এই বিজয়ের মাসে কী পড়ছ, কী দেখছ...

দেখতে দেখতে আরো একটি ডিসেম্বর পেরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের কাছে ডিসেম্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস—যা একইসঙ্গে  আনন্দের ও বেদনার। বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই বুঝে গেছ কেন আনন্দের এবং কেন বেদনার। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে আমরা বিজয় অর্জন করেছিলাম এই ডিসেম্বরেই—যা আমাদের জীবনের সব থেকে আনন্দের ঘটনা। আর সেটি ছিল ১৬ ডিসেম্বর। বাঙালির বিজয় আসন্ন বুঝতে পেরে হানাদার বাহিনী ১৪ ডিসেম্বর আমাদের সূর্যসন্তান তথা বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে গিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে গণকবর দেয়। এ ঘটনা আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনার। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে জন্ম নিয়েছি, তারা যেন মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো কেমন ছিল তা বুঝতে পারি, জানতে পারি, তাই আমাদের লেখক, কবি, চলচ্চিত্র-নির্মাতারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসংখ্য গল্প, কবিতা, উপন্যাস লিখেছেন এবং নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্র। আমরা তোমাদের জন্য তেমনই দুটি চলচ্চিত্র এবং বইয়ের কথা বলব।

গ্রন্থনা :জাজাফী

 

মুক্তিযুদ্ধের শিশুতোষ সাহিত্য

কাকতাড়ুয়া

 

সেলিনা হোসেনের শিশুদের জন্য লেখা উপন্যাস ‘কাকতাড়ুয়া’ বাংলা শিশুসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। এই উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে পিতামাতাহীন এক কিশোরের দেশপ্রেম এবং মুক্তিযুদ্ধে তার সাহসিকতাপূর্ণ অবদানের কথা।  উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকারদের নির্মম নির্যাতনের চিত্র ফুটে উঠেছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা কীভাবে প্রচণ্ড সাহসের সঙ্গে লড়াই করেছেন, তার উপাখ্যান রয়েছে। ভয়কে জয় করে কোমলমতি শিশু-কিশোররা কীভাবে এই মহান মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে, তা উল্লেখ করা হয়েছে সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায়। হানাদার বাহিনীর নিষ্ঠুরতা প্রত্যক্ষ করে শিশুদের মনে যে পরিবর্তন আসে, তা ‘কাকতাড়ুয়া’ উপন্যাস পড়লে উপলব্ধি করা যাবে।

 

রতন

জনপ্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনেক লেখা লিখেছেন। ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ সেসবের অন্যতম। তবে ‘রতন’ উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ রচনার অন্যতম। এই গল্পে দেখা যায় রতন নামে একটি আট বছরের ছেলে আগুনে জ্বলতে থাকা বাড়ির সামনে বসে আছে। দুজন মুক্তিযোদ্ধা ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় ওর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারে—পাকিস্তানিরা ওর বাবা-মাকে মেরে ফেলে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। রতন বলে, ওকে যদি সাথে নেয় তবে ও মুক্তিযোদ্ধা হবে। এরপর রতন মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয় এবং একের পর এক অভিযানে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করে।

 

মুক্তিযুদ্ধের শিশুতোষ চলচ্চিত্র

আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের অসামান্য আত্মত্যাগ আর বীরত্বগাথাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে বেশকিছু ভালো মানের চলচ্চিত্র। এসব চলচ্চিত্রে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বাংলার সাধারণ মানুষের ওপর নৃশংস অত্যাচার উঠে এসেছে সবচেয়ে বেশি। মোরশেদুল ইসলামের ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ এবং তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ এগুলোর অন্যতম।

 

আমার বন্ধু রাশেদ

সরকারি অনুদানে মুহম্মদ জাফর ইকবালের জনপ্রিয় কিশোর উপন্যাস অবলম্বনে ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ ছবিটি নির্মাণ করেছেন মোরশেদুল ইসলাম। ১৯৭১ সালে মফস্বল শহরের কয়েকজন কিশোর কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তারই চিত্র ফুটে উঠেছে এ চলচ্চিত্রে। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তেও চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র রাশেদের মধ্যে দেশপ্রেম ছিল অটুট। গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে পড়তেও সে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ওঠে, যা আমাদের মধ্যে সাহস আর দেশপ্রেমের বীজ বুনে  দেয়।

মাটির ময়না

তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ নির্মিত হয় ২০০২ সালে। অস্কারের জন্য মনোনীত এটাই বাংলাদেশের প্রথম কোনো চলচ্চিত্র। এ চলচ্চিত্রে একাত্তর সালের আগের পূর্ব-পাকিস্তানের চিত্র এবং তারেক মাসুদের ছেলেবেলার মাদ্রাসা জীবনের অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছে। পুরো চলচ্চিত্রে ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা থাকলেও সেগুলো একটি কিশোরের মানবিক অভিজ্ঞতায় প্রকাশিত। মাদ্রাসায় তার শিক্ষক, সহপাঠীদের আচরণ ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রটির কাহিনি এগিয়েছে। মূল গল্পের পাশাপাশি এ চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে নদীমার্তৃক বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সহজ-সরল গ্রামীণ জীবন। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘মাটির ময়না’ একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।