একটি দেশ, একটি জাতির উন্নয়নে ব্যক্তির (ইনডিভিজুয়াল) ভূমিকা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাত্ একটি জাতি সভ্য হইয়া উঠিবার ক্ষেত্রে প্রত্যেক ইনডিভিজুয়াল একক ইউনিট হিসাবে আগাইয়া আসিলে তৈরি হয় একটি সমষ্টি। এমন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন সমষ্টি তৈরি হইলে সেই দেশকে আর কেহ দাবাইয়া রাখিতে পারে না। ব্যক্তির ভাগ্য পরিবর্তনের প্রচেষ্টাতেও একই কথা প্রযোজ্য। ব্যক্তির প্রচেষ্টা নিজেকে যেমন উন্নতি আনিয়া দিতে পারে, সেই সঙ্গে দেশের উন্নয়নও ত্বরান্বিত করিতে পারে। ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরআনে পরিষ্কার উল্লেখ রহিয়াছে, যে ব্যক্তি নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন করে না, আল্লাহ নিজেও তাহার ভাগ্য পরিবর্তন করেন না। এই স্পষ্ট বাণী সকলকে বুঝিতে হইবে। তিব্বতের নির্বাসিত বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা দালাইলামা বলিয়াছেন, ইতিবাচক ফল পাইতে হইলে নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখিতে হইবে।
আমরা বহির্বিশ্বের দিকে তাকাইলে কী দেখিতে পাই? যেই সকল জাতির নাগরিকের মধ্যে অসহিষ্ণুতা, কর্মবিমুখতা এবং সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টার প্রতি অনীহা অবহেলা রহিয়াছে; ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব রহিয়াছে—সেই সকল দেশে অভাব, দরিদ্রতা পশ্চত্পদতা পিছু লাগিয়া আছে। নিজেরাও তাহাদের সাহায্য করে না, সৃষ্টিকর্তাও তাহাদের সহায়তায় হাত বাড়াইয়া দেন না। অপরদিকে ইউরোপের অধিকাংশ দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার জনগণের মধ্যে পরিশ্রমের প্রবণতা রহিয়াছে; নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তনে তাহারা সর্বোচ্চ সজাগ রহিয়াছে। আর সেই কারণেই এই দেশগুলিতে আর যাহাই হউক, অর্থনৈতিক দারিদ্র্য নাই। একজন সাধারণ নিয়মিত শ্রমিকও দামি গাড়ি হাঁকাইয়া চলিতে পারেন, জীবন উপভোগ করিতে পারেন। মোদ্দা কথা, একটি দেশের নাগরিকের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা নিজেকে যেমন স্বাবলম্বী করিয়া তোলে, সেই সঙ্গে রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকেও গতিশীল করিয়া থাকে।
ইহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের একটি বিরাট অংশের মধ্যে শিক্ষার অভাব রহিয়াছে, তাহাদের বিরাট অংশ এখনো যথেষ্ট সচেতন হইয়া উঠে নাই। ফলে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে আগাইয়া আসিবার প্রবণতাও বিশেষ লক্ষ করা যায় না। ইহার কারণ যে খানিকটা গাইডলাইনের অভাব তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এই ক্ষেত্রে একটি বড়ো ভূমিকা রাখিতে পারেন। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য রাখাই নহে, মানুষের মধ্যে মূল্যবোধ সৃষ্টি করা, মানসিকতা গঠন এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করাও রাজনীতিবিদদের একটি অবশ্য কর্তব্য বলিয়া আমরা মনে করি। আমরা লক্ষ করিলেই দেখিতে পাই, যেই সকল নির্বাচনী এলাকায় শিক্ষিত, সচেতন জনপ্রতিনিধি রহিয়াছেন, সেই সকল এলাকার মানুষ অপেক্ষাকৃত সহিষ্ণু এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করিয়া থাকেন। একজন উন্নত মানসিকতার জনপ্রতিনিধির দিকনির্দেশনায় তাহার এলাকার জনগণ খানিকটা হইলেও মানসিকতায় উন্নতি করিবে, নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টায় সচল হইয়া উঠিবে ইহাতে কোনোই সন্দেহ নাই। দেশের দুই-একটি অঞ্চলে তাহা পরিলক্ষিতও হইতেছে। সুতরাং জনপ্রতিনিধিদেরই নিজ এলাকার মানুষকে জানাইতে হইবে যে, নিজের উন্নয়নের প্রচেষ্টায় নিজে ঝাঁপাইয়া পড়ো, আল্লাহ তোমাকে সহায়তা করিবেন, আমিও তোমাদের প্রচেষ্টায় শরিক থাকিব। তাহা হইলেই এই দেশের সার্বিক উন্নয়ন বেগবান হইয়া উঠিবে।