হালদায় ডলফিনের মৃত্যু থামছেই না

দেশে কার্প জাতীয় মাছের একমাত্র নদীভিত্তিক প্রাকৃতিক প্রজননস্থল চট্টগ্রামের হালদা নদীতে মিঠা পানির দৃষ্টিনন্দন ডলফিনের মৃত্যুর মিছিল থামছে না। গত ৫ ডিসেম্বর এই নদীর হাটহাজারী উপজেলার আকবরিয়া অংশে একটি মৃত ডলফিন ভেসে উঠলে বিচলিত হয়ে পড়ে চট্টগ্রামের পরিবেশবিদ এবং বিশেষজ্ঞ মহল। মৃত ডলফিনটির ওজন ছিল ৩০ থেকে ৩৫ কিলোগ্রাম। আঘাতজনিত কারণেই এর মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে কীসের আঘাত তা জানার চেষ্টা করছেন নদী বিশেষজ্ঞগণ। মাছটিকে পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া ইত্তেফাককে বলেন, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে গত ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত হালদা নদীতে সর্বমোট ২২টি মৃত ডলফিন ভেসে উঠেছে। ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে এগুলোর অধিকাংশেরই মৃত্যু হয়েছে আঘাতজনিত কারণে। বাকিগুলোর মৃত্যু নদীর পানিদূষণজনিত। হালদা নদীতে শুধু ডলফিনই নয়, দূষণ বিস্তারের কারণে প্রাকৃতিক কার্পজাতীয় মাছসহ সব মাছেরই অস্তিত্ব হুমকির মুখে। এর চিহ্নিত কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর অনন্যা আবাসিক এলাকার খন্দকিয়া খাল দিয়ে নদীতে ব্যাপক দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে। এছাড়াও ফটিকছড়ি উপজেলার হারুয়ালছড়ি অংশে একটি এবং ভূজপুর অংশে হালদা নদীর ওপর অপর একটি রাবার ড্যাম বিদ্যমান থাকায় সেগুলো নদীর পানির স্বাভাবিক গতি প্রবাহকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে নদীর পানিতে টারবিডিটি বেড়ে গিয়ে অক্সিজেনের পরিমাণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়ে মাছের জীবনহানি ঘটাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, এই বিষয়গুলো সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে। হালদা নদী প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের বিশেষ নজরদারির মধ্যে রয়েছে। দুই/তিন বছর আগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের       মুখ্যসচিবকে প্রধান করে হালদাসংক্রান্ত একটি কমিটিও গঠন করা হয়। এ পর্যন্ত হালদা নদী নিয়ে কমিটির দুইটি সভা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

হালদা নদী চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলা, রাউজান উপজেলা এবং ফটিকছড়ি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে প্রবাহিত। এই নদীটি চট্টগ্রাম মহানগরীর অধিবাসীদের জন্য সুপেয় মিঠা পানি যোগানের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম ওয়াসার একটি অন্যতম উত্স। অধ্যাপক কিবরিয়া বলেন, ৫ ডিসেম্বর যে মৃত ডলফিনটি ভেসে উঠেছে তার মৃত্যু নৌকার আঘাতে। মাছ ধরার জালে আটকা পড়ে জেলেদের আঘাতের কারণে কিংবা মা মাছের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে পাকা কংক্রিটের কিউবে ধাক্কা লাগার কারণে হতে পারে। তবে এখানে কোন কারণটি দায়ী তা নির্ণয়ের চেষ্টা চলছে।

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন ইত্তেফাককে বলেন, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী হালদার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় উপজেলা প্রশাসন আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযান প্রতিদিনই চলছে। নদীতে ড্রেজারের বালু উত্তোলন প্রক্রিয়া বন্ধ করা হয়েছে। এবার নদীর তীরে বালু ডাম্পিং বন্ধে অভিযান চলছে। গত দুই দিনে বালুবাহী দুইটি নৌকা ধ্বংস করা হয়েছে। সেইসঙ্গে নদীতে ভাসাজাল, ঘেরাজাল ইত্যাদি দিয়ে মাছ শিকারের প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে। বিষ দিয়ে মাছ শিকারের তত্পরতাও বন্ধ করা হয়েছে। হাটহাজারীর কোনো খাল দিয়ে যাতে কেউ হালদা নদীতে দূষণ বিস্তার করতে না পারে সে ব্যাপারে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। ইউএনও বলেন, তবে সম্যস্যা হচ্ছে চট্টগ্রাম মহানগরী অংশে অনন্যা আবাসিক এলাকার কৃষ্ণখালি, কাটাখালি এবং খন্দকিয়া খালকে নিয়ে। এই খালগুলো দিয়ে হালদা নদীতে বিপুল পরিমাণ দূষিত পদার্থ এসে মিশছে, যা নদীর সুস্থ জীবনপ্রবাহকে দিনদিন অসুস্থ করে দিচ্ছে। মাছসহ অন্যান্য জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করছে। মহানগরী অংশ আমার জুরিসডিকশনের বাইরে। না হলে এগুলোকেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতাম।