ন্যাটো সম্মেলনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি

সদ্যসমাপ্ত ন্যাটো সম্মেলনে বলিতে গেলে কোনো বিষয় লইয়াই সুগঠিত কোনো আলোচনা হয় নাই। বরং আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে লইয়া ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডার সরকারপ্রধানদিগের হাসি-তামাশার ভিডিও ফাঁস হইবার পরে একপ্রকার তাড়াহুড়ার মধ্য দিয়া সম্মেলন সমাপ্ত হইয়াছে। অবশ্য সম্মেলন শুরু হইবার কয়েক দিন পূর্বে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ কর্তৃক ন্যাটোকে ‘মৃত মস্তিষ্কের’ সংগঠন হিসাবে চিহ্নিত করিবার পর হইতেই পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছিল। বিশেষ করিয়া ম্যাক্রোঁর মন্তব্যের ব্যাপারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র প্রতিক্রিয়ার কারণে এই সম্মেলন কিছুটা উত্তাপে ভরা থাকিবে বলিয়াই ধরা হইয়াছিল। শেষ পর্যন্ত তাহাই হইয়াছে।

নূতন যুগে নূতন সময়ে আসিয়া সাত দশকের পুরানো ন্যাটোর ভূমিকা কেমন হইবে তাহা লইয়া সামান্য কিছু আলোচনা হইয়াছে। এই সব আলোচনায় চীনের মহা উত্থান হইতে শুরু করিয়া মহাকাশে ন্যাটোর সামরিক উপস্থিতি এবং সাইবার জগতে রাশিয়ার প্রভাবের মতো প্রসঙ্গগুলি আসিয়াছে। তবে এই সকল আলোচনা যে খুব একটা বিস্তারিত পর্যায়ে হইয়াছে, তাহা মনে করিতেছেন না বিশ্লেষকেরা। এইদিকে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করিতেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতিগতির ব্যাপারে খুব একটা আস্থা রাখিতে না পারিবার কারণেই ন্যাটোবিষয়ক কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্য কয়েকটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিধার ভাব দেখা দিয়াছে। বিশেষ করিয়া, দীর্ঘদিন ধরিয়া সিরিয়াতে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইকারী কুর্দিদিগকে তিনি যেইভাবে পরিত্যাগ করিয়াছেন তাহা ন্যাটোভুক্ত অনেক দেশকেই ভাবাইয়া তুলিয়াছে।

এইবারের সম্মেলনে, বিশেষ করিয়া ম্যাক্রোঁর মধ্যে ন্যাটোকে গতিশীল করিয়া তোলার ব্যাপারে তাড়া লক্ষ করা গেলেও, ট্রাম্পের ভূমিকা ছিল দৃশ্যমানভাবেই ভিন্ন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইয়াছে যে ন্যাটোর চাঁদা যথাযথভাবে পরিশোধ না করিবার কারণে অন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে কড়া কথা শুনাইবার জন্যই তিনি সম্মেলনে উপস্থিত হইয়াছেন। উল্লে­খ্য, আমেরিকা শুরু হইতেই ন্যাটোর অর্থের প্রধান  জোগানদাতা। কিন্তু ক্ষমতায় আসিবার পর হইতে ট্রাম্প এই চিত্র পালটাইবার চেষ্টা করিতেছেন। তাহার মতে, ইউরোপের জন্য সুরক্ষা চাহিলে ন্যাটোর সদস্যদিগকে বিপুল মাত্রায় চাঁদার পরিমাণ বাড়াইতে হইবে। তাহা না হইলে আমেরিকা চাঁদার পরিমাণ কমাইয়া ফেলিবে বলিয়াও হুমকি দিয়াছিলেন ট্রাম্প। সম্মেলনের কয়েক দিন পূর্বে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ট্রাম্প প্রশাসন এই ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত  লইয়া ফেলিয়াছে বলিয়াও জানানো হয়। ট্রাম্পের সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের এই ধরনের অবস্থান শেষ বিচারে পশ্চিমা দুনিয়ার নেতা হিসাবে আমেরিকার অবস্থানকে দুর্বল করিয়া ফেলিতেছে। সংগঠনের কর্মকাণ্ডের ধরন ও চাঁদা লইয়া মতানৈক্য কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের শীতলতাজনিত কারণে ন্যাটো সামনের দিনগুলিতে কোনো পথে অগ্রসর হইবে তাহা লইয়া বিশেষজ্ঞ মহল খুব একটা ধারণা করিতে পারিতেছে না। তবে এই বিষয়ে অনেকে একমত যে  ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থাতে ন্যাটো কখনোই আর নিজেকে পূর্বেকার মতো পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষাকারী সংগঠন হিসাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভূমিকায় রাখিতে পারিবে না।