ওসি মোয়াজ্জেমকে আট বছরের জেল

যৌন হয়রানির শিকার ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির বক্তব্যের ভিডিও ধারণ ও প্রচারের দায়ে বরখাস্তকৃত ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দুটি ধারায় আট বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে তাকে ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরো এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতি-বার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক আসসামছ        জগলুল হোসেন জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। এ রায়ের মধ্য দিয়ে এই আইনে দায়েরকৃত মামলায় সরকারি কোনো কর্মচারীর প্রথম কারাদণ্ড হলো। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ভিডিও ধারণের সময় বারবার দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলেন নুসরাত। এতে প্রমাণিত হয় তার অনুমতি ছাড়াই ঐ ভিডিওটি করা হয়েছিল। কারো অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ ও প্রচার করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া নুসরাতের বক্তব্যের ভিডিও করার সময় ওসি মোয়াজ্জেম যেসব বিব্রতকর প্রশ্ন করেছিলেন তাতে তাকে আরেকবার শ্লীতাহানির শিকার হতে হয়েছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ। কিন্তু পদে থেকে যথাযথ দায়িত্ব পালনে ওসি মোয়াজ্জেম পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। এ কারণে তাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৬ ধারায় (অনুমতি ব্যতীত পরিচিতি তথ্য সংগ্রহ, ব্যবহার, ইত্যাদির দণ্ড) পাঁচ বছর ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরো ছয় মাস এবং নুসরাত অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পর ঐ ভিডিওটি প্রচার করায় ২৯ ধারায় (মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার, ইত্যাদি) তিন বছর এবং ৫ লাখ টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরো ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হলো।

রায়ে বলা হয়েছে, আইনের দুটি ধারায় তাকে দেওয়া ঐ সাজা একের পর এক চলবে। ফলে ওসি মোয়াজ্জেমকে আট বছরের দণ্ড ভোগ করতে হবে বলে জানিয়েছেন মামলার বাদী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। রায়ের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, মোয়াজ্জেমের সঙ্গে আমার কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না। আমি চেয়েছিলাম তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে। অনেকেই মনে করেন পুলিশ কিংবা শক্তিশালী কেউ হলে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা যায় না। তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে পারাটাই সবচেয়ে বড়ো সফলতা। তিনি বলেন, দেশের থানাগুলোতে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা নিজেদের জমিদার মনে করেন কিংবা সাধারণ জনগণের সঙ্গে জমিদারের মতো আচরণ করেন এ রায়ের মধ্য দিয়ে তার অবসান হবে বলে মনে করি।

গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা কর্তৃক যৌন হয়রানির শিকার হন নুসরাত। পরে থানায় ডেকে নিয়ে যৌন হয়রানির ঘটনার বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চায় ওসি। ঐ বক্তব্য দেওয়ার সময় সেটা নিজের মোবাইল ফোনে ভিডিও করেন মোয়াজ্জেম। পরে দুটি অ্যাপসের মাধ্যমে তা অন্যের মোবাইলে প্রেরণ করেন। অগ্নিদগ্ধ হয়ে নুসরাতের মৃত্যুর পর সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন ব্যারিস্টার সুমন। মামলাটির অভিযোগ তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশসন্সকে (পিবিআই) নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। তদন্ত শেষে পিবিআইয়ের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রীমা সুলতানা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৬, ২৯ ও ৩১ ধারায় মোয়াজ্জেমকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন দেয়। পরে ট্রাইব্যুনাল ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণ করে। যুক্তিতর্ক শেষে গতকাল ঐ রায় দেওয়া হয়। তবে রায়ে ৩১ ধারায় আনীত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এ ধারায় দণ্ড দেয়নি আদালত। এ ধারায় ভিডিও ভাইরাল হয়ে সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়। ৩১ ধারায় অপরাধের জন্য সাত বছর কারাদণ্ড, অর্থ দণ্ড এবং উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

রায়ের পর ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি নজরুল ইসলাম শামীম বলেন, ওসি নিয়মবহির্ভূতভাবে ভিকটিমের সঙ্গে অপমানজনক ও আপত্তিকর ভাষা প্রয়োগ করেছেন। অনুমতি ব্যতিরেকে ভিডিও ধারণ করে দণ্ডনীয় অপরাধ করেছেন। নুসরাতের ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান বলেন, ওসি মোয়াজ্জেমের যে সাজা হয়েছে, তাতে আমরা সন্তুষ্ট। তবে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে বলে জানান মোয়াজ্জেমের আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ।

যশোর অফিস জানায়, মিডিয়া ট্রায়ালে সাজানো মামলায় সাজা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ওসি মোয়াজ্জেমের ভাই খন্দকার আরিফুজ্জামান। তিনি বলেন, ব্যারিস্টার সুমনের মামলা করার এখতিয়ার নেই। তারপরও তার মিথ্যা ও সাজানো মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছে। মিডিয়া ট্রায়ালের কারণে সাজানো মামলায় সাজা দেওয়া হলো। ভাই ন্যায়বিচার পায়নি। উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। আশা করছি উচ্চ আদালতে ন্যায়বিচার পাব।