বিজয়ের স্মৃতিতে সাজানো প্রকৃতি

 

 

 

l সুমন্ত গুপ্ত

 

ঘড়ির কাঁটাতে হয়তো ভোর ৬টা বাজে, আমি তখন নিদ্রা দেবীর আবেশে আবিষ্ট। পাখির কলরবে আমার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম থেকে উঠেই তৈরি হয়ে নিলাম নতুন গন্তব্যে যাব বলে। ও বলাই হলো না, আমি আমার নতুন ভ্রমণসঙ্গীকে নিয়ে উঠেছি সিলেটের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত দুসাই রিসোর্টে। অসাধারণ পরিবেশ, সবুজের মাঝে সর্পিল পথ। সময় বেশ ভালোই কাটছে আমাদের। সকালের নাস্তা শেষ করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম নতুন গন্তব্যের উদ্দেশে। কোথায় যাওয়া যেতে পারে, তা-ই ভাবছিলাম। আমাদের ভ্রমণের জন্য চার চাকার গাড়িতে উঠে বসলাম। চার চাকার মহাজনকে বললাম, ‘নতুন কোথায় যাওয়া যায় বলুন তো?’ তিনি বললেন, ‘স্যার, বধ্যভূমি ৭১-এ চলেন।’ ভানুগাছ সড়কে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সেক্টর হেড কোয়ার্টার সংলগ্ন ভুরভুরিয়া ছড়ার পাশে অবস্থিত বধ্যভূমি ৭১ পার্কটি। এটি এখন শ্রীমঙ্গল শহরের অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র। বললাম, ‘ঠিক আছে, চলো তাহলে।’ গাড়িতে বাজছে পুরোনো দিনের গান। এগিয়ে চলছি আঁকাবাঁকা পথ ধরে। প্রকৃতির অসাধারণ রূপ আমাদের মোহিত করছে। দেখতে দেখতে এসে পৌঁছালাম বধ্যভূমি ৭১-এ। দেখা পেলাম সত্তর থেকে আশি বছরের পুরোনো একটি বিশাল বটগাছের। গাছটির ডালপালা বেশ বিস্তৃত। চারপাশে সমানভাবে সম্প্রসারিত। দেখে মনে হয়, যেন সোঁদা মাটির গন্ধ ছোঁয়ার ইচ্ছায় গাছটি চারপাশে অনেকগুলো বাহু মেলে ধরেছে। বিশাল এই বটগাছের পাশ দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে পাহাড়ি ঝরনাধারা। আমাদের ড্রাইভারের কাছে নাম জানতে চাইলে বললেন, ‘এই পাহাড়ি ঝরনাধারার নাম ভুড়বুড়িয়া ছড়া।’ ভুড়বুড়িয়া ছড়ার একপাশে জেমস ফিনলে কোম্পানির ভাড়াউড়া চা-বাগান। বাগানে চোখজুড়ানো সবুজের আবাদ। অন্য পাশে বিজিবি ১৪ ব্যাটেলিয়নের সদর দপ্তর। ধীর পদক্ষেপে আমরা এগিয়ে গেলাম বধ্যভূমি ৭১-এর দিকে। সিঁড়ি বেয়ে এগোচ্ছি, দূর থেকে দেখতে পেলাম ঝুলন্ত সেতু। দেখা হলো ঐ এলাকার প্রবীণ রমিজ উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানালেন, পাকিস্তান আমলে এই বটগাছের নিচে একজন সাধুর আস্তানা ছিল। এখানে চা-শ্রমিক ও বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মানত করত, পূজা দিত। জায়গাটি ‘সাধু বাবার থলি’ নামে পরিচিত ছিল। দৃষ্টিনন্দন এই পুণ্যস্থান আরো পবিত্র হয়েছে আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের নয় মাসে; এই পুণ্যভূমিতে ঘুমিয়ে আছে শত-সহস্র প্রাণ। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে এখানে হত্যা করেছে। হত্যার আগে বটগাছের ডালে ঝুলিয়ে হানাদারেরা তাদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। শুধু মুক্তিযোদ্ধা নন, তাদের স্বজন ও মুক্তিকামী সাধারণ মানুষকেও ধরে এনে বটগাছের ডালে উল্টো করে বেঁধে রেখেছে। তৃষ্ণায়, মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করে তারা এখানে শহীদ হয়েছেন। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, সবুজ গালিচা বিছানো চায়ের জনপদ থেকে জন্ম নেওয়া পাহাড়ি উচ্ছল ঝরনাধারা স্বাধীনতাসংগ্রামের নয়টি মাস এখানটায় এসে রক্তে প্লাবিত হয়েছে। ভুড়বুড়িয়া নামের এই ঝরনাধারা না-জানি কতশত অকুতোভয় মুক্তিসেনা, মুক্তিকামী সাধারণ বাঙালি আর পাশের ভুড়বুড়িয়া চা-বাগানের আদিবাসী নিরীহ শ্রমিকদের পবিত্র রক্ত বুকে ধারণ করেছে। হয়তো এর কিছু অংশ তার জন্মঋণ শোধ করতে বয়ে নিয়ে গেছে উপজেলার পশ্চিম সীমান্তে। আমরা নগ্ন পায়ে এগিয়ে গেলাম, দেখা পেলাম ছড়ার পাশে শহীদদের নাম ফলক। সেখানে কিছু সময় দাঁড়িয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। ২০১০ সালের শেষ দিকে এ বধ্যভূমিতে নির্মিত হয় স্মৃতিস্তম্ভ বধ্যভূমি ৭১। এরই ধারাবাহিকতায় এখানে নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য মৃত্যুঞ্জয়ী ৭১, যা ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়। আমাদের মতো অনেকেই এখানে এসেছেন মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য মৃত্যুঞ্জয়ী ৭১ দেখতে। চারদিকে সবুজের লীলানিকেতন। এরই মাঝে একঝাঁক পাখি অতিথিদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে সুরের মুর্চ্ছনা দিয়ে। বধ্যভূমির চারপাশের সৌন্দর্য যেন প্রকৃতি নিজ হাতে এঁকেছে। সুনীল আকাশ আর সবুজ চা-বাগানের মনোরম দৃশ্য যে কাউকেই নিয়ে যাবে ভিন্ন জগতে। দেখতে দেখতে আমাদের বিদায়ের পালা চলে এলো, আমরা চলে গেলাম অন্য এক গন্তব্যে।

 

যেভাবে যাবেন

 

সিলেটের শ্রীমঙ্গল শহরেই বধ্যভূমি ৭১-এর অবস্থান। সেখানে যেতে হলে আপনাকে বাস অথবা ট্রেনে করে যেতে হবে শ্রীমঙ্গল শহরে। শ্রীমঙ্গল শহরের চৌমুহনা থেকে রিকশায় মাত্র ৭/৮ মিনিটের মধ্যেই মৃত্যুঞ্জয়ী ৭১-এ পৌঁছে যেতে পারবেন। শহরের ভানুগাছ সড়কে বনবিভাগ অফিসের বিপরীতে এবং বিজিবির সদর দপ্তর সংলগ্ন স্থানে বধ্যভূমি ৭১ স্মৃতিস্তম্ভের পাশেই এটির অবস্থান।