তিড়িং। শোল মাছের ছোট্ট পোনা। থাকে এক বড়ো নদীতে। নদীতে অনেক পানি। সেই পানিতে সবসময় তিড়িং বিড়িং করে লাফায় বলে মা ওর নাম রেখেছে তিড়িং। তিড়িং দেখতে এখনো কিছুটা ব্যাঙাচির মতো। সরু একটা শরীরের সাথে ইয়া এক মাথা। তিড়িং আর তার অনেক অনেক ভাইবোন ঝাঁক ধরে সারাদিন মায়ের পিছে পিছে সাঁতরে বেড়ায়। মা ওদের কী খেতে হবে আর কী খেতে হবে না তা শেখায়। এখন ওরা শেওলা খায়। ক’দিন পরে পানির পোকা খাওয়া শিখবে।
কিছুদিন গেল। এখন তিড়িং বেশ বড়ো হয়েছে। শরীর ঢেকেছে আঁশে। পিঠের দিকটা কালো কুচকুচে। আর পেটের দিকটা হলদেটে সাদা। পুরো শরীর যেন পিচ্ছিল জেলি মাখানো। শোল মাছের পিঠে-পেটে কোনো কাঁটা নেই; ওদের শরীরটা তাই ভারি পিচ্ছিল—যাতে সহজে কেউ ধরতে না পারে। বেশ কয়েকটা পাখনা আছে ওর। যার জন্যে সাঁতরে বেড়াতে পারে আরামে। ওর ইচ্ছে করে দূরে যেতে; কিন্তু মা দেয় না। মা বলে, একা পেলেই নাকি বোয়াল-পাঙ্গাশ মাছেরা গিলে খেয়ে ফেলবে। ও তাই এখনো শেওলা দামের আড়ালে আড়ালেই থাকে।
আরো কিছুদিন গেল। ওরা এখন মা ছাড়াই ঝাঁক বেঁধে এদিক ওদিক যায়। পোকা ধরে খায়। শরীরটা বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে লেজটা। শত্রুকে ঘায়েল করতে লেজের ঝাপটা দারুণ কাজে লাগে, জেনে গেছে ওরা। রাক্ষুসে সব মাছদের মা চিনিয়ে দিয়েছে, ওদের থেকে বাঁচার কৌশলও শিখে নিয়েছে। কিন্তু মা বলেছে—এসব রাক্ষুসে মাছের চেয়ে মাছ শিকারি মানুষগুলো নাকি আরো সাংঘাতিক। জাল দিয়ে তারা নদীর মাছ প্রতিদিন ধরে নিয়ে যায়। মা ওদের পানির ওপর দিকে যেতে বারণ করেছে। ওরা যায় না। তবু কখনো রাক্ষুসে মাছের পেটে; কখনো জেলের জালে আটকে পড়ে তিড়িংয়ের ভাইবোনের সংখ্যা কমে আসতে থাকল। এখন আর মা ওদের পাহারা দেয় না। বলে দিয়েছে, নিজেকেই বুদ্ধি খাটিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। তিড়িংরা খুব সর্তক থাকে বিপদ যাতে না আসে।
কিন্তু তাই বলে কি সবসময় সব কথা মনে থাকে। সেদিন ঘুরতে ঘুরতে যেই ওরা ওপরের দিকে চলে গিয়েছে অমনি ঝপাত্ করে ওদের ওপর পড়ল এক জাল। বুঝে উঠতে না উঠতে জেলেদের জালে তিড়িংয়ের ভাইবোন একসাথে ধরা পড়ে গেল। শুধু তিড়িং কোনোমতে পালিয়ে বাঁচল। ভাইবোন হারিয়ে তিড়িংয়ের মন খারাপ থাকল কিছুদিন। তখন তেলাপিয়া, সরপুঁটি, টাকি মাছের সাথে বন্ধুত্ব হলো। এদিকে ছোট মাছ পুঁটি, মৌরলা, কাচকি ওকে দেখে পালিয়ে যায় এখন। তিড়িং বোঝে সে বড়ো হয়েছে। তাকেই এখন ছোট মাছেরা শিকারি মাছ বলে ভয় পায়।
আরো দিন গেল। তিড়িং বেশ তাগড়া এখন। তার ইচ্ছে হলো পানির বাইরের জীবনটা দেখার। তাই একদিন সে পানির ওপর দিকে উঠে এলো। তখন একটা ছোট ছেলে নদীর ধারে বালির ওপর বল খেলছিল। তিড়িং ভাবল সেও বালির ওপর খেলবে। যেই ভাবা সেই কাজ। তিড়িং দিল জোরে এক লাফ। গিয়ে পড়ল বালিতে। ছেলেটা তিড়িংকে দেখে প্রথমে ভয় পেল। তারপর দৌড়ে কাছে এল। তিড়িংয়ের কালো চকচকে চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এমা, কী সুন্দর একটা শোল মাছ!’
তিড়িং মাছের ভাষায় বলল, ‘তোমার সাথে বল খেলতে এসেছি।’
ছেলেটা বলল, ‘চল, তোকে বাড়িতে নিয়ে যাই।’
তিড়িং ঠিক বুঝতে পারল না যাওয়া ঠিক হবে কি না।
ছেলেটা ওকে দু’হাত দিয়ে জাপটে ধরে কোলের মধ্যে নিল। তিড়িং বাধা দিল না। না হলে তিড়িংয়ের গা যা পিছল ছেলেটা কিছুতেই ওকে ধরে রাখতে পারত না। ছেলেটা নাচতে নাচতে বাড়ির দিকে যেতে যেতে ডাকল, ‘মা, ওমা দেখো, কী পেয়েছি। কেটেকুটে এখনই আমাকে ঝোল রেঁধে দাও, মজা করে খাব।’
তিড়িং বুঝল ছেলেটা তাকে খেয়ে ফেলার জন্যে নিয়ে যাচ্ছে। ও তাড়াতাড়ি গায়ের সব শক্তি দিয়ে লেজের একটা ঝাপটা দিল ছেলেটার গায়ে। ছেলেটা ওকে আর ধরে রাখতে পারল না। তিড়িং মাটিতে পড়েই দিল লাফ। লাফ লাফ লাফ। নদীতে পড়ল। তারপর শোঁ শোঁ করে চলে গেল একেবারে নদীর তলায়।
শেওলা-শৈবাল হেলে-দুলে ওকে জায়গা করে দিল বিশ্রাম নেওয়ার। খবর পেয়ে তেলাপিয়া, টাকি, সরপুঁটি মাছ এসে গা-ঘেঁষে বসল ওর। কী ঘটেছে শুনবে সবাই। তিড়িং হাসিমুখে ঘটনা বলতে শুরু করল। নদীও তখন ওর কথা শোনার জন্যে শান্ত হয়ে রইল।