সমাজে বৈষম্য দূর করতে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ গড়তে হবে

 ‘বেগম রোকেয়ার শিক্ষা ও কর্ম :বর্তমান বাস্তবতা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা

ইত্তেফাক রিপোর্ট

নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে সমাজে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিজ্ঞজন। তারা বলেছেন, নারীদের সবক্ষেত্রে পদচারণা ও সাফল্য বেড়েছে; কিন্তু এখনো নারীরা কর্মক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা ও বেতন বৈষম্যের শিকার। পর্যাপ্ত পরিমাণে শিশু দিবাযত্নকেন্দ্র না থাকায় অনেক নারীই চাকরি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। একইভাবে শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাথমিকে ভর্তি ও পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের বিষয়ে মেয়েশিশুরা এগিয়ে। মাধ্যমিকের পর থেকে উচ্চশিক্ষায় নারীরা ঝরে পড়ছে। এসব সমস্যার সমাধান করতে সমাজে কেবল দক্ষ মানুষই নয়, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ গড়ে তুলতে হবে।

গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে ‘বেগম রোকেয়ার শিক্ষা ও কর্ম : বর্তমান বাস্তবতা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘রোকেয়া দিবস’ উপলক্ষ্যে এই সেমিনারের আয়োজন করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উইমেন ফর উইমেন’। সেমিনারে আয়োজক সংগঠনের সভাপতি ড. নিলুফার বানুর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন পিকেএসএফের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। আলোচনা করেন সহসভাপতি রাশেদা আক্তার খান, মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. আলেয়া পারভীন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শামসুন নাহার।

ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, সমাজে মর্যাদা নিয়ে সবার বাস করা উচিত; কিন্তু সমাজটা এমন হয়েছে, যুগ যুগ ধরে পুরুষ বেশি ক্ষমতাবান এবং নারীকে দাবিয়ে রাখা হয়েছে। তারপরও তত্কালীন সমাজ বেগম রোকেয়াকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। এতকিছুর পরও আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, দক্ষিণ এশিয়ায় নারীকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সফল দেশ আমাদের বাংলাদেশ। তার পরও আমাদের অনেক সমস্যা রয়েছে। বাল্যবিবাহ, উত্ত্যক্তকরণ, নারী নির্যাতন, মজুরি বৈষম্য, উচ্চ পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন কম, শিক্ষার ক্ষেত্রে উচ্চ মাধ্যমিকের পরে নারীরা ঝরে পড়ে। এখানে আমাদের জোর দিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, সমাজে যদি মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে এই বৈষম্য থাকবে না। আমরা সেই কাজটা করার চেষ্টা করছি। শুধু দক্ষ মানুষ নয়, মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে তৈরি করতে হবে। তাহলে পুরুষ-নারী একে অপরকে সম্মান করবে এবং তারা উভয়ে দায়িত্ব পালন করবে। আমরা সবাই মানুষ, আমার নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না।

ড. নিলুফার বানু বলেন, পরিবার থেকে নারী-পুরুষের বৈষম্যগুলো দূর করার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে মজুরি বৈষম্য দূর ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে দ্রুত বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা যেমন আমরা চাচ্ছি, সেক্ষেত্রে স্কুল পর্যায়ে মেয়ে শিশু-কিশোরদের আত্মরক্ষায় জুডো ও ক্যারাটে শেখানোর সুপারিশ করেন তিনি। প্রাইমারি স্কুলে এই শিক্ষা দিলে নারীর আত্মবিশ্বাস বাড়বে বলে জানান। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে নারীর প্রতি সম্মান করার বিষয়টি রাখতে হবে বলে তার সুপারিশ।

মূল প্রবন্ধে ড. আলেয়া পারভীন বলেন, আজ নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার ১৩৯তম জন্ম এবং ৮৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। আজকের দিনে আমরা তাকে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি। মুসলিম সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠলেও বেগম রোকেয়া তত্কালীন অন্যান্য নারীর মতো জীবনযাপন করেননি। তিনি মানুষের জন্য বিশেষ করে নারী সমাজের জন্য শিক্ষা ও কর্মে নিযুক্ত হওয়ার যে পথ তৈরি করে দিয়েছেন আজকের নারীরা তারই কাঙ্ক্ষিত পথে বের হয়ে এসেছেন। সমাজে নারীকে মানুষ হিসেবে ভাবা এখন সময়ের দাবি। মেয়েশিশুর নিরাপত্তায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৬ ভাগ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা এমন এক সমাজ দেখতে চান, যেখানে লিঙ্গ প্রাধান্য থাকবে না। ছেলেমেয়ের পরিচয় হবে শুধু মানবিক মানুষ হিসেবে।