রক্তচাপ উঠে গেল বিপদ সীমায়। মোকাবিলা করবেনই তো। খাদ্যাভ্যাস বদলানো হলো, নুন খাওয়া কমালেন, কাজ হলো না—তখন ওষুধ গ্রহণ। কাজ হলো না, ওষুধ আরো যোগ হলো সকালের রুটিনে। খাদ্যবিধি, ওষুধ সামলানো অত সহজ নয়। তবে আছে কিছু ঘরোয়া দাওয়াই পরামর্শ। সেগুলো চালানো যায়, তবে স্বাস্থ্যবিধি বা ওষুধের তা বিকল্প নয় মোটেও। জীবনকে উপভোগ করা রক্তচাপও কমানো। এই সত্সঙ্গ।
সূর্যের কাছে যাওয়া
রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে হূদয় উষ্ণ হয়। কেবল কি তাই? সুস্থও থাকে দেহ মন। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখেছেন, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিতে অবগাহন করলে রক্তচাপ বেশ কমে। ভিটামিন ডি উত্পাদনও হয়। কারণ সূর্যালোক ত্বকে সঞ্চিত নাইট্রেটকে নাইড্রিক অক্সাইডে রূপান্তরিত করে, এটি রক্তনালিকে প্রসারিত করে, বলে জানান ডা. রিচার্ড ওয়েলার, যিনি এ নিয়ে গবেষণা করেছেন। রৌদ্রালোকের সঙ্গে হূদেরাগের ঝুঁকি হ্রাসের সম্পর্ক এভাবে
অনুসন্ধান করা যায়।
চিড়িয়াখানায় যাই
জাপানি এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা চিড়িয়াখানায় জন্তুদের দেখেছেন আনন্দে, এদের সিসেটালিক চাপ কমেছে ৬ শতাংশ আর ডায়াসটোলিক চাপ কমেছে ৮ শতাংশ। গবেষকরা এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন, জন্তুগুলো পরিদর্শনের পর পরিসমবেদী স্নায়ুতন্ত্র জাগ্রত হয়, রক্তচাপ কমে। চাপ হরমোন অ্যাড্রিনালিন মৃদু হয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের সংস্পর্শ যেমন চাপ কমায়, তেমনি জন্তুকে আলিঙ্গন করে, স্পর্শ করে তেমনি ফলাফল পাওয়াও সম্ভব।
হাত বাড়ান অন্যদের জন্য
কার্নির্জি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে যে, সব পূর্ণবয়স্করা বছরে অন্তত ২০০ ঘণ্টা স্বেচ্ছাসেবী কাজ করেছেন অর্থাত্ সপ্তাহে ৪ ঘণ্টা স্বেচ্ছাসেবীর কাজ যারা করেননি এদের চেয়ে স্বেচ্ছাসেবী লোকদের উচ্চ রক্তচাপ হওার সম্ভাবনা ৪০ শতাংশ কমে যায়। সুফল আসে দুভাবে। স্বেচ্ছাসেবী কাজ করলে দুস্থ সামাজিক সংযোগ স্থাপিত হয়। বলেন, গবেষক বড়লেমিয়া স্নিড নিজের সমস্যা সমাধানের পথ খুলে যায়। নিজেকে কম বিপদসংকুল মনে হয়। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ইতিবাচকভাবে করতে জানলে চাপের নেতিবাচক দিক এড়ানো যায়। যেসব স্বেচ্ছাসেবী কাজকর্ম নিজে উপভোগ করা যায়, সেগুলো হয় বেশি হিতকর।
কর্মক্ষেত্রে কাজের মধ্যে ধ্যান
সারা দিন ডেসকে রয়েছেন। ফাইলপত্র, তবু চাপ এড়াতে হয়। যেসব কর্মীরা কর্মক্ষেত্রে চেয়ারে বসেও অন্তত ১৫ মিনিট ধ্যান করেন, এদের রক্তচাপ বেশ কমে, সাম্প্রতিক একটি অস্ট্রেলিয়ান গবেষণায় জানা গেছে। বলেন গবেষক ড. এলফেতারেডেস। ধ্যান করলে শান্ত হয় সমবেদী স্নায়ুতন্ত্র। জীবনে লাড়াই ও পালিয়ে যাওয়ার উদ্দীপনা মন্দ্রীভূত হয়। তাই কম উত্সারিত হয় নরইপিনোফ্রিন, এই হরমোন তুঙ্গে তুলে রক্তচাপ। ধ্যান চর্চা শিখে নিতে পারেন প্রশিক্ষকের কাছে আছে এর ভিডিও।
জীবনসঙ্গীকে আলিঙ্গন করুন
প্রেম, ভালোবাসা হলো দাওয়াই। টোটকা নয়, সত্যিকারের দাওয়াই। ‘বায়োলজি-সাইকোলজি’ নামে এক জার্নালে প্রকাশিত নিবন্ধে দেখা যায়, যে মহিলারা তাদের স্বামীকে প্রায়ই ঘনিষ্ঠ আলিঙ্গন করেন, কম প্রেমঘন সম্পর্কের লোকদের চেয়ে এদের রক্তচাপ হয় কম। এই সুফল আসে ‘বন্ধন হরমোন’ অক্সিটোসিনের জন্য; যা কেবল শরীর মন প্রশান্ত-শিথিল করে তাই নয়, হূিপন্ড ও রক্তনালির ওপর সমবেদী স্নায়ুর প্রভাবকেও মৃদু করে। বলেন গবেষক ড. ক্যাথলিন লাইট। কতবার আলিঙ্গন করা উচিত, কত দীর্ঘ হওয়া উচিত সে সম্বন্ধে পর্যবেক্ষণ না করলেও তারা দেখেছেন ‘সহানুভূতিশীল ও প্রেমঘন উষ্ণ স্পর্শ’ যেমন ম্যাসাজ; সঙ্গীকে ম্যাসেজ করলে সপ্তাহে তিনবার অধাঘণ্টা—অক্সিটোসিন হরমোন বাড়ে। যার ফলে রক্তচাপ কমে যায়।
আঁকড়ে ধরুন ও চাপুন
ট্রেডমিলে দৌড়ানো কেবল ব্যায়াম নয়, হার্টকে মজবুত করার জন্য। আইসোমেট্রিক হ্যান্ড গ্রিপ ব্যায়াম একবারে দুই মিনিট করে স্লিংলোডেড হ্যান্ড গ্রিপ চাপ, ১২-১৫ মিনিট বারবার রক্তচাপ কমায়। আমেরিকান হূদেরাগ সমিতির ভাষ্য। পেশিকে যখন সংকুচিত করা হয় কয়েক মিনিট, শরীরকে হাতে রক্তচলাচল পুনঃস্থাপিত করতে হয়। এতে রক্তনালির কার্যকলাপ উন্নত হয় বলেন গবেষকরা। সপ্তাহে অন্তত তিনবার এই ব্যায়াম করা ভালো।
nঅধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস
বারডেম, ঢাকা৬