো, তবে জেন তা সম্ভব হবে না। তুমি আমার ওপর সফল হতে পারবে না।’

এমনকি তার ক্ষমাগুণের প্রাবল্য এত অধিক ছিল যে, রইসুল মুনাফিকিন আবদুল্লাহ ইবনু উবাইয়ের পুত্রকে যিনি এক জন খালেস মুসলমান ছিলেন, হুকুম দিয়েছিলেন তার পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার জন্য। এ আবদুল্লাহ ইবনু উবাইয়ের যখন মৃত্যু হলো, রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় জামাখানা দেহ মুবারক থেকে খুলে তার কাফন বানিয়ে দিলেন এবং তার জানাজার নামাজ পড়ার জন্য এরাদা করলেন।

বিনয়, শিষ্ঠাচার ও সদাচরণ:

রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ বিনয়ী। তিনি সাহাবিগণকে বলতেন, তোমরা আমার প্রশংসা ও গুণকীর্তনে অতিরঞ্জিত করো না। যেমন নাসারা সম্প্রদায় হযরত ঈসা ইবনু মারইয়াম (আ)কে আল্লাহর পুত্র হিসেবে আখ্যায়িত করত। পূর্ণ ফজল ও কামাল অর্জন করা সত্ত্বেও আমি আল্লাহর বান্দা-ই। তাই তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা ও আল্লাহর রাসুল বলো।

তার বিনয়ের প্রকৃতি এমন ছিল যে, তিনি খাদেমগণকেও ধমকের সুরে কিছু বলতেন না। কটু কথাও বলতেন না। এমনকি এমনো বলতেন না যে, কেন এমন করেছ? বা এমন করোনি কেন? পরিবার পরিজনের প্রতি তিনি যেরূপ মেহেরবানি করতেন তার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে নেই।

হযরত ‘আয়িশা সিদ্দিকা (রা) বর্ণনা করেছেন, রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ ছাড়া কখনো কাউকে হাত দ্বারা প্রহার করেননি। যখন তিনি ঘরে তাশরিফ আনতেন তখন তিনি সর্বাধিক মিষ্টি ভাষি, হাসি খুশি ও মৃদু হাসির লোক ছিলেন। তার বিনয়ের ধরন এমন ছিল যে, সাহাবাগণের সঙ্গে উপবেশনকালে তাদের সামনে তিনি কদম মুবারক লম্বা করে রয়েছেন এমন কখনো কেউ দেখেননি। সাহাবায়ে কিরাম অথবা পরিবারপরিজনের ভেতরে কেউ যদি কখনো তাকে সম্বোধন করতেন, তখন তিনি ‘লাব্বাইক’ বলে জবাব দিতেন।

তিনি সব গোত্রের সরদারগণকে সম্মান করতেন এবং তাদের গোত্রের বিচারক নিযুক্ত করতেন। সাহাবায়ে কেরামকে কোন অবস্থায় আছে তার খোঁজখবর নিতেন। তিনি তার সাথী-সহচর সবার প্রতি সমান নজর দিতেন, সমানভাবে গুরুত্ব দিতেন। মজলিসের অধিকার সবাইকেই সমানভাবে প্রদান করতেন। তার কাছে উপস্থিত বা খেদমতে অবস্থানকারী কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় প্রস্থান না করা পর্যন্ত তিনি উঠতেন না। কেউ হাত মুবারক চেপে ধরলে, তিনি হাত নরম করে ছেড়ে দিতেন। যতক্ষণ না সে স্বেচ্ছায় হাত ছাড়ত, ততক্ষণ স্বীয় হস্ত মুবারককে তার হস্ত বন্ধন থেকে সরিয়ে নিতেন না।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তার হাবিব সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আখলাক মুবারকের অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন! ছুম্মা আমিন!! বিহুরমাতি সাইয়্যিদিল মুরসালিন।

 লেখক :গদ্দিনেশীন পির সাহেব, মশুরিখোলা দরবার শরীফ, নারিন্দা, ঢাকা