কতিপয় পুলিশের কারণে বাহিনীর অর্জন ম্লান হতে দেওয়া ঠিক নয় :হাইকোর্ট

শ্রমিকনেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার বাদীর মূল এজাহার গ্রহণ না করে মনগড়া এজাহার সৃজনের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন রাজশাহীর পুঠিয়া থানার সাবেক ওসি সাকিলউদ্দিন আহমেদ। থানার দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তার এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে গুরুতর অপরাধ, যা দণ্ডবিধির ১৬৬ ও ১৬৭ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, দণ্ডবিধির ঐ দুটি ধারার অপরাধ দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ আইনের তপশিলভুক্ত। এ কারণে ওসি সাকিলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধান প্রতিবেদন ও আনুষঙ্গিক নথি দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানোর জন্য রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেওয়া হলো। এসব নথির ভিত্তিতে সাকিলের বিরুদ্ধে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবে দুদক। বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল রবিবার এ রায় দেয়।

রায়ে বলা হয়েছে, ‘আমরা দৈনন্দিন বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে ইদানীং প্রায়শ লক্ষ করছি যে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাসহ পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে নানাবিধ অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা এসব বিষয়ে পুলিশের আইজি বরাবর লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন এবং করছেন। কিন্তু ঐসব অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে না।’ রায়ে আরো বলা হয়েছে, “বাংলাদেশ পুলিশ মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা ও উন্নয়ন, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, জাতিসংঘ শান্তি মিশনের কার্যক্রমে অনবদ্য অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছে এবং রেখে চলেছে। এটা শুধু পুলিশ বাহিনীর জন্যই গৌরবের নয়, সমগ্র জাতির গৌরব। কিন্তু এই গৌরব গুটি কয়েক পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্যের অন্যায়, বেআইনি আচরণ ও অপরাধের কারণে ম্লান হতে দেওয়া ঠিক নয়। এ কারণে হাইকোর্ট প্রত্যাশা করে যে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে ঐ অভিযোগ সম্পর্কে দ্রুততার সঙ্গে বিভাগীয় তদন্ত সম্পন্ন এবং দোষী প্রমাণিত হলে দ্রুত আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমরা মনে করি, আদালতের এই প্রত্যাশা বিবেচনায় নিয়ে পুলিশের আইজি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ‘আইজিপি কমপ্লেইন্টস মনিটরিং সেল’-এর কার্যক্রম আরো কার্যকর ও গতিশীল করা হবে।’

হত্যা মামলার তদন্ত করবে পিবিআই

চলতি বছরের ১১ জুন পুঠিয়ার কাঁঠালবাড়িয়া এলাকার একটি ইটভাটা থেকে শ্রমিকনেতা নুরুল ইসলামের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঐ দিনই নিহতের মেয়ে নিগার সুলতানা বাদী হয়ে পুঠিয়া থানায় আট জনকে আসামি করে এজাহার দেন। ঐ এজাহারে বলা হয়, শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বীরা এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। কিন্তু ঐ এজাহার গ্রহণ করেননি ওসি। পরবর্তীকালে বাদীকে ডেকে নিয়ে জব্দ তালিকা, সুরতহাল প্রতিবেদনসহ কিছু সাদা কাগজের ওপর স্বাক্ষর নিয়ে রাখে পুলিশ। পরে ঐ সাদা কাগজে এজাহার টাইপ করে থানায় তা রেকর্ডভুক্ত করা হয়। বাদী কর্তৃক থানায় পাঠানো এজাহারের বর্ণনার সঙ্গে দায়েরকৃত এজাহারের বর্ণনার মধ্যে অসংগতি বিদ্যমান। সর্বোপরি এজাহারে আট জনকে আসামি করা হলেও পুলিশ কর্তৃক সৃজনকৃত এজাহারে কোনো আসামির নাম উল্লেখ ছিল না। সেখানে অজ্ঞাতনামা উল্লেখ করা ছিল, যা রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে। এজন্য থানার ওসিকে দায়ী করা হয়। হাইকোর্ট বলে, থানার ওসির মতো দায়িত্বশীল একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এজাহার বদলে ফেলার অভিযোগ গুরুতর ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ কারণে গত ১১ জুন নিগার সুলতানার পাঠানো মূল এজাহারটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন্সকে (পিবিআই) নির্দেশ দেওয়া হলো। পিবিআইয়ের প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার মামলাটির তদন্ত তদারকিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আদালত প্রত্যাশা করে।

শিশুর পরিচয় প্রকাশ শাস্তিযোগ্য অপরাধ; রাজশাহীর এসপির ব্যাখ্যা সুস্পষ্ট নয়

হাইকোর্ট বলেছে, শ্রমিকনেতা নুরুল হত্যা মামলায় আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় এক শিশু। রাজশাহীর পুলিশ প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করে। কিন্তু শিশু আইনের ৮১ ধারা অনুযায়ী শিশুর স্বার্থের পরিপন্থি কোনো ছবি বা তথ্য গণমাধ্যমে বা ইন্টারনেটে প্রচার করা যাবে না, যা দ্বারা শিশুটিকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শনাক্ত করা যায়। এ বিষয়ে রাজশাহীর পুলিশ সুপারের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার দেওয়া ব্যাখ্যা স্পষ্ট নয় বলে মনে করে হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, এ ঘটনায় একজন শিশুর জবানবন্দি প্রেস বিজ্ঞপ্তি আকারে গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করে রাজশাহীর পুলিশ প্রশাসন দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে এবং আইন ভঙ্গ করেছে। তাই শিশু আইন সম্পর্কে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যদের সচেতনতামূলক ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ প্রয়োজন। এ বিষয়ে আইজিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রসঙ্গত, ঐ হত্যা ঘটনার পর এক শিশুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই শিশুর দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রকাশ করে পুলিশ। সেখানে বলা হয়, শিশুকে অনৈতিক আচরণে বাধ্য করায় নুরুল ইসলামকে হত্যা করে। যদিও ঐ অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছিল তার পরিবার। তারা বলছে, মূল আসামিদের বাঁচাতে এবং ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতেই এই শিশুকে আটক করা হয়েছে।