রোকেয়ার জ্ঞানপিপাসা সম্পর্কে যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত তাঁর ‘বঙ্গের মহিলা কবি’ গ্রন্থে লিখেছেন—‘বঙ্গের মহিলা কবিদের মধ্যে মিসেস আর, এস, হোসায়েনের নাম স্মরণীয়। বাঙ্গালাদেশের মুসলমান-নারী প্রগতির ইতিহাস- লেখক এই নামটিকে কখনো ভুলিতে পারিবেন না। রোকেয়ার জ্ঞানপিপাসা ছিল অসীম। গভীর রাত্রিতে সকলে ঘুমাইলে চুপি চুপি বিছানা ছাড়িয়া বালিকা মোমবাতির আলোকে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার কাছে ইংরাজী ও বাংলায় পাঠ গ্রহণ করিতেন
সত্তরের দশকে বাংলা সিনেমা ‘সূর্যকন্যা’র নায়িকার কণ্ঠে গাওয়া একটি জনপ্রিয় গান ‘আমি যে আঁধারে বন্দিনী, আমারে আলোতে ডেকে নাও।’ এর বহু পূর্বেই নারীকে অন্ধকার থেকে মুক্ত করে আলোর পথে ডাক দিয়েছিলেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন; তাই তাঁকে নারী জাগরণের অগ্রদূত বলা হয়। শুধু সাহিত্যে নয়, সমাজেও নারীমুক্তি আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে তিনি পরিচিত। কেননা তিনি লেখনী ধারণ করেছিলেন নারীশিক্ষা ও নারীমুক্তির উদ্দেশ্যে। শিক্ষাব্রতী, মুক্তবুদ্ধির চর্চাকার সর্বোপরি বাঙালি নারীর আলোর পথের দিশারি বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যু একই মাসের একই তারিখে—জন্ম ৯ ডিসেম্বর, ১৮৮০; মৃত্যু ৯ ডিসেম্বর, ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দ। তাই এবছর ৯ ডিসেম্বর তাঁর ১৩৯তম জন্মবার্ষিকী ও ৮৯তম মৃত্যুবার্ষিকী।
বার্ট্রন্ড রাসেল বলেছিলেন, ‘যাঁরা নতুন উদ্ভাবক ও প্রবর্তক, তাঁদের অস্তিত্ব রক্ষা ও কাজ করে যাওয়াতেই যত বিপদ।’ নারীমুক্তির প্রবর্তক ও পথপ্রদর্শক রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন প্রতিকূল প্রতিবেশে সর্বক্ষণ সংগ্রাম করে নিজ সত্তা ও স্বাধীন চিন্তা-চেতনাকে অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন। মুক্তবুদ্ধির অনুসারী ও নারীর স্বাধীনতায় বিশ্বাসী রোকেয়া ধর্মীয় গোড়ামি ও পশ্চাত্পদতা দূরীকরণে এবং নারীসমাজকে সচেতন ও সাহিত্য-শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী পত্রিকায় তাঁর লেখাগুলো প্রকাশ করেন। নারীর শিক্ষা, সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে প্রকাশ করেছেন প্রবন্ধ, ছোটগল্প, উপন্যাস। ‘মতিচূর’ (১ম খণ্ড ১৯০৪, ২য় খণ্ড ১৯২২), ‘অবরোধ-বাসিনী’ (১৯৩১), ‘পদ্মরাগ’ (১৯২৮) তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম।
রোকেয়া মূলত মুসলিম সমাজের কুসংস্কার ও জড়তা দূর করার জন্য নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কেননা রোকেয়া যে সমাজে ও রীতির যুগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তা অস্বাভাবিক ও অমানবিক। কারণ সে যুগে প্রাণীপ্রজাতির স্বাভাবিক সুস্থ-সবল দেহ বিকাশের ও প্রকাশের জন্য যে মুক্ত আলো-হাওয়ার প্রয়োজন, মুসলিম সমাজে নারীকে তার থেকেও বঞ্চিত করা হতো। রোকেয়া এ পরিস্থিতি তুলে ধরেন লেখনীতে ‘নিরীহ কোমলাঙ্গী অবলারা বন্দিনী থাকে।’ (সুলতানার স্বপ্ন)।
সমাজপরিস্থিতির এই অবস্থা থেকে নারীসমাজের মানবিক ও স্বাভাবিক উত্তরণের জন্য যে পন্থা অবলম্বন করলেন তিনি তা কুসুমাস্তীর্ণ কিংবা কণ্টকমুক্ত ছিল না। তা ছিল দীর্ঘ সকরুণ, অপোসহীন ও নিদারুণ সংগ্রামের কাহিনি। ‘মতিচূর’-এর প্রথম খণ্ডে ‘অর্ধাঙ্গী’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, শারীরিক শক্তিতে নারী অপেক্ষাকৃত দুর্বল, শুধু এই কারণেই স্বামী স্ত্রীর ‘প্রভু’ হতে পারে না, কেননা নারী ও পুরুষের উভয়কেই উভয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়, সে হিসেবে উভয়ের মূল্য সমান। অর্থাত্ একদিকে নারীর পশ্চাত্পদতা ও নারীমুক্তির অন্তরায় স্বরূপ রমণীর শারীরিক দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছেন, অন্যদিকে মস্তিষ্কবলে নারী পুরুষের সমকক্ষ বলে উল্লেখ করেন। তিনি এটিও উল্লেখ করেন যে, সমাজের উন্নতির জন্যে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ একান্ত আবশ্যক। রোকেয়া বলেন, ‘নরনারী উভয়ে একই সমাজ-দেহের বিভিন্ন অঙ্গ—পুরুষ শরীর, রমণী মন।’ (সুলতানার স্বপ্ন)।
নারীর সামাজিক উন্নয়নে রোকেয়ার স্বপ্নে যেন কাজী নজরুল ইসলামও আশাবাদী হয়েছিলেন। তিনিও রোকেয়ার মতো নর-নারীর সম অধিকার ও কর্তব্যে বিশ্বাসী ছিলেন। তাইতো বলেন, ‘দিবসে দিয়াছে শক্তি-সাহস, নিশীথে হয়েছে বধূ,/পুরুষ এসেছে মরুতৃষা লয়ে, নারী যোগায়েছে মধু।/শস্যক্ষেত্র উর্বর হ’ল, পুরুষ চালাল হল,/নারী সেই মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল।’ (নারী)।
রোকেয়া বিশ্বাস করেন পুরুষ যদি আজ নারীকে অবহেলা করে, অবহেলা করে তার শক্তি ও বুদ্ধিকে, বন্দি করে রাখে অন্ধকারে, তাহলে পরের যুগে আপনার গড়া বন্দিশালায় পুরুষ নিজেই বন্দি হবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সেদিন খুব দূরে নয়, যেদিন পুরুষের পাশাপাশি নারীরও জয় ঘোষিত হবে ধরণীতে। তাঁর দৃষ্টিতে নারী পুরুষের সমকক্ষ এবং এ বিশ্বের উন্নতি ও কল্যাণকর কাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীরও সমান অংশগ্রহণ রয়েছে।
সমাজ পুরুষসৃষ্ট নিয়মের বেড়াজালে বন্দি নারীর স্বাধীনতা ও নারীর অধিকার। নারীদের এ বিপর্যস্ত অবস্থা যা রোকেয়া তাঁর লেখায় তুলে ধরেছেন সেই অবস্থা যেন নজরুল তাঁর সময়েও প্রত্যক্ষ করেন। বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদকে লেখা একটি পত্রে তিনি লিখেছেন—‘আমাদের দেশের মেয়েরা বড় হতভাগিনী, কত মেয়েকে দেখলাম কত প্রতিভা নিয়ে জন্মাতে, কিন্তু সব সম্ভাবনা তাদের শুকিয়ে সমাজের প্রয়োজনের দাবিতে, ঘরের প্রয়োজন তাদের বন্দিনী করে রেখেছে। এত বিপুল বাহির যাদের চায়, তাদের ঘিরে রেখেছে বারো হাত লম্বা আটহাত চওড়া দেওয়াল।’ সেইসঙ্গে নজরুল আশা করেন এই ঘরে বন্দিনী নারীরা একদিন বিদ্রোহিনী হয়ে ঘরের দ্বার ভেঙে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু বেগম রোকেয়া জানেন নারীর এ বন্দিদশা বেশিদিনের জন্যে নয়। কেননা তিনি নারীদের পুরুষের সঙ্গে বিস্তর ফারাকের কারণ উপলব্ধি করেন। নারীর দরকার অর্থনৈতিক মুক্তি। সমাজ পুরুষকে অধিকার ও স্বাধীনতা দিচ্ছে, নারীদের তা থেকেই বঞ্চিত করছে। তাই এই পশ্চাত্পদতা থেকে পরিত্রাণের জন্য নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে নারী স্বাধীন হলে, কর্মক্ষেত্রে নিজেকে যুক্ত করতে পারলে পুরুষ ও নারীর মধ্যে দূরত্ব কমে সমকক্ষ হয়ে উঠবে। যেমনটা সিমন দ্য ব্যুভেয়ার ‘The Secand Sex’-এ বলেন, ‘নারী ও পুরুষের মধ্যে তৈরি করেছে যে দূরত্ব অর্থকরী চাকুরির মাধ্যমে নারী তা অধিকাংশ পেরিয়ে এসেছে এবং তাছাড়া নারীমুক্তি অন্য কোনো উপায়ে নেই।’
ঠিক একইভাবে বেগম রোকেয়া বাঙালি নারীর মুক্তির পথ দেখিয়ে দিলেন ‘আবশ্যক হইলে আমরা লেডি কেরানি হইতে আরম্ভ করিয়া লেডি ম্যাজিস্ট্রেট, লেডি জজ—সবই হইব। পঞ্চাশ বত্সর পরে লেডি (Viceroy) হইয়া এ দেশের নারীকে ‘রানী’ করিয়া ফেলিব।’ (স্ত্রীজাতির অবনতি)। অর্থাত্ পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য নারীকে যদি স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করতে হয়, তা-ই করার কথা বলেন। কেননা নারী তার স্বামীর ঘরে যে পরিশ্রম করে, সে পরিশ্রম সে কর্মক্ষেত্রে করলে যথেষ্ট উপার্জন করতে সক্ষম হবে বলে তিনি মনে করেন। রোকেয়া যে আশা ব্যক্ত করেছেন তারপর ১১৫ বছর অতিক্রান্ত। নারীরা আজ রোকেয়ার প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে সকল সেক্টরে পুরুষের সঙ্গে সমানতালে পদচারণা করছে। নারীর মুক্তির দলিলস্বরূপ রোকেয়ার গ্রন্থসমূহ আজকের নারীর অনুপ্রেরণার উত্সমূলে। বেগম রোকেয়ার অবদান সম্পর্কে আবদুল হক তাঁর ‘বেগম রোকেয়া’ প্রবন্ধে বলেন—‘আধুনিক জাগরণশীল বাঙালি মুসলিম-সমাজে তিনি উল্লেখযোগ্য লেখিকা অধিকন্তু আধুনিক বাঙালি মুসলিম জাগরণের তিনি প্রতীক।’ সকল ক্ষেত্রে নারীর আত্মবিকাশ ও মানবীয় সত্তার প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর চিন্তার লক্ষ্য। তিনি ও তাঁর গ্রন্থসমূহ আজকের নারীদের কাছে পরম সম্পদ ও প্রেরণার উত্স। তাই তো আজকের যুগের বাংলা সিনেমায়ও নারী সমস্বরে গেয়ে ওঠে—‘আর নেবো না, নেবো না, নেবো না অন্যায় মেনে/ আর রবো না, রবো না, রবো না ঘরের কোণে/ আজকে এসেছে সেই দিন মাথা তুলে দাঁড়াবার/ আমরা পেতে চাই নারী পুরুষ সম সম অধিকার।’ যে নারী একসময় অন্ধকার থেকে মুক্তির জন্যে কাউকে আহ্বান করত, সেই নারীই আজ আলোর পথের সন্ধান পেয়ে অধিকার-সচেতন হয়ে উঠেছে। নারীদের এই অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার অগ্রপথিক রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।
১৯ শতকের দিকে মেয়েরা বাড়ির বাইরে পা রাখবে, সেই কথাটাই কেউ চিন্তা করতে পারত না! কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তাধারা বদলায়, সেইসঙ্গে বদলে যায় সমাজব্যবস্থা। কিন্তু এই পরিবর্তন কি হঠাত্ করেই ঘটেছে? নিশ্চয়ই না। সমাজে পরিবর্তন আনতে চাইলে প্রয়োজন সমাজসংস্কারক। আর এদেশের নারীদের অন্ধকার কূপ থেকে টেনে তুলতে যিনি সবার আগে এগিয়ে এসেছিলেন, তিনি হলেন বেগম রোকেয়া। তিনি যে স্বপ্নের বীজ বপন করেছেন তার ফসল বর্তমান শতাব্দীর নারী। এখন আমরা নারীরা যে অবাধে পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করতে পারছি, তার অগ্রপথিক তিনি।
রূপকথার রাজকন্যাদের মতোই ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর, রংপুর জেলার পায়রাবন্দের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার বাড়ির ঘর আলো করে আসেন বেগম রোকেয়া। পিতা জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের ছিলেন দিনাজপুর জেলার সবচাইতে প্রভাবশালী ব্যক্তি। আর তাঁর মাতা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। তাঁরা দুজনেই ছিলেন বেশ উচ্চবংশীয় এবং জমিদার শ্রেণিভুক্ত। নিজেদের জমিদারি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বেগম রোকেয়া বলেন, ‘আমাদের অবস্থা সচ্ছল ছিল—আমরা প্রায় সুখে খাইয়া পরিয়া গা ভরা গহনায় সাজিয়া থাকিতাম... আমাদের এ অরণ্যবেষ্টিত বাড়ির তুলনা কোথায়! সাড়ে তিন বিঘা লাখেরাজ জমির মাঝখানে কেবল আমাদের এই সুবৃহত্ বাটী।’ তখনকার সময় মেয়েদের ঘরের বাইরে পড়াশোনা করা ছিল কল্পনাতীত। তাই নিজগৃহে আরবি এবং উর্দু ভাষার পাশাপাশি বড় ভাই ইব্রাহীম সাবেরের কাছে বাংলা ও ইংরেজি শিখেন। তাই বেগম রোকেয়া তাঁর ‘পদ্মরাগ’ উপন্যাসটি বড় ভাইয়ের নামে উত্সর্গ করেছিলেন—‘দাদা! আমাকে তুমিই হাতে গড়িয়া তুলিয়াছ।’
রোকেয়ার জ্ঞানপিপাসা সম্পর্কে যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত তাঁর ‘বঙ্গের মহিলা কবি’ গ্রন্থে লিখেছেন—‘বঙ্গের মহিলা কবিদের মধ্যে মিসেস আর, এস, হোসায়েনের নাম স্মরণীয়। বাঙ্গালাদেশের মুসলমান-নারী প্রগতির ইতিহাস- লেখক এই নামটিকে কখনো ভুলিতে পারিবেন না। রোকেয়ার জ্ঞানপিপাসা ছিল অসীম। গভীর রাত্রিতে সকলে ঘুমাইলে চুপি চুপি বিছানা ছাড়িয়া বালিকা মোমবাতির আলোকে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার কাছে ইংরাজী ও বাংলায় পাঠ গ্রহণ করিতেন। পদে পদে গঞ্জনা সহিয়াও এভাবে দিনের পর দিন তাঁহার শিক্ষার দ্রুত উন্নতি হইতে লাগিল। কতখানি আগ্রহ ও একাগ্রতা থাকিলে মানুষ শিক্ষার জন্য এরূপ কঠোর সাধনা করিতে পারে তাহা ভাবিবার বিষয়।’
স্বামীর হাত ধরেই বেগম রোকেয়া পেয়েছিলেন স্বাধীনতার স্বাদ, নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করার সুযোগ। ১৮৯৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সেই ভাগলপুরের উর্দুভাষী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সাথে বেগম রোকেয়া বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ছিলেন আধুনিকমনস্ক, বেগম রোকেয়াকে তিনিই লেখালেখি করতে উত্সাহিত করেন। ১৯০৯ সালে সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যুর পর বেগম রোকেয়া মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও হাল ছাড়েননি। প্রথমে ভাগলপুরে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ পরবর্তীসময়ে ১৯১১ সালের ১৫ মার্চ কলকাতার ১৩ নম্বর ওয়ালীউল্লাহ্ লেনের একটি ভাড়া বাড়িতে তিনি দ্বিগুণ উদ্যমে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ চালু করেন। ১৯৩০ সালে সেটি উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। বেগম রোকেয়া তাঁর জীবনসংগ্রামের মাধ্যমে বুঝতে পেরেছিলেন যে শিক্ষা ছাড়া নারীর মুক্তি কখনো সম্ভব নয়। একমাত্র শিক্ষাই পারে আমাদেরকে মুক্তির আলোয় আলোকিত করতে। নানা বাধা উপেক্ষা করে ঘরে ঘরে যেয়ে তিনি মেয়েদেরকে বিদ্যালয়ে আসতে অনুরোধ করতেন। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। প্রবল আগ্রহ আর নিরলস পরিশ্রমের কারণে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এখন সেই নারীশিক্ষা আন্দোলন বেশ সফলতা লাভ করেছে। ঘরে-বাইরে, সমাজ-রাষ্ট্রে সর্বত্র নারীরা দাপটের সঙ্গে কাজ করছে। তিনি পুরুষতান্ত্রিক কিংবা নারীতান্ত্রিক সমাজ গড়তে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন সমাজে নারী ও পুরুষ যাতে একসঙ্গে সমান মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে বাঁচে। তাই তো তিনি বলেছেন—‘মেয়েদের এমন শিক্ষায় শিক্ষিত করিয়া তুলিতে হইবে, যাহাতে তাহারা ভবিষ্যত্ জীবনে আদর্শ গৃহিণী, আদর্শ জননী এবং আদর্শ নারীরূপে পরিচিত হইতে পারে।’
বেগম রোকেয়া ছিলেন একজন দূরদর্শী সমাজসংস্কারক। তাঁর সমাজসেবা শুধু বিদ্যালয় তৈরি করা পর্যন্ত থেমে থাকেনি। ১৯১৬ সালে তিনি বাঙালি মুসলিম নারীদের সংগঠন ‘আঞ্জুমান খাওয়াতিনে ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করেন।
স্বপ্নের পথে এগিয়ে নারীরা
নারীরা এখন শুধু রেঁধে কিংবা চুল বেঁধেই তাদের দিন অতিবাহিত করেন না। এখন তারা সবখানেই নিজের জায়গা করে নিচ্ছেন নিজ নিজ যোগ্যতা, মেধা, বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে। আমাদের দেশের নারীদের সরব অবস্থান এখন কেবল পরিবারেই সীমাবদ্ধ নেই, সমাজের বিভিন্ন স্তরে—প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, আনসার ভিডিপি, বিজিবি, বিমান পরিচালনা, ট্রেন পরিচালনা, চিকিত্সা, প্রযুক্তি, শিক্ষকতা, নার্সিং, রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনীতি—সর্বত্র নারীর বিচরণ সবার আগে। সরকারপ্রধান, বিরোধী দলীয় প্রধান, জাতীয় সংসদের স্পিকার থেকে শুরু করে তৃণমূলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, বিশ্ববিদ্যালয়সহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান—সব স্তরেই নারীরা মেধার স্বাক্ষর রাখছে।
শিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত, শিক্ষাবঞ্চিত—সর্বস্তরের নারীই কোনো না কোনোভাবে অর্থনীতিতে নিরবচ্ছিন্ন অবদান রাখছেন। সরকারি সংস্থা বিডিএসের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, জিডিপিতে কর্মজীবী নারীদের অবদান ২০ শতাংশ। অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রম হিসাব করলে ৪০ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন সমীক্ষার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ১ কোটি ৬৮ লাখ নারী অর্থনীতির সূচকের তিন খাত—কৃষি, শিল্প ও সেবাখাতে কাজ করছেন। অর্থনীতিতে নারীর সাফল্য বেড়েছে, নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে উত্পাদনব্যবস্থায়।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শিক্ষকতায় বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয় (সরকারি-বেসরকারি), কিন্ডারগার্টেনসহ মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পুরুষ শিক্ষকের চেয়ে নারী শিক্ষক অনেক বেশি। অনুরূপভাবে চিকিত্সা ও নার্সিংসহ সকল ক্ষেত্রে কল্পনাতীতভাবে এগিয়ে চলছে নারীরা।