দীপংকর গৌতম
শহিদ আলতাফ মাহমুদ। এই নামটি বললে আর কিছু বলার প্রয়োজন পড়ে না। বৃহত্তর বরিশাল আমার স্মৃতির সঙ্গে যেভাবে যুক্ত সেভাবে অন্য কোনো জেলা নয়। এই জেলা শহরে আমার সবচেয়ে বেশি আত্মীয়, বন্ধু-স্বজনের বাস। এই শহর দিয়ে হাঁটার সময় মনে হয় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অগ্নিগর্ভা বরিশালের বিভিন্ন ঘটনা। অসংখ্য বিপ্লবী ও অজস্র গুণী মানুষের পদচিহ্ন ভরা শহর বরিশাল। কীর্তনখোলা পাড়ের এ শহরে জন্মেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। এ শহরের এক বৈচিত্র্য খুব চোখে পড়ে—সেটা হলো এত গুণী ও খ্যাতিমান মানুষের শহর হলেও ঐসব মানুষের নামে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ফকিরবাড়ী রোড দিয়ে চলতে চলতে মনে পড়ে ভাষাবিপ্লবী, শহিদ মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ মাহমুদের কথা। নিজের শহরে নিজেই মাইকিং করেছিলেন তার প্রার্থীর পক্ষে। এত মেধাবী সুরকার, গীতিকার এদশে খুব কমই জন্মগ্রহণ করেছেন। আর কেউ সেটা উপলব্ধি না করলেও সেটা হারমাদ পাকি বর্বর ও তাদের দোসররা ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। তাই তাকে যেভাবে হত্যা করেছিল সে কাহিনি বর্ণনা করা ভার। কিন্তু দেশমাতৃকার এই বিপ্লবী সন্তান জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে দেশের মাটি ও মানুষের জন্য কাজ করেছেন। একুশের প্রভাতফেরির সুর শুনলে এখনো চোখ ভিজে যায়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আলতাফ মাহমুদ অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তার বাসায় গোপন ক্যাম্প স্থাপন করেন। কিন্তু ক্যাম্পের কথা ফাঁস হয়ে গেলে ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট পাকিস্তানি বাহিনী তাকে আটক করে। তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। তার বাসা থেকে আরো অনেক গেরিলা যোদ্ধা আটক করা হয়েছিল। সবাইকে মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং কলেজে নেওয়া হয়। বিচ্ছু জালালের সাক্ষ্যতে বর্ণনা আছে, ‘১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট আমি আল বদর বাহিনীর হাতে ধরা পড়ি। নাখালপাড়ায় এমপি হোস্টেলের পাশে একটা গলির কাছে একটা রুমে নিজামী আমাকে নিজ হাতে টর্চার করেছে। সেখানে আমার সহযোদ্ধা বদি, রুমি, জুয়েল, আজাদ, সুরকার আলতাফ মাহমুদ আরো কয়েকজন ছিল। রাইফেলের বাঁট দিয়ে আমার মাথার আঘাত করে আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ আমাকে একবার নির্যাতন করে, আরেকবার জুয়েল, বদি, রুমিকে, আলতাফ মাহমুদকে টর্চার করেছে নিজামীরা। রুমী, বদি, আলতাফ ভাইয়ের আঙুল কেটেছে মতিউর রহমান নিজামী (প্রথম আলো, ৬ জানুয়ারি, ২০১৬)।’
ঘাতকরা তাকে কী করেছে তা জানেনি কেউ। তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরেও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তার দেশাত্মবোধক গান প্রচারিত হতে থাকে, যা অগণিত মুক্তিযোদ্ধাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। বাংলার এই বরেণ্য সন্তানের বাস ছিল বরিশালে। অথচ অন্যান্য অনেকের মতো আলতাফ মাহমুদের তেমন কোনো স্মৃতি এ শহরে নেই। তার নামে একটা সড়ক হতে পারত, একটা বিদ্যালয়, একটা পাবলিক হল। হয়নি কিছুই। আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয় নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পরে ১৯৭২ সালে স্থানীয় সংগীতপ্রেমীদের উদ্যোগে শহিদ আলতাফ মাহমুদের নামে একটি সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপরে ১৯৮৫ সালে বরিশাল নগরীর সদরের হাসপাতাল রোডের পাশে সাড়ে ১০ শতাংশ জমিসহ একটি একতলা পাকা ভবন শহিদ মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয়ের নামে বরাদ্দ দেন তত্কালীন জেলা প্রশাসক। ফলে তার নামে এটা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি গড়ে ওঠে। সেই থেকে হাসপাতাল রোডের ঐ ভবনে শহিদ আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলে আসছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, নগরীর প্রাণকেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত এই মূল্যবান জায়গার উপর দৃষ্টি পড়েছে একটি কুচক্রীমহলের। বাঞ্ছারামের বাগানের মতো এখন শহিদ আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয় বেহাত হওয়ার পথে! জানা যায়, নানা কৌশল চলছে ওটা দখলের জন্য। কেউ কেউ জায়গাটির দখল দাবী করছে। বরিশালের সাধারণ মানুষ খুবই ক্ষুব্ধ এ ঘটনায়। কিন্তু বড়ো জানতে ইচ্ছে করে, কাদের হাত এত বড়ো যে শহিদ আলতাফ মাহমুদের অবদানকেও মলিন করে দেয়? ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ অবধি লড়াই করে আসা এবং বর্বর পাকিস্তানিদের হাতে শহিদ এই আলতাফ মাহমুদ। আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ যাদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া তিনি তাদের অন্যতম। তার নামে গড়া স্কুল দখল করতে যারা চায়, তাদের বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থা নেই? যে আলতাফ মাহমুদ দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন তার জন্য এটা পাওনা হতে পারে? দেশপ্রেমিক সংস্কৃতিকর্মীরা বলছেন, ‘আমরা আন্দোলনে হারব না!’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আলতাফ মাহমুদকে এবং এইসব সংস্কৃতিকর্মীদের হারতে দেবেন না বলে বিশ্বাস করি।
n লেখক : কবি ও সাংবাদিক