কোনো বাড়ির বড়ো মেয়ে, কোনো বাড়ির মেজো বউকে একেকটি এলাকার আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-পড়শির মধ্যে খ্যাত হতে দেখা গেছে তাদের তৈরি মনভোলানো সুন্দর সব নকশার জন্য। কালচক্রে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে তাঁরা চলে গেলেও উত্তরাধিকারদের মধ্যে তাঁরা সজীব থেকেছেন তাঁদের সেই সব সৃষ্টিকর্মের জন্য। পিঠার শোভাবর্ধনে যেসব নকশা চালু রয়েছে, তার অধিকাংশই প্রতীকধর্মী। ফুল, পাখি, লতা-পাতা, মাছ, চিরুনি—এসব তো আছেই। এছাড়া এমন নকশি পিঠা আছে, যার নাম ‘সতিনের মোচড়’। বিশেষ একটি পেঁচানো ধরনের নকশার নাম সতিনের মোচড়। কেবল পিঠাই দৃশ্যত আমরা দেখছি না—বিমূর্তভাবে একটি পরিবারের বিশেষ অবস্থার চিরন্তন রূপ এই ‘সতিনের মোচড়’ একটি নামের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। গত শীতের মৌসুমে কোনো একটি শিল্পমেলায় এক মহিলার কাছে প্রথম পাই এই পিঠার সন্ধান। তিনি মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত মহিলা। কিন্তু পিঠার ঐতিহ্য বহু পুরোনো। সেই সুদূর অতীতের কোনো গ্রাম্য গৃহবধূ শিল্পীমনের কতখানি গভীরতা থাকলে দুই সতিনের কলহকে এমনভাবে সৌন্দর্যমণ্ডিত নকশায় রূপান্তরিত করতে পারেন! বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর মূল্যায়ন করতে হলে ওই একই মনের প্রবল অনুভূতিপ্রবণ রসবোদ্ধার প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ইতিহাসখ্যাত মসলিন ও জামদানি শাড়ির কথাতেও আসতে হয়। মসলিনের অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত। মসলিনের একটি ক্ষুদ্রাংশ ঢাকা জাদুঘরে রক্ষিত আছে। প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে ওই এক টুকরো মসলিনকে কেন্দ্র করেই আজ আমাদের বিচরণ। এই মসলিন ও জামদানি কেবল ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকার নদীতীরবর্তী অঞ্চলে উত্পাদিত হতো এবং জামদানি শাড়ি তৈরি এখনো ঢাকার অদূরে শীতলক্ষ্যার তীরে নোয়াপাড়া, রূপসী গ্রামেই সীমাবদ্ধ। অতীতে সোনারগাঁকে কেন্দ্র করে বোধহয় এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর আগে এ দেশে, অর্থাত্ এই উপমহাদেশেই বলা চলে সব ধরনের বস্ত্রই হস্তচালিত তাঁতে বোনা হতো। এই বুনন-পদ্ধতিকে যদি সোজা ও সহজ হিসেবে গণ্য করা যায়, তাহলে একটি অতি সহজ প্রশ্নও আসে। তাহলে সব ধরনের বস্ত্রশিল্প যখন তাঁতে বোনা হতো—এই উপমহাদেশের সব অঞ্চলেই সকল প্রকার বস্ত্রশিল্প গড়ে ওঠেনি কেন?
অথচ আধুনিক যান্ত্রিকীকরণের কারণে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত কাঁচামাল অর্থাত্ তুলা দিয়ে পৃথিবীর সব এলাকাতেই একই মানের কাপড় উত্পাদন সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ঢাকার জামদানি শীতলক্ষ্যার তীর ছেড়ে অন্য কোথাও যাবে না। এখানেই ঐতিহ্যের মূল্যায়ন বিরাজ করছে। এক্ষেত্রে যে দুটি জিনিস মিলিতভাবে কাজ করছে, তা হলো কারিগরি দক্ষতা ও শিল্পচেতনা। শিল্প-প্রভাবিত কারিগরি দক্ষতা না থাকলে কেবল মসলিন-জামদানিই নয়, ঐতিহ্যবাহী কোনো হস্তশিল্পেরই উন্মেষ হতো না। কেবল দক্ষ কারিগর দিয়ে কারখানা চালু করা যায়, কিন্তু শিল্পচেতনাহীন কারিগর দ্বারা হস্তশিল্প বা কারুশিল্পজাত পণ্যদ্রব্য উত্পাদন করা সম্ভব নয়।
তাই নকশিকাঁথার মতো মসলিন-জামদানির পরতে পরতে জড়ানো রয়েছে ঢাকা জেলার এই বিশেষ অঞ্চলের প্রাকৃতিক আবহাওয়া, সেখানকার পল্লিবাসীর প্রেম-ভালোবাসা, কিশোরী-কন্যার গোপন প্রেমের নির্ভার শিহরন। (শেষাংশ)
সূত্র : বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলন ও আমার কথা/কামরুল হাসান (প্রথমা প্রকাশন, ২০১০)