আইসিজেতে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানি পর্যবেক্ষণে যাচ্ছে বাংলাদেশ

জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আনা রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলার শুনানি পর্যবেক্ষণ করবে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে নেদারল্যান্ডসের দি হেগে প্রতিনিধি দল পাঠানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত প্রায় ১৪ সদস্যের ঐ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক। প্রতিনিধি দলে থাকবেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদ্য সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন, মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম. সুফিউর রহমানসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা। শুনানি পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রতিনিধি দলে নাগরিক সমাজের দুই জন প্রতিনিধিও থাকছেন। এর মধ্যে একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ এবং অন্যজন গণহত্যা বিষয়ক গবেষক বলে জানা গেছে। গতকালই দি হেগের উদ্দেশ্যে তাদের ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল বলে জানা গেছে। এদিকে মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১১ লাখ রোহিঙ্গার প্রতিনিধি হিসেবে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া তিনজন রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষ নেদারল্যান্ডস গেছেন।

প্রসঙ্গত, গত ১১ নভেম্বর অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) সমর্থনে পশ্চিম আফ্রিকার ছোটো দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ আনে। এই মামলার শুনানিতে নিজেই দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। গতকালই তিনি দি হেগের উদ্দেশ্যে মিয়ানমার ত্যাগ করেছেন। আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে তিনদিনের শুনানি শুরু হবে।

আইসিজের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য মতে, নেদারল্যান্ডসের পিস প্যালেসে অবস্থিত আইসিজেতে গাম্বিয়ার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মামলাটির শুনানি শুরু হবে। আত্মপক্ষ সমর্থন করে ১১ ডিসেম্বর বক্তব্য উপস্থাপন করবে মিয়ানমার। এরপর ১২ ডিসেম্বর হবে যুক্তিতর্ক। প্রথমে গাম্বিয়া যুক্তি দেবে, এরপর মিয়ানমার তা খণ্ডনের সুযোগ পাবে।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দায়ের করা গাম্বিয়ার মামলার বিচার কবে শেষ        হবে তা একান্তই আদালতের ওপর নির্ভর করছে। তবে বাদী গাম্বিয়া চাইছে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা চেয়ে আদালতের একটি অন্তর্বর্তী আদেশ। যার মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যাসহ সব ধরনের নিপীড়ন বন্ধ করতে মিয়ানমারকে নির্দেশ দেওয়া। তাদের বাড়িঘর ও সম্পদ ধ্বংসের কার্যক্রম বন্ধ রাখার পাশাপাশি জীবন ও জীবিকার ওপর হুমকি বন্ধ করা। মিয়ানমার সেনাবাহিনী, সামারিক, আধাসামরিক বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের গণহত্যা থেকে নিবৃত্ত রাখতে কড়া নির্দেশনা এবং গণহত্যার আলামত নষ্ট না করার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া।

প্রসঙ্গত, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় গণহত্যার অভিযোগে যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে ১৯৯৩ সালের ২০ মার্চ মামলা হয়েছিল। আর আইসিজে ঐ বছরের ৮ এপ্রিল যুগোস্লাভ সরকারকে বসনিয়ার মুসলমানদের সুরক্ষায় বাড়তি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। ঐ প্রসঙ্গ টেনে কূটনৈতিক সূত্র বলছে, গাম্বিয়ার মামলায় মিয়ানমারকে কয়েক মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে আইসিজে। আদালতের নির্দেশনা মানার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাছাড়া রায় না মানলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে তখন ব্যবস্থা নিতে পারবে। কারণ, মিয়ানমার ১৯৫৬ সালে জাতিসংঘের গণহত্যা সনদে সই করেছে। এই সনদে স্বাক্ষরকারী কোনো দেশ আইসিজের নির্দেশনা মানতে বাধ্য।