গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকার মহাসড়ক-সড়ক উন্নয়ন ও সংস্কার কাজের জন্য মাটি খোঁড়াখুঁড়িসহ বিভিন্ন কারণে ধুলাদূষণে নাকাল হচ্ছে নগরবাসী। এ দূষণ বন্ধে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নগরীর ব্যস্ততম চান্দনা-চৌরাস্তা মোড় থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার মহাসড়কে চলছে বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের কাজ। এজন্য সড়ক-মহাসড়কের দুপাশে ড্রেন নির্মাণের জন্য মাটি খোঁড়াখুঁড়ির পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্যও চলছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। এ কারণে সড়ক-মহাসড়কের পাশে নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা হচ্ছে। এসব নির্মাণসামগ্রী ও মাটি খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ধুলাদূষণে আক্রান্ত হচ্ছে নগরীর লাখ লাখ মানুষ।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গাজীপুরের প্রধান সড়কের ৩৫ কিলোমিটারসহ নগরীর ভিতরের বেশিরভাগ সড়কে উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ চলছে। এই কাজের জন্য ইট, বালি, মাটিসহ বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী আচ্ছাদনহীনভাবে ট্রাকে করে পরিবহন করা, ড্রেন পরিষ্কার করে রাস্তার পার্শ্বে স্তূপীকৃত করে রাখা, গৃহস্থালি, দোকানপাট ও শিল্পকারখানার ময়লা-আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলে রাখা, ভাঙাচুরা রাস্তা দিয়ে যানবাহন চলাচল করা, পাকা ভবন নির্মাণের সময় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নির্মাণসামগ্রী দীর্ঘদিন নির্মাণাধীন ভবনের সামনে রেখে দেওয়া, মেশিনে ইটপাথর ভাঙা, যানবাহনসহ কারখানা ও ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। ধুলা ও ধোঁয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা একদিনের বেশি পড়তে পারছে না স্কুল বা কলেজ ড্রেস।
পরিবেশ অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে গাজীপুরে বায়ুদূষণের মূল কারণ হচ্ছে নগরীর ইটভাটা ও সড়ক নির্মাণের কাজ। এছাড়া কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানও এর জন্য দায়ী। গাজীপুর জেলায় ইটভাটা রয়েছে ২৯০টি। নিয়ম অনুযায়ী সিটি করপোরেশন এলাকায় ইটভাটা থাকার কথা নয়। সিটির ভিতরে আগে ছিল ৮৫টি ইটভাটা। এর মধ্যে ২২টি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি মালিকরা বন্ধ করে দিয়েছে। উচ্চ আদালতে রিট করে ৫৫টি ইটভাটা চালু রাখা হয়েছে। এসব ইটভাটার বেশিরভাগ নগরীর কড্ডা, বাইমাইল ও নাওজোর এলাকায়।
ধুলাদূষণের কারণে ধুলাজনিত রোগব্যাধির প্রকোপ বাড়ছে। এ ব্যাপারে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. নির্মল কান্তি সরকার জানান, রাস্তার পার্শ্বের দোকানের খাবার ধুলায় প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে। শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে রোগজীবাণু মিশ্রিত ধুলা ফুসফুসে প্রবেশ করে সর্দি-কাশি, ব্রংকাইটিস, হাপানি, যক্ষ্মা, এলার্জি, চোখ জ্বলা, মাথাব্যথা, বমি ভাব, চর্মরোগ এমনকি ফুসফুসের ক্যান্সার হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা বেশি এসব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
চান্দনা-চৌরাস্তা এলাকার ব্যবসায়ী আলমগীর কবির বলেন, ধুলার কারণে দোকানের জিনিষপত্র, কম্পিউটারসহ নানা ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গাজীপুর সিটি করপোরেশন হবার পর গত ছয় বছরে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। মাঝে মাঝে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে পানি ছিটানোর মাধ্যমেই তারা দায়িত্ব শেষ করে। মূলত শুষ্ক মৌসুমে অর্থাত্ নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত দূষণ বেশি হয়ে থাকে।
এ ব্যাপারে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গাজীপুরকে গ্রিন ও ক্লিন সিটিতে রূপান্তর করতে হলে পর্যাপ্ত সময়ের দরকার। আগে যে কাজগুলো কেউ করেনি এখন তিনি সেগুলো শুরু করেছেন। সবাই কোনো না কোনো কারণে পরিবেশ দূষণ করছে। কেউ কারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলছে, কেউ ময়লা-আবর্জনা ড্রেনে ফেলছে। বর্তমানে পুরো সিটি এলাকা জুড়ে উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। দূষণ রোধে সব ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে যতদূর সম্ভব দূষণ কমিয়ে উন্নয়ন কাজ করতে বলা হয়েছে। গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুস সালাম সরকার বলেন, অবৈধ ইটভাটা বন্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। পরিবেশ দূষণ বন্ধে কাজ করা হচ্ছে।