চলচ্চিত্র একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম। সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা ও বিকাশে চলচ্চিত্রের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এক্ষেত্রে ধর্মীয় নৈতিকতা একটি প্রধান উপাদান। বাংলাদেশে সত্তর ও আশির দশকে ধর্মীয় মূল্যবোধকে সামনে রেখে যে ক’টি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, তার মধ্যে ‘ঈমান’ উল্লেখযোগ্য। আজ থেকে চল্লিশ বছর পূর্বে, তথা ১৯৭৯ সালের ৯ নভেম্বর ‘ঈমান’ প্রথমে ঢাকায় ও পরে সারা দেশে মুক্তি পায়। ছবিটির পরিচালক ছিলেন মমতাজ আলী। শ্রেষ্ঠাংশে ছিলেন ওয়াসিম (রুস্তম ডাকাত), শাবানা (লাইলী), কবরীসহ (ময়না :রুস্তমের ছোট বোন) অনেকেই। সমকালীন ধর্মীয় নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ছবিসমূহের মধ্যে ‘ঈমান’ ছিল চলচ্চিত্র জগতে এক ভিন্নমাত্রার সংযোজন। ছবিটির কাহিনির প্রথমাংশের পর্যালোচনায় দেখা যায়, সারা এলাকার মানুষ ভয়ে কাঁপে একটি নামে। সে নাম রুস্তম ডাকাত। তার নৃশংসতা, অত্যাচার, লুণ্ঠনের জ্বালায় বিনিদ্র রাত কাটায় অনেকে। কিন্তু রুস্তম ডাকাত একপর্যায়ে নিজের অপরাধ উপলব্ধি করে সৃষ্টিকর্তার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে। তখন এক মাজারের খাদেম ও ইমাম তাকে নিরাশ না হয়ে নিজের অপরাধের জন্য আল্লাহর নিকট অনুতপ্ত হওয়া এবং তওবা করার নানা নিয়মকানুন শিখিয়ে দেন। বিশেষত ঐ খাদেম উপদেশ দেন, ‘তুমি এতদিন যাদের ক্ষতি করেছ, তাদের মাঝে ফিরে যাও। তাদের উপকার কর, সেবা কর। ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ যদি তোমাকে ক্ষমা করে তাহলেই তুমি আল্লাহর নিকট মুক্তি পাবে। নিজেকে খাঁটি ঈমানদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং খোদার সান্নিধ্য লাভের জন্য এটিই তোমার প্রধান পথ।’ ‘ঈমান’ ছবিটির মূল চিন্তা, চেতনা ও উদ্দেশ্য এ বিষয়টির সঙ্গেই সম্পৃক্ত। যে অঞ্চলের সর্বসাধারণের নিকট রুস্তম ছিল একজন অত্যাচারী ডাকাত, ঈমান আনার পর সে হয়ে ওঠে একজন শ্রেষ্ঠ সেবক ও কল্যাণকারী। লোকজন তখন তাকে দরবেশ ভাবতে শুরু করে। এভাবে রুস্তম নিজেকে একজন ঈমানদার সুফি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ছবিতে রুস্তম হিসেবে ওয়াসিমের চরিত্রে সত্যিকার দরবেশের প্রতিফলন ঘটে। নায়ক ওয়াসিম প্রায় দু শ ছবিতে অভিনয় করলেও ‘ঈমান’-এর চরিত্রটিই তার সবচেয়ে প্রিয়। বাস্তবিক অর্থেও তিনি দীর্ঘকাল ছবিটির শুটিং স্পট সাভার-মানিকগঞ্জ এলাকায় অনেক মানুষের নিকট ‘দরবেশ’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। (ওয়াসিমের সাক্ষাত্কার :বাংলাদেশ বেতার, গ্রহণে বুশরা, ২২ জুলাই, ২০১৯) এতেই ওয়াসিমের অভিনয় ও ‘ঈমান’ ছবির বাস্তব সার্থকতার পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায়। তাছাড়া এ ছবিতে ওয়াসিম প্রথমে ডাকাত সর্দার পরে তাঁর বোনের খুঁজে বৈষ্ণব রূপ ধারণ এবং সবশেষে জনসাধারণের নিকট একজন দরবেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ—এভাবে একই ছবিতে তিনটি চরিত্রে অভিনয় করে সিনেমা শিল্পে এক অনন্যতার পরিচয় দিয়েছেন। ছবিটিতে অভিনয়ের জন্য তিনি ১৯৭৯ সালে ‘শ্রেষ্ঠ অভিনেতা’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। ওয়াসিমের মতে পরে কোনো এক অজানা কারণে তার নামটি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং সে বছরে কাউকেই ঐ পুরস্কার দেওয়া হয়নি। ‘লাইলী’ চরিত্রে শাবানা ও ‘ময়না’ চরিত্রে কবরীর অভিনয়ও ছিল মনোমুগ্ধকর। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ঐ দুই প্রধান নায়িকাকে যে দু-একটি ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করতে দেখা যায়, ‘ঈমান’ তার অন্যতম। কিন্তু ‘ঈমান’ ছবির কাহিনির কোনো কোনো পর্যায়ে ধর্মীয় কুসংস্কারের চিত্র লক্ষ করা যায়। তবে সার্বিক বিচারে ছবিটিতে অনেকটা ইসলামের সুফি ভাবধারা প্রকাশ পেয়েছে। দেশের সাম্প্রতিক সামাজিক অস্থিরতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের প্রেক্ষিতে মানুষের মাঝে পারস্পরিক সম্প্রীতি, সদ্ভাব ও সাম্যনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘ঈমান’-এর মতো আরো ছবি তৈরি হোক, এটি সুস্থ রুচিসম্পন্ন দর্শকদের প্রত্যাশা।
লেখক :প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি