সাধন সরকার
ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) প্রথম ব্যাচের প্রায় ২০০ জন ডিপিএড প্রশিক্ষণার্থীকে নিয়ে যাওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ভয়াবহ গণহত্যার সাক্ষী মিরপুরের জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে। ভ্রমণপিপাসু রায়হানুল হক স্যার আমাদের এই জল্লাদখানা বধ্যভূমি ১৯৭১ জাদুঘরের কথা আগেই বলেছিলেন। ঢাকা পিটিআইয়ের সুপারিনটেনডেন্ট খন্দকার দীন মোহাম্মদের নেতৃত্বে সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট, ইন্সট্রাক্টরবৃন্দ এবং সকল প্রশিক্ষণার্থীর বিশাল বহর নিয়ে গত ১৬ নভেম্বর দুপুর ১২টায় বধ্যভূমি পরিদর্শন করা হয়। আমিও ছিলাম এই সফরসঙ্গীদের একজন। বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠের সুপারভাইজার প্রমীলা বিশ্বাস ছোট্ট খোলা চত্ত্বরে এই বধ্যভূমির নির্মাণশৈলীর প্রেক্ষাপট এবং মিরপুরে মুক্তিযুদ্ধকালীন ভয়াবহ চিত্র সকলের নিকট তুলে ধরেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধকালীন মিরপুরের ভয়াবহ গণহত্যার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। অতঃপর ২০টি দলে ভাগ হয়ে আমরা সবাই পুরো বধ্যভূমির খুঁটিনাটি ঘুরে দেখা শুরু করি।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদারদের ধ্বংসযজ্ঞের কাহিনি সারাবিশ্বের অজানা নয়। স্বাধীনতার পরও তাদের বিভিন্ন কুকীর্তির প্রমাণ বেরিয়ে আসে। বেরিয়ে আসে নির্মম ও নৃশংস গণহত্যার কথা। স্বাধীনতার পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু গণতহ্যার চিহ্ন, তথা বধ্যভূমির খোঁজ পাওয়া যায়। ঢাকা তো বটেই বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্ বধ্যভূমির একটি হলো মিরপুরের জল্লাদখানা বধ্যভূমি ১৯৭১। এটি এখন জাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধের সময় মিরপুর ছিল ঢাকার নীরব এলাকাগুলোর একটি। অর্থাত্ এখনকার মিরপুর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন! সেই সময়কার মিরপুর বিহারী অধ্যুষিত এবং কিছুটা নির্জন এলাকা হওয়ার সুবাদে এখানে ব্যাপকহারে হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের প্রশিক্ষিত সেই সময়ের জল্লাদরা।
১.মিরপুর জল্লাদখানা বধ্যভূমির প্রবেশপথের মূল ফটক
২. বধ্যভূমির স্মৃতিপীঠ
৩. বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠের বিভিন্ন স্মারক চিহ্ন
৪. বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠের মূল স্মারক চিহ্ন
৫. বধ্যভূমি পরিদর্শনে ঢাকা পিটিআইয়ের সুপারিনটেনডেন্ট, ইন্সট্রাক্টর ও শিক্ষার্থীরা
মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্ত্বর পেরিয়ে বেনারসি পল্লির পাশেই এই বধ্যভূমির অবস্থান। বধ্যভূমির প্রবেশপথের ফটকের গায়ে লেখা রয়েছে—‘কান পেতে শুনি কী বলতে চাইছে মিরপুর জল্লাদখানা বধ্যভূমি।’ ভেতরে প্রবেশ করতেই প্রথমে নজরে আসবে একটি মাটির স্মারক। শূন্য হূদয় নামের এই স্মারকটির স্থপতি ও কবি রবিউল হুসাইন। এর চারপাশ ঘুরে জানা যায়, সারাদেশে বিভাগ অনুযায়ী ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৪৭৭টি বধ্যভূমির কথা। এছাড়া রয়েছে একটি ফলক চিত্র। গণহত্যার এই প্রতীকী দৃশ্যের শিরোনাম ‘জীবন অবিনশ্বর’। এর পাশে রয়েছে একটি ঘর, যেটি সংগ্রহশালা নামেই পরিচিত। এটির প্রবেশপথে রয়েছে একটি ঘণ্টা, যেটি বাজিয়ে প্রবেশ করতে হয়। প্রবেশ করে জানা গেল মিরপুরে শহীদদের নামের তালিকা। এর ভেতরে কাঁচের সেলফের মধ্যে রয়েছে বধ্যভূমির মাটি। জল্লাদখানা স্মৃতিপীঠের পূর্বদিকে রয়েছে স্মৃতি টাওয়ার।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক নিরীহ বাঙালিদের নির্যাতনের পর বধ্যভূমিতে গণকবর দেওয়া হতো। মূলত স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মিরপুরের বিহারী অধ্যুষিত এলাকাগুলো বধ্যভূমিতে রূপ নিয়েছিল! ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও অবরুদ্ধ ছিল মিরপুর। এর প্রায় দেড় মাস ধরে বাঙালিদের ওপর নির্মম নির্যাতন করা হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর অবাঙালি বিহারী, রাজাকার, আলবদর, আল-শামদের সহায়তায় বাঙালিদের হত্যা করে সেফটি ট্যাঙ্কে ও কূপে ফেলে রাখা হতো। তথ্য সূত্রে জানা যায়, পাম্প হাউসের কূপের সামনের স্থানটিতে শিরচ্ছেদ ও হত্যা করা হতো ধরে নিয়ে আসা বাঙালিদের। তারপর লাশ ফেলে দেওয়া হতো পানি ভর্তি গহব্বরে। এ বধ্যভূমি থেকে ৭০টি মাথার খুলি, ৫ হাজার ৩৯২টি অস্থি খণ্ড, মেয়েদের শাড়ি, ফ্রক, ওড়না, অলঙ্কার, জুতা, তসবিসহ শহীদদের ব্যবহার্য নানা জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়েছিল। ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি সকালে মুক্ত হয় অবরুদ্ধ মিরপুর। এখানে মূলত পাকিস্তান আমলে পরিত্যক্ত একটি পাম্প হাউজের ভেতরে ও বাইরে ছিল দুটো কূপ। একটা গভীর ও অন্যটি অপেক্ষাকৃত কম গভীর। জানা যায়, কম গভীর কূপটির মুখে বাঙালিদের হত্যা করে তাদের মাথা ফেলে দেওয়া হতো, আর দেহটি ফেলে দেওয়া হতো গভীর কূপটিতে! ধারণা করা হয়, খ্যাতনামা চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান এই মিরপুরের জল্লাদখানার আশেপাশেই তাকে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছিল। ১৯৯৯ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের সহযোগিতায় মিরপুরের এই জায়গায় খনন কাজ চালিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এ বধ্যভূমি আবিষ্কার করে। ২০০৭ সালের ২১ জুন এই স্থাপনাটির দ্বার উন্মোচন করা হয়। ২০০৮ সালে তত্কালীন সরকার পুনরায় জল্লাদখানা কর্মসূচি শুরু করে এবং স্থপতি ও কবি রবিউল হুসাইনের সার্বিক পরিকল্পনায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রচেষ্টায় তৈরি করা হয় এই জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠ।
পিটিআইয়ের ডিপিএড কোর্সের প্রশিক্ষণে বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বিষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ’। বধ্যভূমিতে এই পরিদর্শন ঢাকা পিটিআইয়ের ডিপিএড প্রশিক্ষণার্থীদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যেমন উদ্বুদ্ধ করবে তেমনি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিকট বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরতে সহায়তা করবে।
নারিন্দা, সূত্রাপুর, ঢাকা