সম্প্রতি পালিত হলো বেগম রোকেয়া দিবস। তার জন্মদিন উপলক্ষ্যে দেশব্যাপী প্রতিবছর এই দিবস পালন করা হয়। নারী জাগরণের অগ্রদূত এই মহীয়সী নারী জন্মগ্রহণ করেন রংপুর জেলায়। বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষ্যে তাকে নিয়ে লিখেছেন রংপুরের আরেক কৃতী সন্তান রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. শাহ নওয়াজ আলি। সম্প্রতি, অধ্যাপক আলি প্রেস কাউন্সিলের সদস্য এবং বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বঙ্গবন্ধু, দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং জাতীয় নানা ইস্যুতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মতামত ও লেখা তুলে ধরেন। শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ নিয়েও নিয়মিত কথা বলে থাকেন। এবার তিনি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতকে নিয়ে জানাচ্ছেন।
নারীরা যে সমাজের অর্ধ অঙ্গ, এই ধারণা যেই মহীয়সী নারী আমাদের দিয়েছেন তিনি আর কেউ নন—বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তিনিই সাহস করে বলেছিলেন, ‘আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কিরূপে?’ মূলত এই বোধ থেকেই বাংলার নারী জাগরণের মানসকন্যা রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণে এগিয়ে আসেন। তিনি আমৃত্যু নারীশিক্ষা, নারীভাবনা ও নারীমুক্তির জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। শুধু তা-ই নয়, নারী মুক্তির পাশাপাশি তিনি নারীর প্রতিষ্ঠার ও পুনর্জাগরণের কথাও ভেবেছেন। গত শতাব্দীর উনিশ ও বিশ শতকের প্রথমে যেসব নারী লেখক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তাদের মধ্যে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন গভীরভাবে সমাজসচেতন ও যুক্তিবাদী। অন্যদিকে সমাজ পরিবর্তনে একনিষ্ঠ সংগঠক হিসেবে ছিলেন উজ্জ্বল পথিকৃত্।
বাঙালি মুসলমান সমাজে নারী-জাগরণ ও নারী-অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত্ অবশ্যই বেগম রোকেয়া। তিনি প্রথমবারের মতো বাঙালি মুসলিম সমাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমান অধিকারের দাবি তুলে ধরেন, নারীস্বাধীনতার পক্ষে নিজের মতবাদ প্রচার করেন, অবরোধ প্রথার শিকল ভাঙেন। বেগম রোকেয়ার ছিল অদম্য সাহস ও প্রবল আত্মবিশ্বাস। স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর প্রদত্ত অর্থে মাত্র পাঁচ জন ছাত্রী নিয়ে ভাগলপুরে ‘সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে পারিপার্শ্বিক কারণে ভাগলপুর ছেড়ে বেগম রোকেয়া কলকাতায় মাত্র আট জন ছাত্রী নিয়ে নতুন উদ্যমে ‘সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। নানা প্রতিবন্ধকতাকে অগ্রাহ্য করে তিনি এই প্রতিষ্ঠানটিকে সে যুগের মুসলমান মেয়েদের শিক্ষা লাভের অন্যতম বিদ্যাপীঠে পরিণত করেন। এ যেন ছিল তার স্বপ্নের বাস্তবায়ন। ১৯৩০ সালে বঙ্গীয় মুসলিম সম্মেলনে বেগম রোকেয়া বাংলা ভাষার পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখেন, যা সে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে ছিল দুঃসাহসিক কাজ। তার লক্ষ্য ছিল, নারীশিক্ষার প্রসার, নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি এবং মুসলমান সমাজের অবরোধ প্রথার অবসান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শিক্ষা ছাড়া নারী জাতির অগ্রগতি ও মুক্তি সম্ভব নয়। এ সত্য অনুধাবন করেই তিনি নারী শিক্ষা প্রসারের কাজে ব্রতী হন। নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা প্রদানের স্বীকৃতির লক্ষ্যেই পরিচালিত হয় তার সকল প্রচেষ্টা।
রূপকথার বন্দিনী রাজকুমারীর গল্প আমরা সবাই কমবেশি শুনেছি। বলতে গেলে শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। সোনার কাঠি, রুপার কাঠির সংস্পর্শে ঘুম ভাঙত রাজকুমারীর। রোকেয়া সমগ্র বাঙালি নারীর কাছে আবির্ভূত হয়েছিলেন সেই সোনার কাঠিরূপে; ঘুমন্ত নারীদের জাগ্রত করতে। জমিদার নন্দিনী হয়েও কঠিন অবরোধ প্রথার মধ্যে মানুষ হয়েছেন তিনি। তিনি নিজের মাধ্যমে অন্য নারীদের ব্যথা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এই অবরোধ বন্দিনী নারীর জন্যই তার মানসলোকে নানা ভাবনা উদয় হতে থাকে। রোকেয়ার মনে সব সময়ই একটা প্রশ্নের সৃষ্টি হতো নারী পুরুষের লৈঙ্গিক ভিন্নতা থাকলেও সৃষ্টির উদ্দেশ্য তো এক। তাহলে এত বিভেদ কেন? তিনি থাকলে হয়তো এর উত্তরও মিলত।
ছবি: ইন্টারনেট