কদর্য এশীয়

সৈয়দ ওয়ালীউল্ল¬¬াহ্র রাজনীতি-ভাবনা

এতদিন আমরা সৈয়দ ওয়ালীউল্ল­াহ্র (জন্ম : ১৫ আগস্ট ১৯২২; মৃত্যু : ১০ অক্টোবর ১৯৭১) তিনটি উপন্যাসকে ঘিরেই তাঁর ঔপন্যাসিকখ্যাতি আলোচিত হতে দেখেছি। পরবর্তীকালে, দীর্ঘ সময় পরে, তাঁর দুটি ইংরেজি উপন্যাসের বাংলা ভাষান্তর আমাদের হাতে আসে। শিবব্রত বর্মণের অনুবাদে ২০০৬ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ‘দ্য আগলি এশিয়ান’-এর বাংলা রূপ ‘কদর্য এশীয়’। ২০০৪-এ বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয় ‘হাউ ডাজ ওয়ান কুক বীন্স্’-এর বাংলা ভাষান্তর ‘শিম কীভাবে রান্না করতে হয়’। প্রথমটি রাজনীতি-বিষয়ক; দ্বিতীয়টিতে রূপায়িত হয়েছে সাংস্কৃতিক ভাববিনিময়ের সূত্রাবলি ও চিত্রাবলি। আমাদের বর্তমান আলোচনা ‘কদর্য এশীয়’কে ঘিরে।

তত্কালীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক-সংস্কৃতি এবং আমেরিকানির্ভরতার বিশ্বস্ত ছাপচিত্র তাঁর এই উপন্যাস; ভিন্নভাবে দেখলে অনুধাবন করা যায় যে, এশিয়ার যেকোনো দেশই এর ক্যানভাস। জাতি হিসেবে আমরা—এশীয়রা যে পিছিয়েপড়া, স্মৃতিরোমন্থনপ্রিয়—অহেতুক অতীতচারি, আমরা যে অভিজ্ঞতা অর্জনের আগেই মৃত্যুবরণ করে থাকি, আমাদের হাতে থাকে না কোনো তথ্য-পরিসংখ্যান, নিজের সংস্কৃতিকে কেবল গান-বাজনার মাধ্যমেই প্রকাশ করতে অভ্যস্ত, ‘বিনাপ্রশ্নে প্রভুর নির্দেশ পালন’-কে ধ্যান-জ্ঞান জেনে ‘নৈতিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা’য় ডুবে থাকতে আর ঝিমানোর ফাঁকে ফাঁকে কোকাকোলা খেয়ে ঠোঁট ভেজানোয় আমাদের আনন্দ, ভিনদেশি মনোভঙ্গি বিষয়ে আমাদের যে স্পষ্ট কোনো অভিমত নেই; ঐতিহাসিক কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে আমরা যে অহেতুক লম্বা বক্তব্য দিতে পারঙ্গম—এমন কিছু জটিল অথচ জরুরি বিষয়ে সৈয়দ ওয়ালীউল্ল­াহ্ পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের জন্মের অনেক আগেই আমরা যেন এই দেশটির একটি সাবলীল পরিচয়ও পাঠ করতে থাকি। ‘একটা দেশকে আসলে কীভাবে চেনা যায়? কোথায় দেশের শুরু?’—এসব প্রশ্ন আর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রবাহে মানবমনের বিচিত্র ওঠানামার মধ্য দিয়েই অগ্রসর হতে থাকে উপন্যাসটির আবহ।

কথানির্মাতা সৈয়দ ওয়ালীউল্ল­াহ্ অনুভব করেছেন যে, আমরা অনেকেই এদেশে জন্মগ্রহণ করে সন্তুষ্ট নই; নিজের দেশকে ভালোবাসতে, দেশ নিয়ে গর্ববোধ করতেও যেন আমাদের খুব কষ্ট। আমরা যেন কোনো কথা কাউকে বুঝিয়ে বলতে গেলেও অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। তরুণরা যেন অল্পকাল পরেই সকল উদ্যম হারিয়ে মিইয়ে যেতে থাকে। আর এদেশের সচেতন সমাজ রাজনীতির কথা উঠলেই বড়ো বেশি ধর্ম আর ধার্মিকদের নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় মত্ত হয়ে পড়ে। আর কেউ কেউ আছেন, যারা চিন্তার মুক্তিতে বিশ্বাসী তরুণসমাজকে কব্জা করে বিদেশপ্রীতির আনন্দ ও সুবিধা ভোগ করে থাকেন। লেখকের ভাবনায় :

‘এদের যে কাউকে যে কোনো সময় কিনে ফেলা যায়। কখনো একটা রেফ্রিজারেটর কিংবা একটা টেপরেকর্ডার বা এমনকি ভাগ্নেকে স্টেটসে পাঠানোর কথাতেও কাজ হয়ে যায়।’

এমনই এক ধনাঢ্য-প্রভাবশালী ব্যক্তির আতিথ্য গ্রহণকারী আমেরিকান এক সাংবাদিক মি. জনসনকে ঘিরে তৈরি ও আবর্তিত হয়েছে বর্তমান উপন্যাসের কাহিনিবলয়; যে কিনা তার দেশের একটি রাজনৈতিক সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রয়োজনে তথ্য-উদ্ঘাটনের মিশনে এখানে এসেছেন। কাহিনিকার গল্পের পটভূমি এই দেশকে কল্পনা করেছেন একটি উত্তপ্ত-গুমোট-ঘনতমসাঘেরা ঘর হিসেবে; সেখানে অবস্থানের এবং পরিকল্পনা-আঁটার স্বাভাবিক পরিবেশ নেই। আমরা জানি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন পশ্চিমা পুরাতন পরাশক্তিগুলোর বেহাল দশা, সমাজতন্ত্রের জাল যখন মানুষকে অনেকাংশে ঘিরে ফেলেছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র দাঁড়িয়ে গেছে একমাত্র পরাশক্তি রূপে। এই পরাশক্তির নতুন পররাষ্ট্রনীতি—বিশেষত আফ্রিকা এবং এশিয়া বিষয়ে রাষ্ট্রটির পলিসি কী, তা পর্যবেক্ষণ এবং মানুষের মর্যাদা, মুক্তি ও ন্যায়বিচারের পক্ষের শক্তি হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনীয় পরামর্শ তৈরির জন্য ‘অপিনিয়ন’ নামক পত্রিকার অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে এখানকার প্রকৃত অবস্থা অবলোকন করতেই মূলত আগমন ঘটেছে মি. জনসনের। আমেরিকার মদদ এবং সহযোগিতা কোনো ধরনের ব্যক্তি কিংবা দলের প্রতি থাকা উচিত—এমন ভাবনাও তার পর্যবেক্ষণ-কর্মসূচির অন্বিষ্ট বিষয়। সদ্যস্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিকাশমান অর্থনীতির এবং নবতর রাজনীতির অতি প্রয়োজনীয় কতিপয় বিষয় উপন্যাসটির ফ্রেম নির্মাণ করেছে। আর কাহিনি-পরিসরের ফ্রেমে প্রবেশ করেছেন ইতিহাসের অধ্যাপক, অর্থনীতির অধ্যাপক, ব্রিটিশ কাউন্সিলের কর্মকর্তা, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত, চিত্রশিল্পী, তরুণ শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক অধ্যাপক [আহসান নামের এই প্রফেসরকে মার্কিনিরা অপছন্দ করে; দেশের পক্ষে অনেককিছু ভাবতে গিয়ে, ভাবনা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি তিনবার জেল খেটেছেন; আমেরিকানদের দেশভ্রমণের আমন্ত্রণ তিনি প্রত্যাখান করেছেন; তাদের দেশে যাবার ইচ্ছা তার নেই, তারা এদেশে কী করছে সে বিষয়ে তার আগ্রহ] ও তার ভক্ত ছাত্রী, প্রধানমন্ত্রী, ঝিমিয়েপড়া কোনো এক সচিব, শিল্পকারখানার বিদ্রোহী শ্রমিক, বিক্ষোভরত শিক্ষার্থী, উপাচার্য, সংবাদপত্রের সম্পাদক ও সংবাদকর্মী, ভিনদেশি এনজিও কর্মী, জাঁদরেল ব্যবসায়ী, মার্কিন গোয়েন্দা-উপদেষ্টা, পুলিশপ্রধান, গোয়েন্দাপ্রধান, তরুণ সেনাকর্মকর্তা, জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিককর্মী তরুণী আর পরিপার্শ্বের কোনো কোনো প্রাসঙ্গিক চরিত্র। পরিবেশিত হয়েছে মানুষের বিচিত্র প্রবণতা; যা সমাজ-রাজনীতিকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রতিভাত করে।

নবপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের নতুন নির্বাচন আর নবগঠিত সরকারের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রনীতি; অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন-পরিকল্পনা, বিদেশি সাহায্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র নির্ধারণ, নির্বাচনী ওয়াদা পালন-না-পালন প্রসঙ্গ এবং রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিত্ব ও হঠকারীপ্রবণতা উপন্যাসটিতে প্রক্ষেপণ করেছে নতুন বারতার আলোক। একটি অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর দিনলিপি এবং ভোটাধিকার নিয়ে রাজীতিবিদরা কী ধরনের খেলা খেলে থাকেন; উন্নত দেশগুলো—বিশেষত শোষণের লোভ যাদের রয়েছে, অশিক্ষিত অসহায় জনগণের ভাগ্যলিপিতে কীভাবে কালো দাগ আঁকেন—এসবের ভাবনাছবি পরিবেশিত হয়েছে ‘কদর্য এশীয়’তে। কমিউনিস্টবিরোধী গণতন্ত্রকামী শাসকরা শিল্পায়নের গতিকে স্থবির করে নিরপেক্ষতার ফাঁকা বুলি ছড়িয়ে রাস্তা-সংস্কার, বন্যা-খরা প্রভৃতি দুর্যোগে খাদ্য-বস্ত্র-ওষুধ প্রভৃতি বিতরণ করে জনগণের মন জয়ের কায়দা অন্বেষণ করছেন; আর খুঁজছেন একাজে তাদের অনুগত সরকার। ওয়ালীউল্লাহ্ বর্তমান উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে আমাদেরকে জানাচ্ছেন, এশিয়া-আফ্রিকা প্রভৃতি দারিদ্র্যশাসিত অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী কিংবা সমাজতান্ত্রিক যে দল বা মোর্চাই ক্ষমতায় আসীন হোক-না-কেন আমেরিকার তাবেদারির বাইরে যাবার যোগ্যতা তাদের নেই; ব্যক্তিস্বার্থ আর নিজ দেশের প্রতি দেশের জনগণের প্রতি প্রবল অনাসক্তিই শেষপর্যন্ত তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। ভিনদেশপ্রীতি, দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি অনীহা ইত্যাকার আধুনিক (!) চিন্তায় একশ্রেণির সুবিধাভোগী সমাজ হয় রাষ্ট্র পরিচালনা করে নয়তো পরিচালনায় সহায়তা করে; এরা কোনোভাবেই জনসম্পৃক্ত নয়; দেশের আলো-বাতাসের সঙ্গে তাদের জীবনপ্রণালি মানানসইও নয়।

সরকারি চাকরির প্রতি অবিকল্প আস্থাশীল, উপনিবেশবাদের ফেলে-যাওয়া উত্কট গন্ধের প্রতি অকৃত্রিম অনুগত, ধোঁকাবাজির গণতন্ত্র চর্চাকারী জনতা যে প্রকৃতপক্ষে নিজের মুক্তি আনতে পারে না, সে কথা লেখক বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য নেতারা ক্ষমতায় যাবার আগে ভালো ভালো কথা বলে থাকেন; এই উপন্যাসে বর্ণিত আব্দুল কাদের, পরে যিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন [এবং যথারীতি আমেরিকার দালালি করেছেন], সংসদ সদস্য থাকাকালে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন :

‘আসুন, দেশের প্রতিটি ঘরে মুক্তির নির্মল প্রাণোচ্ছ্বল বাতাস বইয়ে দিই। এ বাতাস আমাদের দিগন্তজোড়া ধানক্ষেত, নদী-নালা, সমভূমির ওপর দিয়ে বয়ে যাক। আসুন জেগে উঠে আমরা মুক্তির স্বাদ নিই, এর আনন্দ এবং এমনকি এর ঝুঁকির সঙ্গে পরিচিত হই।’

প্রকৃতপক্ষে অর্থনৈতিক সংগ্রামে মানুষকে সমবেত করতে, কৃষিবিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশের সামাজিক-মানবিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখতে অসমর্থ মানুষগুলোই যে এশিয়ার জন্য প্রধান অভিশাপ, সে রকম ইঙ্গিতই বোধকরি, ওয়ালীউল্ল­­াহ্ পরিবেশন করতে চেয়েছেন বর্তমান উপন্যাসের বিরাট ক্যানভাসের আড়ালে থেকে। তাবেদার প্রকৃতির লোকেরা যে দেশ এবং বিদেশ কারো জন্যই মঙ্গলকর নয়, সেরকম আভাস প্রকাশ পায় কাহিনিতে বর্ণিত আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের কল্পনায়। তিনি জানান :

‘এশীয় দেশগুলিতে আমাদের অবস্থান আসলে বালির বাঁধ, এক মুহূর্তে আমরা ধসে পড়তে পারি। এতকাল ভাবতাম কোনো লক্ষ্যে তীর ছুড়ছি, এখন দেখছি লক্ষ্য নেই, তীর বিঁধছে হাওয়ায়।’

ক্ষুধাকে জয় করার, আর্থিক নিশ্চয়তায় জীবনযাপনের আর অনির্ভর চিন্তা প্রয়োগের যে জাতীয়তাবোধের স্বপ্ন প্রফেসর আহসান লালন করছেন, তার পরিপূর্ণ সফলায়নের মধ্য দিয়ে এশিয়ায় [এমনকি আফ্রিকায়ও] প্রতিষ্ঠিত হোক সত্যিকারের স্বাধীনতা; ভিনদেশি হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত হোক পিছিয়েপড়া সব জাতি; নিজস্ব পদক্ষেপে বেড়ে উঠুক তাদের সমৃদ্ধি—এই অভিপ্রায় সৈয়দ ওয়ালীউল্ল­­াহ্র। আর ‘কদর্য এশীয়’ সেই ভাবনা পরিবেশনের এক স্বচ্ছ পাত্র।

আমেরিকার বিভিন্ন তথ্য-সংগ্রহকারী সংস্থা এশিয়াতে কাজ করে চলেছে, তাদের দেশের অভিপ্রায় সম্বন্ধে ধারণা প্রদানের মিশন নিয়ে; ভিশনও আছে নিশ্চয়ই। ‘মানুষের মর্যাদা, মুক্তি ও ন্যায়বিচারের পক্ষের শক্তি’ হিসেবে নিজেদেরকে জাহির করে তারা মূলত রাষ্ট্রীয় ফায়দা অর্জনের চেষ্টায় রাতদিন ব্যস্ত। ব্রিটিশ শাসকদের এ দেশ ছেড়ে যাবার প্রায় দুই দশক আগে তাদের আনুকূল্য পাওয়া স্বায়ত্তশাসিত সরকারের একজন মন্ত্রী, পরে যিনি স্বৈরশাসক ও দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচয় লাভ করেছেন, তার [কাল্পনিক হলেও তিনি ভারতের নেতা; তাকে দিয়েই চিনতে পারা যায় আমাদের জাতীয় নেতাদের চরিত্র] সঙ্গে সাক্ষাত্ করে একজন আমেরিকান সাংবাদিক যে তথ্য আবিষ্কার করেছেন, তা আমাদের জন্য দারুণ শিক্ষণীয় বারতা বহন করে। তিনি জানাচ্ছেন :

‘মন্ত্রী হিসেবে তার অভিজ্ঞতা অবশ্য পূর্ব থেকে তৈরি করে দেওয়া কিছু কাগজপত্রে স্বাক্ষর করার বেশি কিছু দাঁড়ায়নি, কোথাও কোনো কর্তৃত্ব ফলানোর সুযোগ তার ছিল না। কোথাও কল্পনাশক্তি খাটাতে হয়নি, কোনো দায়দায়িত্ব বহন করতে হয়নি।’

অবশ্য তিনি লন্ডন থেকে জামাকাপড় বানিয়ে আনতেন, তার ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করত ইংল্যান্ডের সেরা সেরা স্কুলে, অবকাশ যাপনের জন্য সেদেশে একটা সুরম্য বাড়িও কিনেছিলেন। মুশকিল হলো দেশ স্বাধীনের পর, যখন তাকে নতুন জন্ম নেওয়া একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের দায়িত্ব নিতে হলো। তিনি স্বাভাবিকভাবেই কিছু স্বার্থান্বেষী লোকের দ্বারা পরিবেষ্টিত হলেন। কেননা, ‘নেতা নিজ দেশ সম্পর্কে অনাসক্ত থাকলে, তার চারপাশে এমন সব লোকজন ভিড় করে, যাদের একমাত্র আসক্তি ব্যক্তিস্বার্থে।’ নির্বাচনে তার ভরাডুবির কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমেরিকান সাংবাদিক বের করে ফেলেন তার দুর্বলতার আর নির্ভরতার জায়গাগুলো। যখন, আজকের বিশ্বে, দূরদৃষ্টি কিংবা দূরভিসন্ধিই হলো রাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রনীতির চাবিকাঠি, সেখানে এমন ব্যক্তির নেতৃত্ব একটা ভূখণ্ডের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। লেখক আমাদেরকে কৌশলে জানাতে চেয়েছেন আমাদের জাতীয় এবং ঐতিহ্যিক দুর্ভাগ্যের ইতিহাস। বলছেন : ‘একটি নতুন দেশ, যার সামনে অনেক সংস্কারের কাজ পড়ে আছে, যাকে বহুকিছু তৈরি করে নিতে হবে, সে দেশে এসব লোক কোনো উপকারে আসে না।’

‘নিরপেক্ষতা’ নামক যে নিদ্রাবটীকা খেয়ে আমরা [ভারতীয়] রাষ্ট্রনীতিকে পরিহাস করি, তার সত্যাসত্যের কিছু ইঙ্গিতবারতা সৈয়দ ওয়ালীউল্ল­­াহ্ পাঠিয়েছেন বর্তমান কাহিনির মাধ্যমে। উপন্যাসে বর্ণিত কাহিনিতে দেখা যায়, আমেরিকান নীতির অন্ধ-অনুসারী নানাভিকে পরাজিত করে নির্বাচনে আব্দুল কাদের জয়ী হয়েছেন সমাজবাদীদের ওই ‘নিরপেক্ষতা’ নীতিকে সমর্থনের কথা প্রচার করে। লেখক জানাচ্ছেন :‘আব্দুল কাদেরের দিক থেকে এটা ছিল স্রেফ এক নির্বাচনী কৌশল। নিরপেক্ষতা নীতিতে কোনোকালে তাঁর আস্থা ছিল না।’ নতুন জন্ম নেওয়া পাকিস্তানের চালচিত্র সম্বন্ধে দুজন ইংরেজের কথোপকথনের মাধ্যমে কথাশিল্পী তাঁর নিজ দেশের মানুষদের যে চরিত্র প্রকাশ করেছেন, তা আজও আমাদের চোখের সামনে সত্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সমকাল এবং উত্তরকালের দ্রষ্টা শিল্পী ওয়ালীউল্ল­­াহ্ লিখেছেন :

‘দেশটা খারাপ না, এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। এখানকার লোকজন ধর্মপ্রাণ, সমাজতন্ত্রের তোয়াক্কা এরা করে না। যারা সত্যি-সত্যি করতে পারত, তারাও সরকারি চাকরিতে ঢুকে পড়েছে, সরকারি চাকরি এরা আবার খুব পছন্দ করে। তারপর আছে ব্যবসায়ী আর শিল্পপতিদের একটা ক্ষুদে, বর্ধিষ্ণু গোষ্ঠী, তারা কোনো সমস্যা পাকাবে না। কাজেই যদি মূল নেতা ঠিক থাকে তো সব ঠিক।’

‘নিরপেক্ষতা’র আড়ালে আমরা যে আমেরিকানদের চিন্তাচেতনাকেই ধারণ ও লালন করি, সে সত্যই লেখক পরিবেশন করতে চেয়েছেন। আমরা জানি, রাষ্ট্রশাসনের জন্য একজন নেতাকে অনেক গুণে ও শিক্ষায় আলোকিত মানুষে পরিণত হতে হয়; তাকে জানতে হয় জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য ও পশ্চাত্পদতার শতাব্দিপ্রাচীন সমস্যাবলি, সংসদ ও সরকার-ব্যবস্থার যাবতীয় খুঁটিনাটি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বিভিন্ন অর্থনৈতিক তত্ত্ব, সমকালীন বিশ্বের পরিস্থিতি; তাকে বুঝতে হয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সম্ভাবনা ও ঝুঁকিসমূহ। লেখক বারবার তাঁর পাঠককে মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, আমেরিকা এবং তার সহযোগীরা ভারত-পাকিস্তানের মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করার জন্য রাজনৈতিক তত্পরতা চালায় সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধের মতবাদকে জোরদার করার লক্ষ্যে; আধুনিক শিল্পায়ন না করে তারা চিরপ্রাচীন কৃষির ওপর জোর দিতে চায়—যেন অর্থনৈতিক সংগ্রামে তারা বিশ্ব পরিমণ্ডলে পরিভ্রমণ করতে না পারে; আর বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকার প্রত্যয়ে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারাকে তারা প্রশ্রয় দিতে চায় না কিছুতেই। ক্ষুদ্র দলবিশেষকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনের আগে জোটপাকানো এবং বিজয়লাভের পরে জোটের শরিক হিসেবে তাদেরকে মূল্যায়ন না করার যে নোংরা পলিসির কালচারে আমরা অভ্যস্ত, তার গতি-প্রকৃতিও লেখক বুঝাতে চেষ্টা করেছেন আমেরিকান-পাকিস্তানি কৌশল-নির্ধারণ-আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে।