l সুমন্ত গুপ্ত
ঢাকার অদূরে গাজীপুরের ছাতিয়ানি গ্রামে, গ্রামে রয়েছে পালপল্লি। এই পাল পরিবার এখানে শত বছর ধরে বসবাস করছে। কঠিন দারিদ্র্যে থাকার পরেও তারা আদিপেশা বদলাননি। আমার ভ্রমণসঙ্গীরা হলেন আমার সহধর্মিণী সানন্দা গুপ্ত, অনিক, আনন্দ, পৃথু, অন্তরা। পেটে দানা-পানি দিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। প্রায় দিবা দ্বিতীয় প্রহরে আমরা এসে পৌঁছালাম ছাতিয়ানি গ্রামে। শান্ত, নিরিবিলি গ্রাম; নেই কোনো নাগরিক কোলাহল। আমার সহধর্মিণীর গ্রামের বাড়ি এই ছাতিয়ানি, তাই ওদের বাড়িতেই উঠলাম। কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম প২াল পাড়া ঘুরে দেখার জন্য। সেখানে আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য সঙ্গী হলেন শংকরদা। তিনি আবার আমার সম্পর্কে দুলাভাই। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম ছোট একটা বিল। এই বিল পাড়ি দিতে হবে। গত কয়েক দিন আগেও পানি ছিল না, এখন বৃষ্টির ফলে বেশ যৌবন ফিরে পেয়েছে এই বিল। নৌকায় বিল পাড়ি না দিয়ে সড়ক পথেই হাঁটা শুরু করলাম। গ্রামীণ পথ, কোনো কোলাহল নেই। প্রায় আধা ঘণ্টা হাঁটার পর পৌঁছালাম পালপল্লিতে। সবাই যে যার কাজে ডুবে আছে। মাটির হাঁড়ি বানাচ্ছেন কেউ, কেউ আবার পাখির ঘর। এমনকি ঘরের ছোট্ট বাচ্চাটাও করেছে মাটির কাজ। কথা হলো হারাধন রুদ্র পালের সঙ্গে। তিনি বললেন শত বছর ধরে বংশ পরম্পরায় তাদের বাস এখানে। আগে শতাধিক পরিবার ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশছাড়া হন অনেকেই। বর্তমানে আদিপেশায় জড়িত ৩০টি পরিবার। আমরা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। প্রতিটি দেশের রয়েছে নিজস্ব শিল্প ও সংস্কৃতি। এই শিল্প ও সংস্কৃতির পরিচয়েই পরিচিত হয় সেই দেশ বা জাতি। একেকটি শিল্পের বিস্তারের পিছনে রয়েছে একেকটি দেশ বা জাতির অবদান। তেমনই একটি শিল্প হলো মৃিশল্প। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃিশল্প আজ বিলুপ্তির পথে। অতীতে গ্রামের সুনিপুণ কারিগরের তৈরি মাটির জিনিসের অনেক কদর ছিল। এসব পরিবেশবান্ধব মাটির জিনিস শোভা পেত গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে। এ গ্রামের প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনায় দেখলাম মাটির জিনিসপত্র রোদে শুকাতে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মাটির খেলনা, পাতিল, প্রদীপ, কলস, পাখির বাসা আরো কত কী! আমরা ঘুরে ঘুরে তাদের কাজগুলো দেখলাম। কেউ পাখির বাসা বানাচ্ছে, কেউ বানাচ্ছে মঙ্গল প্রদীপ। কথা হলো রেখা রুদ্র পালের সঙ্গে, তিনি জানালেন, তারা এই কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ করতে পারেন না। দশ পুরুষ ধরে এই কাজ করে যাচ্ছেন। রেখা দুঃখের সঙ্গে জানালেন, অনেক কষ্ট করে মাটির কাজগুলো করেন কিন্তু ঠিকমতো দাম পান না। এর মধ্যে মাটির পণ্যের জায়গা দখল করে নিয়েছে প্লাস্টিকের সামগ্রী। তাদের অনেক সময় অনাহারে থাকতে হয়। এসব জেনে খুব কষ্ট লাগল। হয়তো এমন একসময় আসবে প্লাস্টিক সামগ্রীর ভিড়ে এই প্রাচীন শিল্পের কারিগরেরা হারিয়ে যাবেন। আমরা পুরো পাড়া ঘুরে বেড়ালাম শংকরদার সঙ্গে। দারিদ্র্য তাদের গ্রাস করছে, তবু অতিথি আপ্যায়নে কোনো কমতি নেই। আমাদের আপ্যায়নের জন্য নানা ধরনের ফল, পায়েস, বিস্কুট নিয়ে হাজির। কীভাবে যে ঘণ্টা পার করে ফেললাম, বুঝতেই পারলাম না। এবার বাড়ি ফেরার পালা। ফিরে যাচ্ছি একটি শিল্পী জনগোষ্ঠীর শিল্পসংগ্রামের স্মৃতি নিয়ে।
যাবেন কীভাবে :ঢাকা থেকে বিভিন্নভাবে যেতে পারবেন গাজীপুরে ছাতিয়ানি গ্রামে। ঢাকার গুলিস্থান থেকে নরসিংদীগামী বাসে উঠে নামতে হবে নরসিংদীর পাঁচদোনায়। সেখান থেকে কালিগঞ্জগামী বাসে উঠে নামতে হবে কাপাসিয়া মোড়ে। সেখান থেকে সিএনজি নিয়ে চলে যান ছাতিয়ানি। মহাখালি থেকে যেতে চাইলে আপনাকে উঠতে হবে চলনবিল বা বাদশা পরিবহনে, নামতে হবে কাপাসিয়া মোড়ে। কাপাসিয়া মোড় থেকে সিএনজি নিয়ে চলে যান ছাতিয়ানি গ্রামে। খরচ পড়বে ১৩০ টাকা থেকে ১৮০ টাকা অথবা গাড়ি ভাড়া করে যেতে পারেন। খরচ পড়বে ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা।