আজ জাতীয় ভ্যাট দিবস
রিয়াদ হোসেন
বহু আলোচনার পর গত জুলাই থেকে দেশব্যাপী নতুন ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) আইন কার্যকর হয়েছে। আইনটি কার্যকর হওয়ার পর ভ্যাট আদায়ে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং ভ্যাট আদায় বাড়বে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তথা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল। আইনটি বাস্তবায়নের পর পাঁচ মাস পার হয়েছে। ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ভ্যাট আদায় তথা এ খাতে এখনো প্রত্যাশিত শৃঙ্খলা আসেনি। এমনকি খোদ ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তাদের একটি বড়ো অংশই এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে অনলাইনভিত্তিক হিসাবযন্ত্র (ইলেকট্রনিক ফিসক্যালস ডিভাইস বা ইএফডি) সরবরাহ করার কথা থাকলেও গত পাঁচ মাসেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রকৃত বিক্রির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। দেশে অন্তত ৫ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অনলাইনভিত্তিক ভ্যাট নিবন্ধন (বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা বিআইএন) নেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও নিবন্ধন নিয়েছে মাত্র ১ লাখ ১২ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। হিসাবে স্বচ্ছতা আনার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হলেও ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে রেকর্ড পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে এনবিআরকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গিয়ে সহজ আদায় পন্থাকেই বেছে নিয়েছে এনবিআর। দেশব্যাপী মোবাইল ফোন গ্রাহকদের ওপর থেকে কর আদায় করা সহজ। ফলে ১৫ শতাংশ ভ্যাটের বাইরে দফায় দফায় সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে ও উন্নয়ন সারসার্জ হিসেবে গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে সাড়ে ২৭ শতাংশ। যার ভার পড়ছে একজন খেটে খাওয়া স্বল্প আয়ের মানুষের ওপরও। আবার ঢালাওভাবে কিছু পণ্য ও সেবার ওপর ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে, কিংবা ভ্যাটের হার বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে ভ্যাটব্যবস্থায় শৃঙ্খলা না আসার সুযোগে একশ্রেণির ব্যবসায়ী ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে। বহুজাতিক কোম্পানিও রয়েছে এ তালিকায়। অভিযোগ রয়েছে, সুযোগে অসাধু কর্মকর্তারাও ‘ম্যানেজ’ হচ্ছেন ভিন্ন উপায়ে।
ভ্যাট আদায়ের প্রবৃদ্ধিতেও রীতিমতো বিপর্যয় নেমেছে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই থেকে অক্টোবর) ভ্যাট আদায় বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ভ্যাট আদায়ে ঘাটতি সোয়া ৮ হাজার কোটি টাকা। গত এক দশকে এত কম হারে ভ্যাটে প্রবৃদ্ধি হয়নি।
ভ্যাট আদায়ে প্রত্যাশিত গতি না আসায় সম্প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অন্যদিকে আদায় কমে যাওয়ার পেছনে কিছু কারণ তুলে ধরেছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া। বিশেষত বড়ো আকারের ভ্যাট আদায় হওয়া কিছু খাতে অব্যাহতি দেওয়া এবং অর্থনীতির প্রত্যাশিত গতি না থাকায় আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়াকে আদায়ে পিছিয়ে থাকার জন্য দায়ী করেছেন তিনি।
তবে ভ্যাট আদায় কমে যাওয়ার জন্য ব্যবসায়-বাণিজ্যের শ্লথগতিকেই দায়ী করছেন ব্যবসায়ী নেতারা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক ও হালকা প্রকৌশল খাতের অন্যতম উদ্যোক্তা আবদুুর রাজ্জাক ইত্তেফাককে বলেন, ব্যবসায়-বাণিজ্যে গতি নেই। বিনিয়োগ নেই, ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না; কিন্তু ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, নতুন আইন বাস্তবায়ন হওয়ার পরও এখনো সাধারণ ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন জায়গায় গাড়ি আটকে ভ্যাটের কর্মকর্তারা অবৈধ অর্থ আদায় করছেন।
ভ্যাটব্যবস্থায় শৃঙ্খলা না আসার পেছনে এ খাতে অটোমেশন না হওয়াকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর ইত্তেফাককে বলেন, ২০১২ সালের আইনের ডিজাইনে অনেক পরিবর্তন আনা হয়েছে। অন্যদিকে যেসব অটোমেশনের কথা বলা হয়েছিল, তা হয়নি। প্রশাসনিক কাঠামোগত পরিবর্তনও হয়নি। এছাড়া অর্থনীতি দুর্বল হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ভ্যাটব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এমন বাস্তবতায় আজ দেশব্যাপী পালিত হচ্ছে জাতীয় ভ্যাট দিবস। ভ্যাট বিষয়ে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সচেনত করতে সরকার প্রতিবছর এই দিনটিকে ভ্যাট দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। দিবসটির গুরুত্ব তুলে ধরতে আজ সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় রাজস্ব ভবনের সামনে থেকে শোভাযাত্রা বের হবে। এছাড়া সন্ধ্যায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে দেশব্যাপী সেরা ভ্যাট পরিশোধকারী ১৪৪ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা দেওয়া হবে।