রাষ্ট্রপতির কার্যক্রমে আদালতের আদেশ সমীচীন নয়

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রাষ্ট্রপতির কার্যক্রমের ওপর আদালতের আদেশ সমীচীন নয়। একটা রাষ্ট্র পরিচালনার তিনটি অঙ্গ থাকে—আইনসভা, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন সুপ্রিম। সংবিধানের ৫১ (১) এবং ৫৫ (৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কার্যক্রম নিয়ে আদালতে কোন প্রশ্ন উঠতে পারবে না। তবে কখনো কখনো রাষ্ট্রপতির জুরিসডিকশনের অধীন ইস্যুতে অর্ডার দিতে দেখছি। শান্তি, ন্যায়বিচার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের মধ্যে অবশ্যই যথাযথ সমন্বয় ও সুসম্পর্ক থাকতে হবে। একে অপরের কাজে যদি হস্তক্ষেপ করা হয়, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনা, ন্যায়বিচার, শান্তি ও উন্নয়ন করা বেশ কষ্টকর হয়ে যায়।

গতকাল শনিবার সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) সুপ্রীম কোর্ট আয়োজিত ‘শান্তি ও উন্নয়নের জন্য ন্যায়বিচার’ শীর্ষক বিচার বিভাগীয় সম্মেলন ২০১৯ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি সব সময়ে বিশ্বাস করি রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগ নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগ একটি রাষ্ট্রের জন্য অনিবার্য। এই বিভাগগুলো তাদের নিজেদের আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। আমরা এমন একটি অবস্থান আশা করি যেখানে রাষ্ট্রের এই তিনটি বিভাগ একে অপরের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করবে না।’ প্রধানমন্ত্রী আশা করেন যে, বিচারকরা তাদের মেধা ও সৃষ্টিশীলতা কাজে লাগানোর পাশপাশি ন্যায় বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাবেন। শেখ হাসিনা প্রধান বিচারপতির প্রস্তাব অনুযায়ী অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ জোরদারে আইনমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন।

শেখ হাসিনা বিদেশী ভাষায় বেশিরভাগ মামলার বাদি-বিবাদির স্বল্প জ্ঞানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় মামলার রায় দেওয়ার জন্য বিচারপতিদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ইংরেজিতে স্বল্প জ্ঞানের কারণে আধিকাংশ বাদি-বিবাদিকে মামলার রায় বুঝার জন্য তাদের আইনজীবীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। মামলা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোন রায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্পর্কে জানার কোন সুযোগ নেই এবং বহু ক্ষেত্রে এজন্য তাদেরকে হয়রানির শিকার হতে হয়। বিচারপতিগণ ইংরেজিতে রায় লিখতে পারবেন, তবে বাংলায় প্রকাশেরও ব্যবস্থা থাকা দরকার। শেখ হাসিনা বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত ইভ-টিজিং, পাবলিক পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন, চাঁদাবাজি, যানবাহন ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট অপরাধ, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি ও ভেজাল ইত্যাদি বিভিন্ন অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ জন্য তিনি এই আদালতের আরো কার্যকর ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আরো বলেন, ক্ষুদে অপরাধের বিচারে ভ্রাম্যমান আদাতের কার্যক্রম বিচার বিভাগের উপর চাপ কমাতে পারে এবং ঘটনাস্থলে শাস্তি দেয়ার ফলে জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায়।

ফেনী মাদরাসার ছাত্রী নুসরাত হত্যার মতো কয়েকটি চাঞ্চল্যকর মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে আইন-শৃঙ্খলা এবং সুবিচার নিশ্চিতে বিচার বিভাগের উন্নয়নে তাঁর সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের বর্ণনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ লক্ষ্যে সরকার পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দিয়েছে এবং দেশব্যাপী আদালত ভবনের সংকট নিরসন এবং বিচারকদের আবাসন নিশ্চিতে পর্যাপ্ত অবকাঠামো স্থাপন করেছে। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, অপরাধীদের পরিবহণের ঝুঁকি কমাতে ভার্চুয়াল আদালতের মাধ্যমে কুখ্যাত অপরাধীদের বিচার হতে পারে। ই-জুডিসিয়ারি পদ্ধতি মামলাকারীদের কোনও প্রকার ঝামেলা ছাড়াই রায়ের নকল অনুলিপি পেতে সহায়তা করবে। আমরা ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট এবং ১৩টি জেলায় ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ডের মাধ্যমে মামলার তালিকা প্রদর্শন চালু করেছি এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য জেলায় এটি চালু করা হবে। বিচার বিভাগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মহিলা বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার সর্বপ্রথম সর্বোচ্চ আদালতে একজন মহিলা বিচারপতি নিয়োগ দিয়েছিল।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হকসহ আরো অনেকে। আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অন্তনির্হিত শক্তির উত্স হলো জনগণের আস্থা। সাধারণ মানুষের এই আস্থা অর্জনের জন্য বিচারকদের একদিকে যেমন উচু নৈতিক মূল্যবোধ ও চরিত্রের অধিকারী হতে হবে, অন্যদিকে সদা বিকাশমান ও পরিবর্তনশীল আইন, প্রযুক্তিগত উত্কর্ষতা ও সামজিক মূল্যবোধের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।