মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে দ্রুত চিকিত্সা জরুরি

  আকলিমা জান্নাত

 

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে নারীদের আর্থসামাজিক অবস্থানে। বদলেছে জীবনযাপনের ধারা। নারী ক্ষমতায়নের ইতিবাচক ফলাফলের প্রভাবে সব ক্ষেত্রেই বেড়েছে নারীর পদচারণা। বেড়েছে কর্মজীবী নারীর সংখ্যাও। দিনে দিনে তা আরো বাড়ছে। মাঠ পর্যায়ে কাজ করা নারীদের কাজের প্রয়োজনে দিনের প্রায় অনেকটা সময় বাইরেই থাকতে হয়। ছুটতে হয় এখান থেকে সেখানে। কাজের মধ্যে প্রকৃতির ডাক এলেও অধিকাংশ নারী তাতে সাড়া দেন না। অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা টয়লেট ব্যবহার করতে চান না কেউ। চাহিদার তীব্রতায় মাঝে মাঝে বাধ্য হয়েই পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে হয়। এমন পরিস্থিতির অতি পরিচিত একটি ফলাফল হলো ইউটিআই (ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন)।

ইউটিআই একটি জীবাণুঘটিত রোগ। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে নারীদের শতকরা ৫০ ভাগই তাদের লাইফটাইমে কোনো না কোনো সময় লোয়ার ইউরিনারি ট্র্যাক্ট সিম্পটম (এলইউটিএস)-এ আক্রান্ত হয়েছেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে যা শতকরা প্রায় ১২ ভাগ। নারীদের গর্ভকালীন যেসব জটিলতা দেখা দেয়, তার মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাত্রায় যে রোগটি হয়, সেটা হলো ইউটিআই।

আমরা যখন পানি খাই তখন তা কিডনি বা বৃক্কের মাধ্যমে ছেঁকে মূত্রনালি দিয়ে মূত্র হিসেবে বেরিয়ে যায়। মানুষের শরীরের দুটি কিডনি, দুটি ইউরেটার, একটি ইউরিনারি ব্লাডার (মূত্রথলি) এবং ইউরেথ্রা (মূত্রনালি) নিয়ে মূত্রতন্ত্র গঠিত। আর এই রেচনন্ত্রের যে কোনো অংশে যদি জীবাণুর সংক্রমণ হয়, তাহলে সেটাকে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বলা হয়। কিডনি, মূত্রনালি, মূত্রথলি বা একাধিক অংশে একসঙ্গে এই ধরনের ইনফেকশন হতে পারে। এই সংক্রমণকেই সংক্ষেপে ইউরিন ইনফেকশন বলা হয়।

নারীদের শারীরিক গঠন ইউটিআই আক্রান্ত হওয়ার জন্য পুরুষের দেহের তুলনার অধিকতর উপযোগী। তবে আমাদের দেশের মতো জনবহুল দেশগুলোতে নারীদের ইউটিআইতে আক্রান্ত হওয়ার কারণ হিসেবে যে বিষয়টি দায়ী করা হয়, তা হলো অপ্রতুল এবং অস্বাস্থ্যকর, নোংরা টয়লেটকে। অসংখ্য নারী ঘরের বাইরে, অফিসে, বাজারে যখন নানাবিধ কাজে অংশগ্রহণ করে তখন টয়লেটে যাতে না যেতে হয় তার জন্য অনেকে প্রয়োজনীয় পানি পান করা থেকে বিরত থাকে। প্রস্রাব পেলেও তা আটকে রাখে।

প্রস্রাবে ইউরিয়া এবং অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো টক্সিন জাতীয় পদার্থ থাকে। ফলে বেশিক্ষণ চেপে রাখার ফলে বিষাক্ত পদার্থ কিডনিতে পৌঁছে কিডনিতে স্টোন বা পাথর তৈরি করতে পারে। ঢাকাসহ দেশের বড়ো শহরগুলোতে নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে ইদানীং এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বহুগুণে বাড়ছে। বিশ্বে গড়ে প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে পাঁচ জন নারী ইউটিআই রোগে ভোগেন। এ ছাড়া প্রস্রাব চেপে রাখার কারণে ব্লাডার ফুলে যেতে পারে। সেই সঙ্গে কারো যদি আগে থেকে কিডনিতে কোনো সমস্যা থেকে থাকে এবং নিয়ামিত প্রস্রাব চেপে রাখার অভ্যাস থাকে, তাহলে তার কিডনি ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করবে। এজন্য রক্তের বিভিন্ন সংক্রমণসহ নানা ধরনের সংক্রমণ হতে পারে। কেবল টয়লেট চেপে রাখার কারণে শ্বাসকষ্ট এবং ব্যাকটেরিয়াা সংক্রমণও হতে পারে। কারো যদি মনে হয় এই সমস্যায় ভুগছেন তবে দেরি না করে ইউরোলজিস্ট, গাইনোকোলজিস্ট বা নেফ্রোলোজিস্টের শরণাপন্ন হতে হবে। বয়স, রোগের তীব্রতা ও রোগের জন্য দায়ী জীবাণু অনুযায়ী চিকিত্সার ধরন ভিন্ন হয়ে থাকে। দীর্ঘসময় প্রস্রাব আটকে রাখা যাবে না, এতে শরীরে ব্যাকটেরিয়াকে একটি আবাসস্থল তৈরির সুযোগ করে দেওয়া হয়, যা অত্যন্ত ক্ষতিকারক।

ইউটিআইতে আক্রান্ত হওয়ার জন্য পরোক্ষভাবে নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন টয়লেটও অনেকাংশেই দায়ী। ইউটিআই-এর ব্যাপকতা এবং ভয়াবহতা বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সম্প্রতি ‘হ্যাশট্যাগ হারপিক এগেইনেস্ট ইউটিআই’ শিরোনামে একটি ডিজিটাল ক্যাম্পেইন শুরু করেছে, যার মূল লক্ষ্য হলো দেশে শতভাগ নারীবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নিশ্চিত করা। ইউটিআই রুখতে হলে দেশে নারীদের জন্য পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট ও শতভাগ নারীবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নিশ্চিত করা এবং এই রোগের ভয়াবহতা থেকে রেহাই পেতে দ্রুততর সময়ে রোগ চিহ্নিত করা এবং এ বিষয়ে সকলের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

ছবি: ইন্টারনেট