রাধাকেশব থেকে রাধারমণ হয়ে ওঠার গল্প নাটক

রাধারমণ

বাঁশিত ধইরা মাইরলো টান; উড়াইলো রাধারো প্রাণ রে। অয় রে ডাকাইত্যা বাঁশির সুরে রে আকুল কইরলো মুরে রে পাগল কইরলো মুরে রে। ডাকাইত্যা বাঁশির সুরে। ‘রাধা রাধা’ বলে যখন রাধাকেশবকে ডাকে মুরারী, তখন সুনামগঞ্জের নলুয়ার হাওড়ের কোল ঘেঁষে পিতা রাধামাধবের দীক্ষায় বেড়ে উঠতে থাকে সে। ভাটি অঞ্চল যে সুরের দেশ, গানের দেশ, ছন্দের দেশ তা আজ নতুন নয়। সেই সুর-গান-ছন্দের বীজ বুনে গেছেন পূর্বসূরি কাহ্নপা, মহাকবি সঞ্চয়, সৈয়দ শাহ নূর, শিতলাং শাহের মতো মহাজনেরা। শিক্ষাগুরু-দীক্ষাগুরু পিতা রাধামাধবের আকস্মিক মৃত্যু যেন হাওড়ের অতলে তলিয়ে দেয় ছোট্ট রাধাকেশব। হাওড়ের পাড় থেকে ভেসে আসে ‘রাধা রাধা’ ডাক। বিচলিত কিশোর রাধাকেশব ঘরছাড়া হয় নিজেকে জানতে। ঘুরতে থাকে হাওড়ের কোলে কোলে। সন্তানের মন ঘুরাতে তাকে বিয়ের বন্ধনে বাঁধে তার মা। বিবাগী মন এবার পূর্ণ সংসারী হয়ে ওঠে। চার সন্তানের জনক হয় রাধাকেশব কিন্তু শোক আর বিয়োগ যেন তার পিছু ছাড়ে না। গ্রামে ওলাবিবির দেখা মিললে এক রাতেই হারিয়ে যায় তার তিন পুত্র ও স্ত্রী। সন্তান আর সঙ্গীহীন হয়ে রাধাকেশব দিশেহারা। একমাত্র জীবিত সন্তান বিপিন তার মামা বাড়িতেই শেষাবধি থেকে যায়। দিশেহারা রাধাকেশব আবারও শুনতে পায় ‘রাধা রাধা’ ডাক; যে ডাক সে শুনতে পেত সেই ছোট্টবেলায়। আজ এত বছর পরে কে ডাকে আবার। সেই একই সুর; একই ভাব। রাধাকেশব সাক্ষাত্ পায় স্বয়ং কৃষ্ণের। জ্ঞানের তৃষ্ণায় তৃষিত রাধাকেশব আবার ছুটে বেড়ায় জ্ঞান আহরণে। দেখা মেলে সাধক রঘুনাথ ভট্টাচার্যের। তার কাছে বৈষ্ণব দর্শনের দীক্ষা নেন তিনি। গুরু রাধাকেশবের নাম থেকে কেশবকে বিযুক্ত করে দেন এবং কৃষ্ণের সঙ্গে রমণের জন্য সাধনা শুরু করতে বলেন। এরপর গুরু রাধাকেশবের নতুন নামকরণ করেন—রাধারমণ। ঘরবাড়ি ছেড়ে নলুয়ার হাওর পাড়ে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন রাধারমণ। বৈষ্ণব মতাদর্শে পরিণত রাধারমণের সঙ্গে দেখা হয় অস্থির হাসনরাজার। রাধারমণের মতাদর্শ তাড়িত করে তাকে। দুজনের ভাবের আদান-প্রদানে ভাটির দেশ সুনামগঞ্জ আরো সমৃদ্ধ হয় মানবের কল্যাণে। রাধারমণ নলুয়ার হাওড়ের পাড় থেকে ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামাঞ্চলে। মান্যবর হতে থাকেন সাধারণের কাছে—নারীর কাছে হোন পূজণীয়—আদরণীয়। নলুয়ার হাওড়ের পাড়ে সেই আশ্রমে মানবের প্রেমের সঙ্গে ঈশ্বরের প্রেম এক অঙ্গে এসে মিলিত হয়। রাধারমণের প্রেমদর্শনে মানব হয়ে ওঠে শিরোমণি। মানুষের ভেতর দিয়ে দেখা মেলে ঈশ্বরের। কৃষ্ণ প্রেমে রাধারমণের লীলাক্ষেত্র হয়ে ওঠে নলুয়ার পাড়।

নাট্যকার নির্দেশক শামীম সাগর যেন সাধক রাধারমণের আদ্যোপান্ত তুলে এনেছেন তার নাটকে। রাধাকেশব থেকে রাধারমণ হয়ে ওঠার গল্প। জ্ঞান অন্বেষণের এবং চর্চার নিমিত্তে তার যে নিবেশ, সেই গল্প। গল্প বুনন আর দৃশ্যায়ন দুটো দুই প্রান্তের গল্প বলেই নাট্যকার-নির্দেশক দুই সত্তা আলাদা হয়ে যায়। তবে দুটো সত্তা আলাদা হতে পারলে নির্মল এক প্রযোজনা নির্দেশককে নাট্যকার থেকে আলাদা করে রাখে। এই আলাদা হওয়াটা একটু জরুরিই বটে। তখন আর নির্মাণ ব্যথিত হয়ে ওঠে না, মোহিত হয়ে ওঠে। এখানে শামীম সাগরের নির্মাণ ব্যথিত করেনি; বরং মোহিত করেছে। তবে নির্দেশক হিসেবে নাট্যকারের সত্তা থেকে খানিকটা নির্মোহ হয়ে নাটকের শুরুর দিকের খানিক অংশ ছেটে ফেললে রাধারমণ দর্শককে আরো বিমোহিত করবে। আবার সেক্ষেত্রে রাধারমণকে আদ্যোপান্ত জানতে ভক্তকুলের বিন্দুমাত্র কমতি হবে না। এবার নির্দেশনার কথা বলা যায়। সাম্প্রতিক সময়ের নাট্য নির্মাণে নির্দেশকের অনেক কিছু দেখানোর এবং অনেক কিছু করার একটা বেশ প্রবণতা লক্ষ করা যায়। সবকিছুকে ছাপিয়ে নির্দেশক দাঁড়িয়ে থাকতে চায়। এই প্রবণতা শিল্পের জন্য নিঃসন্দেহে ভালো তবে নির্দিষ্ট শিল্পে তার পরিমিতিবোধ শিল্পকে বিশেষ মাত্রা দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে একটি কথা বলা যায়, কাব্যে যেমন শ্রবণের আরামের প্রয়োজন পড়ে, তেমনি দৃশ্যে প্রত্যক্ষের আরামের প্রয়োজন পড়ে। চোখের ভালো লাগাই তো মনে গেঁথে থাকে। নির্দেশক শামীম সাগর খানিক বাদে বাদেই চমক দেখানোয় ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু শুরুর দিকে বাঁশ আর লাঠির অতি ব্যবহার নাট্য-মুহূর্ত তৈরিতে খানিক বাধাই দিয়েছে। নাটক যেন নাটকীয় হয়ে উঠেছে রাধারমণের সন্তান বিয়োগের পর থেকে। ডাকাইত্যা বাঁশির সুর সাধনায় পার্থিব জগতের ঊর্ধ্বে পরম সত্তা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে মানব প্রেমিকের মিলন বাসনা যখন সিদ্ধ হয়, তখন রাধারমণও সিদ্ধি লাভ করেন। তার প্রেমও সফল হয় আর রাধা-কৃষ্ণের মিলন তখন সত্য হয়ে ধরা দেয়।

দেবাশীষ তালুকদার শুভ্র, সাদিকুর রহমান খান রুবেল, সামির পল্লব, অমিত বর্মণ, মাহফুজ আলম, আলাউর রহমান, আশীষ বর্মণ, তূর্য দাশসহ সুনামগঞ্জ প্রসেনিয়াম এবং বন্ধন থিয়েটার সুনামগঞ্জের একঝাঁক তরুণ নাট্যকর্মীর যে অক্লান্ত মনোনিবেশ, তা অনেক চরিত্রের সঙ্গে মানানসই না হলেও তাদের একাগ্রতা অবশ্যই প্রশংসনীয়। পোশাক পরিকল্পনায় এনাম তারা সাকি এবং আলোক পরিকল্পনায় বাবর খাদেমী এই প্রযোজনার মান একধাপ করে এগিয়ে নিয়েছেন তাদের পরিকল্পনা আর প্রয়োগে। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রণোদনা বৃথা যায়নি, এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায়।