চীন নিয়ন্ত্রিত ও অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হংকংয়ে গত জুন মাস থেকে আন্দোলন চলছে। প্রথম দিকের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে। প্রত্যর্পণ বিল বাতিলের দাবি রূপ নিয়েছে স্বাধীনতার আন্দোলনে। চীন নানা হুমকি দিলেও এখন পর্যন্ত বড়ো ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে দুটি আইন পাশ হয়েছে, যে আইনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বাক্ষর করতে একরকম বাধ্য হয়েছেন। বিশ্লেষক মাইকেল বোসিউরকিউর মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বাক্ষরের মাধ্যমে ঝুঁকি নিয়েছেন।
যা আছে আইনে
হংকং নিয়ে দুটি নতুন আইন পাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত বুধবার তাতে স্বাক্ষর করেন। এই আইনের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে চীন। প্রতিউত্তর দেওয়ারও হুমকি দিয়েছে। হংকংয়ের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সেখানে যথাযথ স্বায়ত্তশাসন আছে কিনা তা খতিয়ে দেখবে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অন্তত বছরে একবার এই বিষয়ে সনদ দেবে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য ওয়াশিংটন হংকংয়ের ওপর অবরোধও আরোপ করতে পারবে। এখানেই শেষ নয়। হংকংয়ের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিধিনিষেধ সংক্রান্ত আরেকটি বিলেও সই করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে টিয়ারগ্যাস, পিপার স্প্রে, রাবার বুলেট, স্টেনগানসহ বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহূত সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করতে পারবে না। এমনই দুটি আইন পাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে হংকংয়ের বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন দেওয়া নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমরা হংকংয়ের পাশে দাঁড়াব। কিন্তু প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও আমার বন্ধু। তারা কী করেন সেটা দেখা উচিত। মার্কিন কংগ্রেসে ব্যাপক সমর্থন পাওয়া ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি অ্যাক্ট’ যা ‘প্রটেক্ট হংকং অ্যাক্ট’ নামেও পরিচিত বিলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একরকম বাধ্য হয়ে স্বাক্ষর করেন। কারণ তিনি স্বাক্ষর না করলেও কংগ্রেস তা মানাতে বাধ্য করতে পারত। বিশ্লেষক মাইকেল বোসিউরকিউ সিএনএনে লেখা এক কলামে জানান, হংকংয়ে পুলিশের ব্যবহূত টিয়ার গ্যাস তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়াভিত্তিক কোম্পানি ননলিথ্যাল টেকনোলজিস ইনকরপোরেশন। এছাড়া বিক্ষোভ দমনের অন্যান্য জিনিসও যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির তৈরি। এসব কোম্পানির শূন্যস্থান এখন পূরণ করবে চীনা কোম্পানি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য আলোচনা চলছে। একদিকে আলোচনা চলছে অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এগিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র যেমন চীনা পণ্যে শুল্ক বাড়িয়েছে, বেইজিংও তেমনি ওয়াশিংটনের পণ্যে শুল্ক বাড়িয়েছে। তবে ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড়ো মাথাব্যথার কারণ তার দলের প্রভাবিত রাজ্যের কৃষকরা চীনা নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাণিজ্য চুক্তি না হলে কৃষকরা ক্ষেপে গেলে ট্রাম্পের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তবে চীনও আতঙ্কে আছে। কারণ নিষেধাজ্ঞায় পণ্যের দাম বাড়লে তা জনগণকে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে।
হংকংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ
যুক্তরাষ্ট্র হংকংকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকে। এর কারণ চীনা নিয়ন্ত্রিত শহরটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ১৩০০ মার্কিন ফার্ম হংকংয়ে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে ৩০০ আছে যেগুলো পুরো এশিয়া জুড়ে বাণিজ্য করে। প্রায় সব মার্কিন বড়ো কোম্পানির বাণিজ্যিক উপস্থিতি এখানে আছে। ইউএস লিগ্যাল অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সার্ভিসেস এর একটা বড়ো অংশই হংকংয়ে যায়। গত বছর বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের বড়ো অংশ ৩১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারই হয়েছে হংকংয়ে। আর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশের মূল কেন্দ্রও কিন্তু হংকং। হংকংয়ের আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স জানিয়েছে, হংকং নিয়ে কোনো ধরনের নেতিবাচক পদক্ষেপ নিলে তা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রভাব ফেলবে।
অর্থনীতির প্রবেশপথ
হংকং চীনের জন্য বাণিজ্য এবং আর্থিক খাতের চাবিকাঠি। ২০১৭/১৮ সালে চীন ১২৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি বিদেশি বিনিয়োগ পায় যেটা ৯৯ বিলিয়ন ডলার আসে হংকং হয়ে। এর অর্থ মোট অর্থ প্রবাহের ৮০ শতাংশ আসছে হংকং থেকে। এর কারণ হংকংয়ে আইন এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ কোম্পানিগুলোর জন্য একটা নিরাপদ বিনিয়োগের স্থান করে দিয়েছে। বিবিসির চীনের সম্পাদক হুয়ার্ড ঝাং বলেন, এই অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটা বিশেষ সুবিধা পায়। সেগুলো বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শুল্কের ক্ষেত্রে। আর এই সুবিধাটা চীন ভোগ করে অন্যভাবে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের উপর যে শুল্ক নির্ধারণ করেছে, চীন যদি সেটা হংকং হয়ে ব্যবসাটা করে তাহলে তাদের ওপর আর যুক্তরাষ্ট্রের ঐ শুল্কের বোঝা বইতে হয় না।