ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে শিল্পমন্ত্রী

জনগণকে জিম্মি করবেন না

 ‘কিছু ট্যানারি মালিক কমপ্লায়েন্ট কারখানা করতে গড়িমসি করছে’       

g ইত্তেফাক রিপোর্ট

শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেছেন, দেশে অচল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে অধিক মুনাফা অর্জন করার চেষ্টা করছে কিছু ব্যবসায়ী। বড়ো বড়ো দেশে এ প্রবণতাগুলো নেই। কিন্তু আমাদের দেশে এগুলো বিদ্যমান। এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীরা এটা করে। অধিক মুনাফা করার জন্য তারা জনগণকে জিম্মি করে ব্যবসা করতে চায়। ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ব্যবসা করা সরকারের কাজ নয়। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবে এবং সরকার ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা দেবে। ব্যবসা আপনারা করবেন, এর লাভও আপনারা নেবেন। আপনারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে যান। সরকার সব ধরনের সুবিধা দেবে। তবে জনগণকে জিম্মি করবেন না। এটা হতে দেওয়া যাবে না। সম্প্রতি পেঁয়াজ নিয়ে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে সে বিষয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

এদিকে সাভারে চামড়াশিল্প স্থানান্তর প্রসঙ্গে শিল্পমন্ত্রী বলেন, লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ না থাকায় আমাদের চামড়াশিল্পের রপ্তানি আশানুরূপ বাড়ছে না। সনদ প্রাপ্তির জন্য সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়াশিল্প সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা দরকার। সেটির জন্য সম্প্রতি একটি কোম্পানিও গঠন করা হয়েছে। চামড়াশিল্পের উন্নয়নে সরকার সব ধরনের নীতি সহায়তা দিচ্ছে। ক্ষতিপূরণের অর্থও ট্যানারি মালিকদের দেওয়া হয়েছে। তার পরও কিছু ট্যানারি মালিক কমপ্লায়েন্ট (উন্নত কর্মপরিবেশ) কারখানা গড়তে গড়িমসি করছেন।

শিল্প মন্ত্রণালয় ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) যৌথ আয়োজনে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উন্নয়ন নীতিমালা-২০১৯ অবহিতকরণ বিষয়ক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গতকাল সোমবার এসব কথা বলেন শিল্পমন্ত্রী। রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইআরএফ কার্যালয়ের মিলনায়তনে কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

চামড়াশিল্পে কোনো অনিয়ম ও বিচ্যুতি প্রশ্রয় দেওয়া হবে না বলে জানান শিল্পমন্ত্রী। তিনি বলেন, এলডব্লিউজি সনদের জন্য এরই মধ্যে মক অডিট (পরীক্ষামূলক নিরীক্ষা) সম্পন্ন হয়েছে। সে অনুযায়ী যেসব ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সেগুলো করা হচ্ছে।

চামড়া প্রক্রিয়াকরণে ট্যানারি মালিকদের পানির অপচয় বন্ধ করার আহ্বান জানান শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার। তিনি বলেন, কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াকরণে বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে ফেলতে হবে। সব বর্জ্য পরিশোধন করা সম্ভব না। পানি ব্যবহারেও সতর্ক থাকতে হবে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, চলতি বছর চামড়াশিল্প নগরের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। পরিবেশ দিন দিন উন্নতি হচ্ছে। এরই মধ্যে ১২৩টি ট্যানারি চালু হয়েছে। ৭ হাজার কোটি থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন ট্যানারি মালিকেরা। কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হচ্ছে। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অচিরেই সমাধান করতে হবে।

ইআরএফের সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন শিল্প সচিব আবদুল হালিম, ইআরএফ সভাপতি সাইফুল ইসলাম দিলাল।

অস্তান লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইবনুল ওয়ারা বলেন, চলতি ডিসেম্বরের মধ্যে সিইটিপি পুরোদমে চালু হওয়ার কথা। সেটি না হলে যে সব কারখানা নিজেদের উদ্যোগে ইটিপি করতে চায় তাদের অনুমতি দেওয়া দরকার। না হলে বাংলাদেশের চামড়া খাত বড়ো ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। আগামী বছর এলডব্লিউজি সনদের নতুন সংস্করণ চালু হবে। তখন সনদ পেতে বর্তমানের চেয়েও কঠিন মান অনুসরণ করতে হবে।

কর্মশালার দ্বিতীয় পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু ইউসুফ বলেন, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি প্রায় একই ছিল, ১৫ কোটি ডলার। বর্তমানে ভিয়েতনামের চামড়াশিল্পের রপ্তানি ২ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ১০০ কোটি ডলারের সামান্য বেশি। হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুরে ট্যানারির সফল স্থানান্তর হয়নি। সিইটিপির দৃশ্যমান অগ্রগতি দরকার। কারণ কমপ্লায়েন্স না মানলে চামড়ার ব্যবসা করা যাবে না।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পের চেয়ে চামড়াশিল্প অনেক পুরোনো হলেও প্রতি বছর বিদেশ থেকে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার ফিনিসড্ লেদার আমদানি হয়ে থাকে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্ রপ্তানি খাত হিসেবে চামড়াশিল্পের এ দুরবস্থা প্রত্যাশিত নয়। এক্ষেত্রে তারা গণমাধ্যমে চামড়াশিল্পবিষয়ক ইতিবাচক সংবাদ পরিবেশনের জন্য সংবাদকর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অচিরেই বাংলাদেশের ট্যানারি শিল্পকে শিশুশ্রম মুক্ত শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হবে বলে তারা জানান।