চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের শুরু থেকেই রপ্তানি আয় কমতির দিকে। প্রতি মাসে এ ব্যবধান বাড়ছে। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে রপ্তানি আয়ে বড়ো ধাক্কা এসেছে। আলোচ্য সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ। অন্যদিকে গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ। সবমিলিয়ে গত জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে রপ্তানি আয় কমেছে পূর্বের অর্থবছরের একই সময়ের ১২৯ কোটি ৬৭ লাখ ডলার বা ১০ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। পাঁচ মাসে রপ্তানি কমেছে ৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ পরিসংখ্যানে এ তথ্য জানা গেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রধান রপ্তানি পণ্য গার্মেন্টস ছাড়াও চামড়া, হিমায়িত খাদ্য ও কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি বেড়েছিল সন্তোষজনক হারে। ক্রমাগত রপ্তানির কমার এ চিত্রে দুশ্চিন্তা বেড়েছে রপ্তানিকারকদের।
গার্মেন্টস শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ইত্তেফাককে বলেন, অনেক কারখানারই সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকই অব্যবহূত থেকে যাচ্ছে। আমার নিজের কারখানায়ও একই অবস্থা। এটি শঙ্কা তৈরি করেছে। অথচ এই সময়ে রপ্তানি বাড়ার কথা। রপ্তানি কমার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে কিছু ক্রয়াদেশ স্থানান্তর হয়ে মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে নতুন মজুরি বাস্তবায়ন ছাড়াও গ্যাস-বিদ্যুতের দর বৃদ্ধির কারণে আমাদের উত্পাদন খরচ বেড়েছে। প্রতিযোগী দেশগুলোর স্থানীয় মুদ্রা ডলারের বিপরীতে দুর্বল হওয়ায় তারা আমাদের চেয়ে প্রতিযোগিতামূলক দরে অর্ডার নিতে পারছে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী পোশাকের দরও কমতির দিকে। সব মিলিয়ে আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ বেড়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রপ্তানির জন্য ডলারের আলাদা মূল্য নির্ধারণসহ সরকারের নীতি সহায়তা চেয়েছেন তিনি।
অবশ্য রপ্তানিকারকের একটি অংশ আগামী মাসগুলোয় রপ্তানি বাড়বে বলে আশাবাদী। ফতুল্লা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান ইত্তেফাককে বলেন, আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি বাড়বে বলে আশা করছি। আমার নিজের কারখানায় ইতিমধ্যে ক্রয়াদেশ বাড়তে শুরু করেছে। অন্যদের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বড়ো বাজার ইউরোপ এবং বিশেষভাবে জার্মানি। জার্মানিতে রপ্তানি কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে পুরো রপ্তানিতে। তবে আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি বাড়লেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থেকে বেরিয়ে আসা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি।
ইপিবির হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ মাসে ১ হাজার ৮০৫ কোটি ডলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৫৭৭ কোটি ৭১ লাখ ডলারের। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৭০৭ কোটি ডলারের। রপ্তানির প্রায় ৮৪ শতাংশই আসে গার্মেন্টস পণ্য থেকে। গত পাঁচ মাসে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি কমেছে প্রায় পৌনে আট শতাংশ। এছাড়া লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি কমেছে সাড়ে ১৩ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী দেশগুলো পণ্য বহুমুখীকরণ, গুণগত মান, ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত সরবরাহ প্রক্রিয়ায় যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ সেভাবে পারছে না। অন্যদিকে এক পণ্যনির্ভর হয়ে যাওয়ায় সার্বিক রপ্তানিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সামষ্টিক অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ইত্তেফাককে বলেন, গার্মেন্টস নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে নতুন পণ্য রপ্তানি ও নতুন বাজার সৃষ্টিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে ইপিবিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সমন্বিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এ লক্ষ্যে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। এছাড়া বিদেশে অবস্থিত দূতাবাসগুলোকেও ভূমিকা রাখতে হবে।
গার্মেন্টস ছাড়াও গত পাঁচ মাসে রপ্তানি কমার তালিকায় রয়েছে হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ ৭ দশমিক ৬২ শতাংশ, কৃষি পণ্য ২ দশমিক ৯৬ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ১০ শতাংশ, বিশেষায়িত টেক্সটাইল ১৩ শতাংশ, হোমটেক্সটাইল ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অন্যদিকে আলোচ্য সময়ে রপ্তানি বাড়ার তালিকায় রয়েছে পাট ও পাটজাত পণ্য ১৫ দশমিক ১৬ শতাংশ, কেমিক্যাল পণ্য ৩ শতাংশ, প্লাস্টিক পণ্য ০.২৯ শতাংশ, হস্তশিল্প ও সমুদ্রগামী জাহাজসহ আরো কিছু পণ্য।