ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউর বহুল আলোচিত পর্দা কেলেঙ্কারিসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির পর এবার হবিগঞ্জের শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজের যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, বই ও অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয়ে সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে মালামাল ক্রয় করে প্রায় ১৫ কোটি টাকার টেন্ডারের অর্ধেকই হাতিয়ে নিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
জানা যায়, কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বইপত্র, সাময়িকী, যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য ২০১৮ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এই লক্ষ্যে কলেজের অধ্যক্ষ ডা. আবু সুফিয়ান স্বাক্ষরিত আদেশে ফিজিওলজি বিভাগের প্রভাষক ডা. মো. শাহীন ভূইয়াকে সভাপতি করে তিন সদস্যবিশিষ্ট বাজারদর যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। দরপত্রে অংশ নেয় সাতটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু মূল্যায়ন রিপোর্টে সদস্যদের স্বাক্ষর ছাড়াই ঢাকার শ্যামলী এলাকার নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ ও মতিঝিলের পুনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামের দুটি প্রতিষ্ঠানকে মালামাল সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সূত্র জানায়, এসব খাতে মোট বরাদ্দ ছিল ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ভ্যাট ও আয়কর খাতে সরকারি কোষাগারে জমা হয় ১ কোটি ৬১ লাখ ৯৭ হাজার ৭৪৮ টাকা। মালামাল ক্রয় বাবদ ব্যয় দেখানো হয় ১৩ কোটি ৮৭ লাখ ৮১ হাজার ১০৯ টাকা। কিন্তু বাস্তবে ঐ মালামালের মূল্য ৫ কোটি টাকার বেশি নয়, এমনটাই বলছে দরপত্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। বাকি টাকার পুরোটাই হয়েছে ভাগবাঁটোয়ারা।
সূত্রমতে, সরবরাহকৃত মালামালের মধ্যে ৬৭টি লেনেভো ল্যাপটপের (মডেল ১১০ কোর আই ফাইভ, কিং জেনারেশন) মূল্য নেওয়া হয়েছে ৯৯ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতিটির মূল্য পড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ স্বনামধন্য কম্পিউটার-সামগ্রী বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ফ্লোরায় একই মডেলের ল্যাপটপ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪২ হাজার টাকায়। ৬০ হাজার টাকার এইচপি কালার প্রিন্টার (মডেল জেড প্রো এম৪৫২এন ডব্লিউ)-এর দাম নেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯০০ টাকা। ৫০ জন বসার জন্য কনফারেন্স টেবিল, এক্সিকিউটিভ চেয়ার ও সাউন্ড সিস্টেমে ব্যয় হয়েছে ৬১ লাখ ২৯ হাজার টাকা। জনপ্রতি চেয়ার-টেবিল ও সাউন্ড সিস্টেমের ব্যয় পড়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ টাকা। চেয়ারগুলোতে ‘ইয়ামিন ফার্নিচার’ লেখা থাকলেও টেবিলগুলোতে কোনো প্রতিষ্ঠানের স্টিকার লাগানো নেই। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের নামি ফার্নিচার প্রতিষ্ঠান হাতিল ও রিগ্যালে এসব চেয়ারের মূল্য ঐ দামের অর্ধেকের চেয়েও কম। শুধু তাই নয়, অত্যন্ত সাধারণ মানের ১৫টি বুকসেলফের মূল্য ৬ লাখ ৬০ হাজার, ৫টি স্টিলের আলমারি ২ লাখ ৮৫ হাজার, ১০টি স্টিলের ফাইল কেবিনেট ৪ লাখ ২২ হাজার, ২৫টি স্টিলের র্যাক ১৩ লাখ ৯৭ হাজার এবং ৬ হাজার ৪৭৫টি বইয়ের জন্য বিল দেখানো হয়েছে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৮ হাজার ৬৬৪ টাকা। এছাড়া বিলে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ১০৪টি প্লাস্টিক মডেলের মূল্য ১ কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ৩১৩ টাকা দেখানোসহ দেশের বাজারে ‘পেডিয়াটিক সার্জারি’ (২ ভলিয়মের সেট) বইয়ের দাম ৩৩ হাজার টাকা হলেও নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ দাম নিয়েছে ৭০ হাজার ৫৫০ টাকা।
এদিকে পুনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা দরে ৮১টি কার্লজিস প্রিমো স্টার বাইনোকুলার মাইক্রোস্কোপ সরবরাহ করে, যার মূল্য নিয়েছে ২ কোটি ৬৩ লাখ ৩২৫ টাকা। অথচ এর বাজারমূল্য প্রতিটি ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩০০ টাকা। ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা দরে ৩১টি এসির মূল্য নিয়েছে ৬১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ওয়ালটনের যে মডেলের ফ্রিজ ৩৯ হাজার ৩৯০ টাকা, একই কোম্পানি ও একই মডেলের সেই ফ্রিজের মূল্য গুনতে হয়েছে ৮৫ হাজার টাকা। এ রকম ৬টি ফ্রিজ কেনা হয়েছে। ল্যাবরেটরিতে ব্যবহারের জন্য ডিজিটাল ওয়েইং (ওজন মাপার যন্ত্র) মেশিনের দাম নেওয়া হয়েছে ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। বাস্তবে এর বাজারমূল্য ৪০ হাজার টাকা করে। এছাড়া মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ছবি সংবলিত কাগজে ছাপা চার্ট বাজারে ১০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া গেলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রতিটি চার্ট কিনেছে ৭ হাজার ৮০০ টাকা দরে। এ রকম ৪৫০টি চার্ট ক্রয়ে ব্যয় হয়েছে ৩৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকায় পাওয়া যায় ‘স্টারবোর্ড’ নামে হিটাচি কোম্পানির ৭৯ ইঞ্চির ইন্টারঅ্যাক্টিভ বোর্ড। কিন্তু একই কোম্পানি ও মডেলের এই ইন্টারঅ্যাক্টিভ বোর্ড কেনা হয়েছে ১৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়। এছাড়া কলেজ অধ্যক্ষ দুই বছর যাবত্ তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত গাড়ি বিনা টেন্ডারে মেডিক্যাল কলেজের জন্য ভাড়া করে প্রতি মাসে ৭০ হাজার টাকা করে উত্তোলন করেছেন।
কলেজের কোনো কোনো শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেসব বই কেনা হয়েছে, এর কিছু বই এমবিবিএস ক্লাসের ছাত্রদের কোনো কাজে লাগবে না। কারণ এসব বই গবেষণার কাজে লাগে। তারা বলেন, ‘শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজের ফার্স্ট ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এখন তৃতীয় বর্ষে পদার্পণ করেছে। আগামী ২০২২ সালে তারা পঞ্চম বর্ষে পৌঁছাবে। কিন্তু ২০১৮ সালে পঞ্চম বর্ষে পড়ানোর জন্য বই কিনতে হবে, এর কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাই না। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নতুন সংস্করণের বই থেকে বঞ্চিত হবে।’ অভিযোগ, মালামালের দরপত্র মূল্যায়ন রিপোর্টে ঐ কমিটির অধিকাংশ সদস্যের সই ছিল না।
এ বিষয়ে শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মো. আবু সুফিয়ান বলেন, সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুসরণ করে বাজারদর যাচাই-বাছাই কমিটি সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ঢাকার দুটি প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডার দিয়েছে। এখানে কোনো প্রকার অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি।
এদিকে মেডিক্যাল কলেজে ব্যাপক দুর্নীতির খবর প্রকাশ হওয়ার পর দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবিতে সম্প্রতি সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন মানববন্ধনের আয়োজন করে। হবিগঞ্জ দুদকের আঞ্চলিক অফিস সূত্র জানায়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাওয়া গেলে শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজে টেন্ডার দুর্নীতির তদন্ত করা হবে। অপর একটি সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য বিভাগও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করবে।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি কলেজটি অনুমোদন লাভ করে এবং ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ৫১ জন শিক্ষার্থীর মাধ্যমে শুরু হয় এর অগ্রযাত্রা।