স্যালুন তো নয় যেন বালাখানা

মো. আমিরুজ্জামান

 

রেল বহরে যুক্ত অত্যাধুনিক আরাম-আয়েশের এই স্যালুন কোচকে অনেকেই বলে থাকেন বালাখানা। কেউ বলেন রহস্যজনক গাড়ি, কেউ বা বলে থাকেন বেহেস্তখানা। বুঝতেই পারছেন আজকে আমরা বাংলাদেশ রেলওয়ের স্যালুন সম্পর্কে জানবো। যেটিকে আমাদের রেলওয়ের পরিভাষায় পরিদর্শন গাড়ি বলা হয়ে থাকে। এই স্যালুনে ৪টি সোফা, দুটি বেড ও আলাদা বাথরুম সংবলিত এয়ার কন্ডিশন রয়েছে। এই স্যালুন কারে যাত্রীদের জন্য একজন স্যালুন বিয়ারার থাকেন। রেলওয়ের সূত্র জানায়, ব্রডগেজ ও মিটারগেজ মিলিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের স্যালুন কার রয়েছে মোট ১৫টি!

স্যালুন কারগুলো আমাদের রেলওয়েতে দুটো প্রয়োজনে ব্যবহূত হয়ে থাকে। প্রথমত, পরিদর্শন গাড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যেখানে রেল আধিকারিক ও রেল পরিদর্শকরা রেলপথ পরিদর্শনের সময় এটিতে চড়ে থাকেন। এর বড় বড় সার্চলাইট ও অবজারভেশন ডেকগুলো দিনরাতে রেলপথ পরিদর্শনের জন্য দারুণ উপযোগী। দ্বিতীয় ব্যবহারটি মূলত বাণিজ্যিক। ভিআইপিদের চাহিদার প্রেক্ষিতে এই স্যালুন কারগুলো বিভিন্ন ট্রেনের সঙ্গে সংযোজন করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, ভিআইপি, সাধারণ যাত্রী ও রেল কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরির স্যালুন কার রয়েছে। এর মধ্যে চীন থেকে আনা সিই-১২, সিই-১৩, সিই-১৪ ও সিই-১৫ নম্বর স্যালুন ভিআইপিদের জন্য ব্যবহার করা হয়। এছাড়া সিআর-৪ নামের সেলুন শুধু প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। সিটি-৭ ও সিটি-৮ নম্বর বিশিষ্ট স্যালুন সাধারণ যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। মন্ত্রীদের জন্য সিই-১৪ ও সিই-১৫ নম্বর স্যালুন কার এবং রেলের মহাপরিচালকের ব্যবহারের জন্য রয়েছে সিই-১৫ নম্বর সেলুন কার।

রেলওয়ের আন্তঃনগর ট্রেন পরিচালনা ম্যানুয়েলের তথ্যানুযায়ী, ১৯৮৫ সাল থেকে আন্তঃনগর ট্রেন চালু হওয়ার পর ৩টি শ্রেণিতে (ক, খ ও গ)-এ বিশেষায়িত ট্রেন চলাচল করে। এতে বলা হয়, ক শ্রেণির আন্তঃনগর ট্রেনে কোনো অবস্থায়ই স্যালুন কার সংযোজন করা যাবে না। খ ও গ শ্রেণির আন্তঃনগর ট্রেনেও সাধারণত কোনো স্যালুন কার সংযুক্ত করা যায় না। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে ৩টি শর্ত পূরণ সাপেক্ষে খ ও গ শ্রেণির আন্তঃনগর ট্রেন ও মেইল বা এক্সপ্রেস ট্রেনে স্যালুন কার ব্যবহার করা যেতে পারে।

 

আন্তঃনগর ম্যানুয়েল অনুসারে, ক শ্রেণির আন্তঃনগর ট্রেন অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও বেশি দূরত্বের  চলাচল করবে। এ ট্রেনটি বিরতিহীন বা যথা সম্ভব কমসংখ্যক বিরতি থাকবে। ট্রেনটি সর্বোচ্চ গতিসম্পন্ন ও এতে কোনো সুলভ শ্রেণির যাত্রী পরিবহন করা হবে না। ট্রেনে একজন তত্ত্বাবধায়ক থাকবেন। অন্যদিকে খ শ্রেণির আন্তঃনগর মাঝারি গুরুত্বপূর্ণ এবং গ শ্রেণির আন্তঃনগর অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্থানের মধ্যে যাত্রী পরিবহনে নিয়োজিত থাকবে। রেল ভবনের বর্তমান শ্রেণি বিন্যাস অনুযায়ী, রেলের ক শ্রেণির আন্তঃনগর ট্রেন রয়েছে ২৪টি।

নিয়ম মোতাবেক রেলের স্যালুন কার ব্যবহার সীমিত ও সংরক্ষিত। পদাধিকারবলে রেলমন্ত্রী, রেলের মহাপরিচালক (ডিজি), মহাব্যবস্থাপক (জিএম), অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক), প্রধান পরিবহন কর্মকর্তা (সিওপিএস), রেলপথ সচিব ও সরকারি রেলপথ পরিদর্শক স্যালুন কার ব্যবহার করতে পারবেন। এছাড়া ভিভিআইপিরা প্রয়োজনে অগ্রীম বিল পরিশোধের পর আবেদন করে স্যালুন কার ব্যবহারের অনুমতি পান।

সাধারণত রেল ভবনে স্যালুন কারের জন্য আগাম চাহিদাপত্র (বুকিং) দিয়ে অর্থ পরিশোধের পর বিপিটি রেলের পরিবহন শাখায় পাঠানো হলে স্যালুন কারটি সংশ্লিষ্ট ট্রেনে সংযোজন করা হয়। এক্ষেত্রে যাত্রী ও ভিভিআইপিদের পছন্দনীয় পজিশনেও স্যালুন কার সংযোজন করে থাকে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ভিভিআইপিদের ক্ষেত্রে বিপিটি ছাড়াই স্যালুন কার ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে এবং ভিভিআইপিদের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ে স্যালুন কার ব্যবহারে মন্ত্রণালয় থেকে বিল পরিশোধ করা হয়। আরেকটি বিষয়, সংশ্লিষ্ট ট্রেনের পাওয়ার কারের ওপর যেহেতু স্যালুন কারের এয়ার কন্ডিশন সিস্টেমের লোড প্রভাব পড়ে তাই একটি ট্রেনে একের অধিক স্যালুন কার সংযোজনকে নিরুত্সাহিত করা হয়।