তারেকুর রহমান
ইদানীং মতি ভাই স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে উঠলেন। কিছুদিন আগেও তিনি এমন ছিলেন না। ছিপছিপ গড়নের মতি ভাই হঠাত্ করে মোটা হয়ে গেলেন। গালটাও ফুলে গেছে। বেশ ক’বছর পর তার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা। সে তো মতি ভাইকে দেখেই অবাক।
—কীরে মতি, তোর কী হয়েছে?
—কই! কিছু হয়নি তো।
—তোর গাল এ রকম ফুলে গেছে কেন?
—ভালো খাবারদাবার একটু বেশি পড়ে তো তাই স্বাস্থ্যের একটু উন্নতি হয়েছে।
—আমি তো আরো অন্য কিছু ভাবছি।
—তুই আবার কী ভাবছিস?
—আমি ভাবছি তোর মুখে হয়তোও ভিমরুল কামড় দিয়েছে, তাই এ রকম ফুলে গেছে।
বন্ধুর কথায় মতি ভাই একটু কষ্ট পেল। আসলে কিছু লোক আছে, যারা অন্যের ভালো সহ্য করতে পারে না। নিশ্চয় মতি ভাইয়ের স্বাস্থ্যের উন্নতি দেখে তার বন্ধু হিংসা করছে।
তবে ইদানীং মতি ভাইয়ের ভুঁড়িরও বেশ উন্নতি চোখে পড়ছে। পুরুষের ভুঁড়ি নাকি অভিজাত্যের প্রতীক। মতি ভাই আর কিছু না হোক অন্তত বড়ো একটা ভুঁড়ির মালিক। এ নিয়ে অবশ্য তার কোনো অহংকার নেই। তবে ভুঁড়ি বড়ো হয়ে যাওয়ায় তার কিছু সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এক জরুরি কাজে বের হবে মতি ভাই। তাড়াতাড়ি করেই জামাকাপড় পরছেন তিনি। আলনা থেকে শার্ট-প্যান্ট নিয়ে মুহূর্তেই পরে ফেলা তার অভ্যাস। এবার প্যান্ট পরতে গিয়েই বড়ো ধরনের বিপত্তি দেখা দিল। কোনোভাবেই মতি ভাই কোমরে বেল্ট পরতে পারছিলেন না। ভুঁড়িটা বেড়ে এত বড় হয়েছে এখন পেটের কারণে আর কোমর দেখা যাচ্ছে না। মতি ভাই বহু চেষ্টা করেও বেল্টের হুক লাগাতে পারলেন না। নিজে ব্যর্থ হয়ে স্ত্রীকে ডাকতে লাগলেন। স্ত্রী তো এসে রীতিমতো গরম হয়ে গেল।
—খাওয়ার কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই। যা সামনে পাবে, তা-ই খাবে। তোমার ভুঁড়ি বাড়বে না কার বাড়বে?
—শোন, ভুঁড়ি নিয়ে বাজে কথা বলবা না। ভুঁড়ি একটা গর্বের ব্যাপার।
—ওরে... আমার গর্ব রে। থাকো তুমি তোমার গর্ব নিয়া। দেখি কেমন করে বেল্ট পরো।
—প্লিজ প্লিজ তুমি যেও না। স্যরি ভুল হয়ে গেছে। এখন বেল্টের হুকটা লাগিয়ে দাও।
এই যাত্রায় মতি ভাই বিপদ থেকে উদ্ধার পেলেন। দিন যত যায় মতি ভাইয়ের সমস্যা তত বাড়তে লাগল। না এভাবে চলা যায় না। স্বাস্থ্যকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। ফিটফাট শরীর গঠনের উদ্দেশ্যে একটা মাস্টার প্ল্যান হাতে নিলেন মতি ভাই। নিয়মিত ব্যায়াম আর পরিমিত খাবারই পারে মতি ভাইকে ফিট রাখতে। আজ থেকেই মতি ভাইয়ের প্ল্যান বাস্তবায়ন শুরু করে দিলেন। দুপুরবেলায় অনেক খাবার মতি ভাইয়ের সামনে। না, এত খাবার খাওয়া যাবে না। মতি ভাই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেন। কিন্তু মনকে বুঝাতে পারলেন না। সিদ্ধান্ত নিলেন আজকের জন্য খাবেন কাল থেকে খাবার কমিয়ে দেবেন। মতি ভাই হাপুস-হুপুস করে গলা পরিমাণ খেয়ে নিলেন। পরের দিন ছিল বিয়ের দাওয়াত। মতি ভাই ভাবলেন, বিয়ের দাওয়াতে এসে না খেলে হবে? এ রকম মাঝে মাঝে ভালো খাবার না খেলে শরীর খারাপ করবে। মতি ভাই ইচ্ছেমতো খেয়ে নিলেন। ঠিক এইভাবেই মতি ভাইয়ের ডায়েট চলছিল। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর সময় প্ল্যান করে সকালে উঠে ব্যায়াম করবেন। কিন্তু একদিনও তিনি ঘুম থেকে উঠতে পারেন না। অ্যালার্ম দিয়ে ঘুমালেন মতি ভাই। অ্যালার্মের শব্দে তার স্ত্রীর ঘুম ভাঙলেও মতি ভাই ঘুম থেকে উঠতে পারলেন না। অসংখ্য দিন অ্যালার্ম বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছেন মতি ভাই। তিনি নিজের উপর বেশ বিরক্ত। এটা কোনো কথা হলো? শরীর ঠিক রাখার জন্য মতি ভাইয়ের এত প্ল্যান অথচ তা বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। মতি ভাই অতটা হতাশ নন। তিনি মনে করেন, কোনো কাজ করার প্ল্যান করাটাই কাজটার অর্ধেক বাস্তবায়ন হয়ে যাওয়া। মতি ভাই কঠিন সংকল্প করলেন, যেভাবেই হোক, আগামীকাল সকালে তিনি ঘুম থেকে উঠেই ব্যায়াম করতে বের হবেন। পরের দিন সকালে ঘুম ভেঙে যায় মতি ভাইয়ের। তৃপ্তির ঢেকুর তুলে মতি ভাই ঘড়ির দিকে তাকালেন। দেখলেন ঠিক সকাল সোয়া ১০টা বাজে। যতটাই বাজুক, আজ তিনি ব্যায়াম করতে বের হবেনই। সিঙারা খেতে খেতে হেঁটে যাচ্ছেন মতি ভাই। পরিচিত এক লোক তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, মতি মিয়া কই যাও।
—কোথাও যাচ্ছি না। এই একটু ব্যায়াম করছি।
—এই অসময়ে ব্যায়াম?
—ব্যায়ামের আবার সময় লাগে নাকি?
—ও আচ্ছা। তা না হয় বুঝলাম কিন্তু সিঙারা খেলে কি স্বাস্থ্য কমবে?
মতি ভাই রেগে গিয়ে বললেন, ‘এত জ্ঞান দিতে আসেন কেন? আমার যে রকম ইচ্ছা সে রকম খাব, আপনার সমস্যা কী?’
মতি ভাই রাগে ক্ষোভে বাসায় চলে এলেন। আর কোনো ডায়েট না। কিসের স্বাস্থ্যসচেতনতা! এত ঝামেলা তার ভালো লাগে না। ইচ্ছেমতো খাবেন তিনি। ভুঁড়ি কত বাড়বে, তিনি দেখবেন।