শ্রীলঙ্কার ক্ষমতায় রাজাপক্ষের পরিবার ফিরে আসায় দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যত্ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে ভারতের। এর প্রেক্ষিত বিবেচনায় দেশটির সঙ্গে নতুন করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে নয়াদিল্লিই। শ্রীলঙ্কার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষেকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ তড়িঘড়ি করেই দেওয়া হয়। ভারতের সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে তিন দিনের সফর করেছেন গোতাবায়া। গত সপ্তাহে তার সফরে সুসম্পর্ক গড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে দুই পক্ষ। গত শুক্রবার নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কথা জোর গলায় বলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একইভাবে সাড়া দিয়েছেন গোতাবায়াও।
যদিও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে চীনের মধ্যে সম্পর্ক তৈরিতে বরাবর সেতু হিসেবে কাজ করেছে রাজাপক্ষে পরিবার। শ্রীলঙ্কায় তামিলদের গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযানে চীনের নিরঙ্কুশ সমর্থন পেয়েছিল তত্কালীন মাহিন্দা রাজাপক্ষের সরকার। গোতাবায়া সেই সময় ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় তামিলসহ সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি তার নির্বাচনের প্রচারে চীনের প্রভাব চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল দিল্লির কপালে। তবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর উপমহাদেশীয় রাজনীতি কোন দিকে গড়ায় এখন সেটাই দেখার বিষয়।
আনন্দবাজার পত্রিকার এক খবরে বলা হয়েছে, চীনা ঘনিষ্ঠ রাজাপক্ষে পরিবারকে নিজেদের পক্ষে আনতেই ভারতের এই বাড়তি সক্রিয়তা বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরে তড়িঘড়ি করে কলম্বোয় পাঠানো হয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে, এর আগে যা কখনো হয়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের বক্তব্য, এর পেছনে ছিল দ্বিমুখী কৌশল। প্রথমত, এই বার্তা দেওয়া যে অতীতের তিক্ততা ভুলে গিয়ে সাদা কাগজে নতুন করে দ্বিপক্ষীয় ভাষ্য তৈরি করতে চায় ভারত। দ্বিতীয়ত, শুরুতেই বুঝিয়ে দেওয়া যে তামিল প্রশ্নে সহযোগিতা আশা করা হচ্ছে।
সম্পর্কোন্নয়নের পদক্ষেপ হিসেবে মোদি সরকারের পক্ষ থেকে নতুন করে ৪৫ কোটি ডলারের ঋণ (সহজ সুদে) ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ কোটি ডলার শ্রীলঙ্কার অবকাঠামো উন্নয়নে এবং ৫ কোটি ডলার সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কাজে ব্যবহার করা হবে। দুই নেতার মধ্যে জঙ্গি দমন, উন্নয়ন ছাড়াও শ্রীলঙ্কার তামিল সম্প্রদায়ের দাবি পূরণ, নিরাপত্তা বৃদ্ধি, বাণিজ্য চুক্তি, মত্স্যজীবীদের ঠিকানাসংক্রান্ত নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, প্রতিবেশী হিসেবে সব রকম সহযোগিতা রাজাপক্ষে পরিবারের সঙ্গে করতে যে ভারত প্রস্তুত, সেই বার্তা গত কয়েক দিনে দিতে পেরেছে নয়াদিল্লি। কিন্তু বিনিময়ে শ্রীলঙ্কাকেও তামিল প্রশ্নে ভারতের দাবি মেনে নিতে হবে। অগ্নিগর্ভ প্রতিবেশী বলয়ের মধ্যে বসে থাকা ভারতের পক্ষে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে শত্রুতা তৈরি করা যে ঠিক হবে না, সেটা বুঝতে পারছেন নরেন্দ্র মোদি। ভারত জানে যে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে ভারতকে গোতাবায়া বেছে নিলেও তাতে দিল্লির খুব আনন্দিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। খুব শিগিগরই বেইজিং সফরে যাবেন গোতাবায়া। সেখানে তৈরি হবে বাণিজ্যিক এবং কৌশলগতভাবে পুরোনো ও গভীর সম্পর্ককে নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি। দ্বীপরাষ্ট্রকে কাজে লাগিয়ে ভারতের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলতে এর আগে যেভাবে সক্রিয় থেকেছে চীন, রাজাপক্ষের প্রত্যাবর্তনে তারই ধারাবাহিকতা ফিরে আসতে পারে বলে আশঙ্কা সাউথ ব্লকের।
ভারতের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক সি রাজা মোহন সম্প্রতি তার এক ‘কমেন্টারি’তে লিখেছেন, নিকটবর্তী বৃহত্ প্রতিবেশী হওয়ার পরও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে খুবই জটিল সম্পর্ক বিরাজ করছে ভারতের, যা কলম্বো ও বেইজিংয়ের সম্পর্কের থেকে ভিন্ন। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী মোদি দুই দেশের সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদি শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনছেন। একইভাবে আশা করা হচ্ছে, গোতাবায়াও শ্রীলঙ্কার সামনের চ্যালেঞ্চ মোকাবিলায় বাস্তববাদী হবেন। ইতিমধ্যে তিনি ভাই মাহিন্দা রাজাপক্ষের আমলের রাজনৈতিক ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার আভাস দিয়েছেন।
যদিও দিল্লি সচেতন যে শ্রীলঙ্কায় বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি চীনের প্রভাব সহজেই উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে চীনের বিকল্প হিসেবে শ্রীলঙ্কার অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভারত প্রস্তাব করতে পারে। মানবাধিকার ইস্যুতে শ্রীলঙ্কার ওপর পশ্চিমাদের চাপ কমাতে ভারত ভূমিকা রাখতে পারে। যদি দিল্লি কলম্বোকে বোঝাতে পারে যে তারা দেশটির নিরাপত্তা ও অগ্রযাত্রার জন্য কোনো হুমকি নয়, তাহলে ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে শ্রীলঙ্কার আপত্তি থাকার কোনো কারণ নেই।