ডায়াবেটিস বিশ্ব জুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি রোগ। এই রোগের সঙ্গে পুরোপুরি সম্পর্ক হলো খাবারের। আমাদের খাবারের প্রধান উপাদান কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা ভেঙে তৈরি হয় গ্লুকোজ, যা দেহকোষের শক্তি ও পুষ্টির জন্য অত্যাবশ্যক। শরীরের অত্যাবশ্যকীয় গ্লুকোজ উপাদানটির পরিমাণ সব সময় একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে। ৭০ থেকে ১২০ মিলিগ্রাম বা ডেসিলিটার অথবা ৪ থেকে ৭ মিলিমোল বা লিটার।
একজন পূর্ণবয়স্ক ৭০ কেজি ওজনের মানুষের শরীরে গড়ে ৫ লিটার রক্ত থাকে। রক্তে মোট ৪ থেকে ৫ গ্রাম গ্লুকোজ থাকে। অর্থাত্, ১ চা-চামচ! ভেবেছেন? আপনি যতই খাবার খান না কেন, আপনার রক্তে ১ চা-চামচের বেশি গ্লুকোজ থাকবে না। এই যে গ্লুকোজ এত কমে যাচ্ছে, এটি কে করছে? এটিই করছে ইনসুলিন। অগ্ন্যাশয়ের বিটা সেল থেকে সৃষ্ট ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করতে পারলেই রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। গ্লুকোজ এই সীমার কম বা বেশি হলেই সৃষ্টি হবে শারীরিক সমস্যা বা রোগ। গ্লুকোজ লেভেল বেড়ে গেলে যে রোগগুলো হয়, তার মধ্যে ডায়াবেটিস সবচেয়ে মারাত্মক।
বাবা-মাসহ বংশের কারো ডায়াবেটিস থাকলে, ওজন বেশি হলে, সাইটোমেগালো বা রুবেলার মতো ভাইরাসের সংক্রমণ হলে, উচ্চরক্তচাপ থাকলে, দীর্ঘদিন স্টেরয়েড-জাতীয় ওষুধ সেবন করলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি থাকে।
ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঘন ঘন প্রস্রাব, ঘন ঘন খিদে, অধিক তৃষ্ণা, চোখে ঝাপসা দেখা, অধিক ক্লান্তি, কাটা স্থান সারতে দেরি হওয়া প্রভৃতি।
এসব লক্ষণ দেখা মানেই নিশ্চিত ডায়াবেটিস নয়! তবে লক্ষণগুলো প্রকাশমাত্রই চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী ডায়াবেটিসের ডায়াগনস্টিক টেস্ট করাতে হবে। কারণ ডায়াবেটিস ম্যানেজমেন্ট না করলে তা দিনে দিনে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটিয়ে ফেলবে।
পৃথিবী জুড়ে বর্তমানে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ৪২ কোটি। বাংলাদেশে এই সংখ্যা ৭৩-৮৪ লাখ। বিশ্বে প্রতি বছর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে ৩২-৫০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। শুধু আমেরিকাতেই এই সংখ্যা ২ লাখ। বাংলাদেশেও প্রতি বছর অর্ধলক্ষের মতো মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশে মানুষের মৃত্যুর চতুর্থ কারণ ডায়াবেটিস। তাই ডায়াবেটিস আমাদের দেশে এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আর অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য যে ডায়াবেটিস কত বড়ো অভিশাপ, তা বোঝাতে ICDDRB-এর ২০১৬ সালের জরিপ থেকে দুটি তথ্য দিচ্ছি। দেশে একজন ডায়াবেটিক রোগীকে অন্য আরেকজন ডায়াবেটিকবিহীন রোগীর তুলনায় গড়ে ৯ দশমিক ৭ গুণ বেশি ওষুধ খেতে হয় এবং অন্য রোগীর তুলনায় গড়ে ৬ দশমিক ১ গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়।
ডায়াবেটিস নিয়ে আরো উদ্বেগের কারণ হলো, এটি থেকে হার্টঅ্যাটাকের মতো হূদেরাগ, কিডনির সমস্যা, চোখের সমস্যা, ব্রেইন স্ট্রোক পর্যন্ত ঘটার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই বোঝাই যাচ্ছে যে ডায়াবেটিস কতটা ভয়াবহ ও জটিল রোগ।
ডায়বেটিস পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয়, তবে নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করা সম্ভব। সেজন্য দরকার ডিসিপ্লিনড লাইফ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং চিকিত্সকের পরামর্শমতো নিয়মিত ওষুধ ও ইনসুলিন গ্রহণ। এর বাইরেও মিষ্টি বা চিনিজাতীয় ও আশজাতীয় খাবার পরিহার করা জরুরি।
আর শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন, নিয়মমতো খাবার ও নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তাই আসুন, আমরা আমাদের নিজ নিজ পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবকে ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতন করি, ডায়াবেটিসমুক্ত সমাজ গড়ি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়