দেশের উন্নয়নে প্রচুর বরাদ্দ পাওয়ার পরেও কাজে অপব্যয় ও গাফিলতি দেখা যায়। স্থানীয় প্রতিনিধি ও জনগণের এই কাজ বুঝে নেওয়ার একটি দায় আছে না? এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী? জানতে চাওয়া হয়েছিল পাঠকদের কাছে। ইমেইল এবং টেলিফোনে পাঠকের দেওয়া প্রতিক্রিয়া আজ প্রকাশ করা হলো।
দেশে উন্নয়ন হচ্ছে এ কথা যেমন অস্বীকার করা যাবে না। তেমনি উন্নয়নের অন্তরায় অপব্যয় ও গাফিলতিও অস্বীকার করা যাবে না। উন্নয়নের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়, তবু কাজে অলসতা ও গাফিলতি দেখা যায়। সরকারি সম্পদ নষ্ট হতে দেখা যায়। বাজেটের পরও মাসের পর মাস চলে একই অবস্থায়। এ থেকে উত্তরণে আমার অভিমত হলো—কাজ বুঝে নেওয়া ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রতিনিধি ও প্রশাসন অগ্রণি ভূমিকা পালন করা এবং জনগণও দায়িত্বে সচেতন হওয়া।
উবাইদুল্লাহ
তারানগরী, দুধনই, ধোবাউড়া, ময়মনসিংহ
উন্নয়ন কাজে সবচেয়ে বেশি বাধা হচ্ছে দুর্নীতি। কি প্রশাসনের ভেতরে কি প্রশাসনের বাহিরে। সকল স্তরে এই উন্নয়নের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্নীতি। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বেশির ভাগই হয় প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে। সুতরাং, আমরা প্রত্যাশা করছি উন্নয়নের কাজে অপব্যয় ও গাফিলতির বিরুদ্ধে এখনই দৃঢ়ভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।
মো. সিকান্দার আলী সাগর
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, শান্তিনগর, ঢাকা
মানুষের জীবনে দায়িত্বশীলতা অনেক বড়ো একটি বিষয়। সবক্ষেত্রে দুর্নীতি লাগামহীন হয়ে পড়েছে। সেজন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। তাই এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রতিনিধি ও জনগণের এসব কাজ বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে। তা-না হলে উন্নয়ন শুধু হবে, ক্ষতি হবে অর্থের ও সময়ের। দেখতে হবে বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো কীভাবে তাদের সময় ও দায়িত্বকে গুরুত্বসহকারে পালন করেন।
সৈয়দা নাসরিন সুলতানা শেলী
নিউ ইয়র্ক, সানিসাইড, আমেরিকা
দেশে বর্তমানে যে হারে উন্নয়ন হচ্ছে তা সত্যি বিস্ময়কর। এই উন্নয়ন আরো জোরালো এবং মানসম্মত হতো যদি আমাদের স্থানীয় প্রতিনিধি আরো কঠোর হতো। স্থানীয় প্রতিনিধি যদি জনগণের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে যার যার এলাকায় সরকারি কাজে তদারকি করার দায়িত্ব নিজের সন্তানের মতো নিত তাহলে আমাদের এদেশ আরো অনেক আগেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হতো।
ডা. জামিল রহমান
গোপালপুর, টাঙ্গাইল
আমাদের দেশে উন্নয়ন খাতে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হয় দেশি এবং বিদেশের সাহায্যে সে অর্থ যদি সঠিকভাবে খরচ হতো তাহলে দেশের উন্নয়ন আরো সার্বিক হতো। আমাদের দেশে বিশেষ করে রাজধানীতে তিনটি সেবা সংস্থা রয়েছে যেমন- সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, বিটিআরসি এদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করা যায়। কারণ সিটি করপোরেশন রাস্তায় পাইপ ফেলে, রাস্তা তৈরি করে তারপর দেখা যায় ওয়াসা পানির লাইনের কাজ করে। এরূপভাবে বিটিআরসি রাস্তায় কাজ করে থাকে—এই খোঁড়াখুঁড়ির ফলে রাস্তায় উন্নয়নের চেয়ে অবনতিই হয় বেশি। তাছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি থাকেই।
খন্দকার কামরুজ্জামান
৩৬৩/১০, উত্তর পীরেরবাগ, ঢাকা
আমাদের দেশে উন্নয়নকাজে অনেক অর্থ ব্যয় করেও সময়মতো কাজ সমাপ্ত হয় না। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণ। লাভবান হয় জনপ্রতিনিধিসহ উন্নয়ন কোম্পানি। এটা সত্যিই দুঃখজনক বিষয়। রাঘব বোয়ালদের হাতে কাজ দিতে একশ্রেণির টেন্ডারবাজরা উঠেপড়ে লেগে যায়। ফলে নিয়মতান্ত্রিক ও সময়মতো কাজ সম্পন্ন না হয়ে পড়ে থাকে বা দেরিতে সম্পন্ন হয়। ফলে উন্নয়নকাজে অপব্যয় ও গাফিলতি ঘটে যায়।
মো. মামুন
বংশাল, ঢাকা
উন্নয়নে অপব্যয় ও গাফিলতির মূল কারণ হচ্ছে সরকারি কাজসমূহ রাজনৈতিক নেতা বা নেত্রী অথবা গডফাদারের লোকজন পেয়ে থাকেন। তারা অন্য কাউকে পরোয়া করে না নিজের ইচ্ছেমতো কাজগুলো নির্দিষ্ট সময়ে না করে দীর্ঘমেয়াদি করে থাকে। ফলে কাজের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং কাজের গুরুত্ব কমে যায়। রাজনীতি ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ কাজ পেলে বিভিন্ন প্রকারে চাঁদা প্রদান করতে হবে। যার কারণে উন্নয়নের অপব্যয় বৃদ্ধি পায়।
মুহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ
সরদারপাড়া, মুন্সীগঞ্জ
উন্নয়ন কাজ শুধু অবহেলা বা গাফিলতি হয় না, দুর্নীতিও হয়। আর এসব কাজ করায় যারা দায়িত্ব পালন করে তারা হয় সরকার দলীয় লোক বা উচ্চতর পর্যায়ের কোনো নেতার আত্মীয়। এ কারণে তার সমাপ্তি হতে যেমন বিলম্ব হয় তেমন কাজও নিম্নমানের হয়। আর এগুলো দেখার দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত তারাও ঠিকমতো তদারকি করতে পারেন না, হয় তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় অথবা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিষয়টি অন্যভাবে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। এ কারণে সাধারণ জনগণ কোনো সময় প্রতিবাদ বা অভিযোগ জানালেও এগুলো কার্যকর হয় না। এ কারণে কাজের দায়িত্ব দেওয়ার সময় স্থানীয়ভাবে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করলে এ কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে।
মাখরাজ খান
সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ
দেশের উন্নয়নে প্রচুর বরাদ্দের পরেও অপব্যয় ও গাফিলতি এদেশে একটি সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংস্কৃতি আমাদের জন্য অভিশাপ। এবং সকল অগ্রযাত্রাকে করে বাধাগ্রস্ত। দলীয় নেতাকর্মীদের প্রভাবের কারণেই যত অঘটন বলে আমি মনে করি। সকল দুর্নীতির কারণেই দেশের উন্নতির বারোটা বাজায়। স্থানীয় প্রতিনিধিরা কাজ বুঝে নেওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও সবাই সেটা আন্তরিকভাবে নেয় না। তারা দায়িত্বের প্রতি অবহেলা করে। আর সাধারণ জনগণ ভেজালের জালে পড়তে চায় না।
মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক
প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, কান্দাইকোনা, রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ
উন্নয়নকাজে অপব্যয় ও গাফিলতি করা কোনোভাবেই ঠিক নয়। এতে করে উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে দেশের জনগণ। তাই এ ব্যাপারে জনপ্রতিনিধিদেরই নিজ এলাকায় জানিয়ে দিতে হবে যে নিজের উন্নয়নে নয়, জনগণের উন্নয়নই আমার উন্নয়ন।
মাসুম আহমেদ
শিকড় সন্ধানে,
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
‘নেতা মানেই বাটপার, মিথ্যা আশ্বাসের ফুলঝুরি’। গত বুধবার সকালে পত্রিকা পড়ার সময় পাশে বসা একজন এই কথাগুলো বিড়বিড় করে বলছিলেন। কেন, কোন নেতার কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে এমন খেদ প্রকাশ করলেন, তা বিস্তারিত জেনে নিতে আমিও আর অপেক্ষা করলাম না। শুনলাম তার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। তার কথায়ও উঠে আসে এক জনপ্রতিনিধির ভাগবাঁটোয়ারামূলক কর্মকাণ্ড আর মিথ্যা আশ্বাসের ফুঁলঝুরির চিত্র। জনপ্রতিনিধিদের অসত্ কর্মকাণ্ড ও অপব্যয়মূলক উন্নয়নের ফলে সাধারণ মানুষ বাস্তবেই প্রতারিত হন।
তৌহিদ বিল্লাহ
পলাশ, নরসিংদী
একটি দেশের উন্নয়ন তখনি বোঝা যায়, যখন দেশের উন্নয়ন কাজ ত্বরান্বিত হতে থাকে। কিন্তু মাঝে মাঝে আমাদের দেশে উন্নয়ন কাজ ব্যাহত হতে দেখা যায়, যদিও উন্নয়নের কাজে প্রচুর বরাদ্দ থাকে। এ বিষয়ে জনগণ ও স্থানীয় প্রতিনিধির ওপর দায় বর্তায়। আমাদের দেশের উন্নয়ন কাজের চক্র একটু অন্যরকম। কাজ শুরু, মধ্যপথে আটকে যাওয়া, কিন্তু কাজ কখন শেষ হবে তা বলা মুশকিল বটে। কখনো কখনো দেখা যায় রাজনৈতিক কারণে এবং প্রভাবশালীদের প্রতিপত্তিতে উন্নয়ন কাজ ব্যাহত হয়। আর তখন স্থানীয় প্রতিনিধি কিংবা জনগণ কাজের আগাগোড়া বুঝে নিলেও কাজ আর শেষ হয় না। আর তাই যখন এই উন্নয়ন কাজ ব্যাহত হয়, তখন সেটাকে আর উন্নয়ন বলা যায় কি না সে বিষয়ে আমি কিছুটা দ্বিধান্বিত।
ফারজানা বিনতে মুরাদ ঈরা
মধুখালী, ঝিকরগাছা, যশোর
বর্তমান সরকার টানা তৃতীয় বারের মতো ক্ষমতায় থাকায় দেশের সার্বিক উন্নয়নের ধারাবাহিতা রক্ষাকল্পে প্রচুর পরিমাণ আর্থিক বরাদ্দ বিভিন্ন খাতে দেওয়া হচ্ছে বলে একনেক, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও গণমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে। কিন্তু বরাদ্দ অনুপাতে কাজের অগ্রগতি সে পরিমাণে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। অধিকন্তু বিভিন্ন উন্নয়ন খাতের টাকা নয়-ছয় হচ্ছে বলে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এতদসংক্রান্ত অহরহ বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। এরই মধ্যে রূপপুর প্রকল্পের বালিশ কেলেঙ্কারি, সরকারি হাসপাতালগুলোর বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট ক্রয় কেলেঙ্কারি, নির্মাণ খাতে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের কেলেঙ্কারি, উদ্বোধনের আগে ভবন ও ব্রিজ ধসে পড়া কেলেঙ্কারি, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের অর্থ লোপাট কেলেঙ্কারি, সরকারিদলের এমপির পরীক্ষা কেলেঙ্কারি, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু কিছু ভিসিসহ সরকার সমর্থিত কিছু ছাত্রনেতাদের বিভিন্নমুখী কেলেঙ্কারি। তবে আশার কথা হলো স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এসব কেলেঙ্কারি বন্ধে কার্যকর সাহসী পদক্ষেপ নিতে কোনো প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা গাফিলতি করছেন না।
ভূঁইয়া কিসলু বেগমগঞ্জী
চৌমুহনী, হাজীপুর, বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী
ছোটোবেলা থেকেই খুবই প্রচলিত একটি প্রবাদ কথা শুনে আসছি—‘সরকারি মাল, দরিয়ামে ঢাল’। বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশে, সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপচয়-দুর্নীতি ও ব্যয়বাহুল্যের কোনো সুযোগ থাকা মোটেই সমীচীন নয়। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি শুধু নয়, দুর্নীতিরও দৃষ্টান্ত রয়েছে। সরকারি ক্রয়ে উপযোগিতা যাচাই এবং মান নিশ্চিতকরণে দুর্বলতা; সরকারি সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে অব্যবস্থাপনা এবং এসবের পরিণামে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের এসব দৃষ্টান্ত আমাদের মতো গরিব দেশের জন্য উদ্বেগের প্রধান কারণ।
মোহাম্মদ শহীদউল্যা
হকভিলা, মেরাদিয়া, সিপাহীবাগ, ঢাকা
প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে প্রতিবেশী ভারত ও চীনের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করে বাংলাদেশ। অথচ গুণমান খারাপ। এই বাড়তি খরচের জন্য উচ্চ মাত্রায় দুর্নীতি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়া ও দরপত্রে প্রতিযোগিতা না থাকাকে দায়ী করেছে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন। তাছাড়া সাম্প্রতিক বালিশ, পর্দা, বেঞ্চ ইত্যাদি বেশ কয়েকটি কেলেঙ্কারি ফাঁস হবার পর সরকারি অর্থ নয়-ছয়ের একটি খণ্ড চিত্র জনসম্মুখে প্রকাশ পায়। এ ধরনের অতিমাত্রার অপচয়-অপব্যয় দেখে মনে হয়, এটা যেন আমাদের সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ ধরনের নয়-ছয়ের নামে বহু পুকুরচুরির ঘটনা ঘটলেও এর কিয়দংশই প্রকাশ পায়। এগুলো প্রকাশের পর এর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকে বেশ সোচ্চার হতে দেখা যায়। কিন্তু খুব কম লোকই শাস্তি পায়। আমাদের এই সীমিত সম্পদের দেশে অপব্যয়-অপচয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি, জবাবদিহিতা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
মো. জিল্লুর রহমান
সতিশ সরকার রোড, গেন্ডারিয়া, ঢাকা