গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সংগ্রামে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গণতন্ত্রের মানসপুত্র বলা হয়। তিনি অবিভক্ত বাংলার এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর শাসনামলে তিনি গণতন্ত্রের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রকে মুক্ত করার জন্য তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন।

১৯৬০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য আইয়ুব খান পশ্চিম পাকিস্তানের বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে শাসনতন্ত্র কমিশন গঠন করেন। কমিশন ১৯৬২ সালের মে মাসে সংসদীয় গণতন্ত্র সুপারিশ করে প্রতিবেদন দেয়; কিন্তু আইয়ুব খানের নির্দেশে মন্ত্রিসভা প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির শাসনব্যবস্থা অনুমোদন করে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সামরিক শাসন মেনে নেননি। তিনি সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার নির্দেশ দেন। আইয়ুব খান ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি তাকে করাচির বাসভবন থেকে গ্রেফতাঁরকরে জেলে আটক রাখে। সোহরাওয়ার্দীর গ্রেফ-তারের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের ছাত্রসমাজ তাঁর মুক্তির দাবিতে সামরিক আইন ভঙ্গ করে হরতাল, মিছিল শুরু করে।

আইয়ুব খান ১৯৬০ সালে বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। ছাত্রসমাজ ১৯৬২ সালে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। সোহরাওয়ার্দী গ্রেফতার ও শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলা আন্দোলনমুখর হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল। ১৯৬২ সালের ১ মার্চ আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির শাসনতন্ত্র ঘোষণা করেন। ১৯৬২ সালের ১৪ এপ্রিল পূর্ব পাকিস্তানের বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দ আইয়ুব খানের একতরফা শাসনতন্ত্র গ্রহণ ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

তীব্র আন্দোলনের মুখে প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সভাপতি গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ১৯৬২ সালের ১৯ আগস্ট মুক্তি দেন। জেলে ছয় মাস ২০ দিন কারাভোগের পর তিনি মুক্তি পেলেন। জেলে থাকায় তিনি জটিল রোগে আক্রান্ত হন। ১৯৬২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর করাচি থেকে বিমানযোগে ঢাকা তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। কয়েক লাখ জনতা তাঁকে সংবর্ধনা জানায়।

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৬২ সালের ৪ অক্টোবর লাহোরে এক সম্মেলন আহ্বান করেন। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কেএসপি, রিপাবলিকান পার্টি, কাউন্সিল মুসলিম লীগ সভায় যোগ দেয়। সভায় এনডিএফ—National Democratic Front গঠন করা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক দল পুনরুজ্জীবিত হবে না। ১৯৬২ সালের ৭ অক্টোবর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পল্টন ময়দানে ৫ লাখ লোকের উপস্থিতিতে ভাষণ দেন। তিনি সব জেলা, মহকুমায় এনডিএফ গঠন করার নির্দেশ দেন। আওয়ামী লীগের দুই জন, ন্যাপের দুই জন, কেএসপির এক-দুই জন, মুসলিম লীগের এক-দুই জন এবং নেজামে ইসলামের এক জন নিয়ে থানা, মহকুমা জেলা এনডিএফ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এনডিএফ নেতাদের নিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পূর্ব পাকিস্তানের সব জেলা, মহকুমা সফর করেন। লাখ লাখ লোক তাঁর সভায় উপস্থিত হতো। তাঁর আহ্বানে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়।

১৯৬২ সালের ৩১ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী হূদরোগে আক্রান্ত হন। ১৯৬৩ সালের ১৯ মার্চ চিকিত্সার জন্য বৈরুতে গমন করেন। চিকিত্সার পর তিনি লন্ডনে তার পুত্র রাশেদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে থাকেন। চিকিত্সার জন্য তিনি পুনরায় বৈরুত গমন করেন। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে হূদেরাগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ৮ ডিসেম্বর তাঁর লাশ ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছলে লাখ লাখ বাঙালি কান্নায় ভেঙে পড়েন। রমনা রেসকোর্স ময়দানে কয়েক লাখ লোক জানাজায় অংশ নেন। তাঁকে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে শেরে বাংলার মাজারের পাশে সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে পাকিস্তানের রাজনীতিতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়। তিনি ইতিহাসে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

n লেখক :‘হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী’ গ্রন্থের প্রণেতা