নিঃসন্দেহে দুর্নীতি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য একটি ব্যাধিস্বরূপ। ইহা সব রাষ্ট্রে, সব সমাজেই অল্পবিস্তর দেখিতে পাওয়া যায়। দুর্নীতিকে হুবহু শরীরের ক্যানসারের সঙ্গে তুলনা করা চলে। ইহা ব্যাপকভাবে ছড়াইয়া পড়িলে সমাজ ও রাষ্ট্রে স্থবিরতা তৈরি হইয়া থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ২০২০ সালের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দলের প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী জো বাইডেন বলিয়াছেন, ‘দুর্নীতি এমন এক ক্যানসার, যাহা গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থা ধ্বংস করে, সহজাত সৃজনশীলতা ও সৃষ্টিশীলতাকে নষ্ট করে; গোটা প্রজন্মের প্রতিভাকে নসাত্ করিয়া থাকে এবং দুর্নীতির ভয় বিনিয়োগকে দূরে ঠেলিয়া দেয়।’ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিশ্বব্যাপী চার ধরনের দুর্নীতি রহিয়াছে: পেটি বা ক্ষুদ্র দুর্নীতি, গ্র্যান্ড বা বৃহত্ দুর্নীতি, সিস্টেমেটিক বা পদ্ধতিগত দুর্নীতি এবং পলিটিক্যাল বা রাজনৈতিক দুর্নীতি। ক্ষুদ্র দুর্নীতি হইল সরকারি অফিসগুলির সঙ্গে জনগণের একটি অংশ মিলিয়া করিয়া থাকে, বৃহত্ দুর্নীতি উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে প্রবেশের মাধ্যমে করিয়া থাকেন, পদ্ধতিগত দুর্নীতি হইল প্রচলিত পদ্ধতির দুর্বলতাকে ব্যবহারের মাধ্যমে করা হয় এবং রাজনৈতিক দুর্নীতি হইল রাজনীতিকে ব্যবহার করিয়া হইয়া থাকে। সম্প্রতি শেষোক্ত দুর্নীতির অভিযোগ উঠিয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। বাকি তিনটির সঙ্গে সাধারণত অর্থনৈতিক বেনিফিট জড়াইয়া থাকে।
বাংলাদেশে দুর্নীতি নূতন নহে। বিশেষ করিয়া প্রথম তিন ধরনের দুর্নীতির অস্তিত্ব রহিয়াছে বহুকাল ধরিয়া। আশার কথা হইল, এখন দেশের দুর্নীতি দমন কমিশন যথেষ্ট তত্পর হইয়া উঠিয়াছে। আমরা বলিব না যে, দেশ হইতে দুর্নীতি প্রত্যাশা অনুযায়ী হ্রাস পাইয়াছে (সেই কথা খোদ দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানও একাধিকবার স্বীকার করিয়াছেন)। কিন্তু ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ লইবার ফলে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা সতর্ক হইয়া উঠিয়াছেন তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। ইহাও একটি অগ্রগতি। অনেকেই দেশে দুর্নীতি দমনের অ্যাকশন রাতারাতি দেখিতে চাহেন। কিন্তু তাহাদের বুঝিতে হইবে দুর্নীতির মতো জটিল বিষয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত করিয়া বিচারের সম্মুখীন করিবার কাজটিতে সময়ের প্রয়োজন হইয়া থাকে।
গতকাল পালিত হইয়াছে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস। সেই উপলক্ষ্যে দেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের জানাইয়াছেন, ‘চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান আরো জোরদার হইবে। এই অভিযান বন্ধ হওয়ার কোনো সুযোগ নাই।’ আমরাও প্রত্যাশা করি, দুর্নীতিবিরোধী তত্পরতা অব্যাহত থাকুক। তবে মনে রাখিতে হইবে, দুর্নীতির লাগাম টানিয়া ধরিতে হইলে এই প্রতিষ্ঠানকে যথেষ্ট শক্তিশালী রাখিতে হইবে। বহুকাল ধরিয়াই শুনা যায়, এই প্রতিষ্ঠানের লোকবলের অভাব রহিয়াছে। যদিও সম্প্রতি দুদকে ৯টি ক্যাটাগরিতে ৪২ জন লোক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলিতেছে, কিন্তু সংখ্যার দিক দিয়া তাহা অপ্রতুল। যেহেতু এই প্রতিষ্ঠান এবং সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান ও তত্পরতা বৃদ্ধি করিতে চাহিতেছে, সেই হেতু পর্যাপ্ত লোকবলের বিষয়টি মাথায় রাখিতে হইবে। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও দপ্তর যাহাতে দুদকের কর্মকাণ্ডে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে তাহা সরকারকে নিশ্চিত করিতে হইবে। দুর্নীতি যথেষ্ট পরিমাণ কমাইয়া আনিতে পারিলে দেশের অগ্রগতি যে বেগবান হইয়া উঠিবে তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না।