নির্বাচনি প্রচারণায় ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন স্পষ্ট করেছিলেন, তার দেশের ভবিষ্যত্ ব্রেক্সিটেই। আর জেরেমি করবিনের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি বলেছিল, তারা ক্ষমতায় গেলে দ্বিতীয়বার ব্রেক্সিটের জন্য গণভোটের ব্যবস্থা হবে। শেষ পর্যন্ত পার্লামেন্ট নির্বাচনে ব্রেক্সিটের পক্ষে বিপুল রায় দিয়ে বরিস জনসনেই আস্থা রেখেছেন ভোটাররা। ভূমিধস জয় নিয়ে সরকার গঠনের প্রস্তুতি শুরু করে বরিস ৩১ জানুয়ারির মধ্যেই ইইউ ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। শোচনীয় পরাজয়ে লেবার পার্টির নেতৃত্ব ছাড়ছেন করবিন। বিশ্লেষকরা বলছেন, জয়ে কনজারভেটিভ পার্টির লাভ হলেও ব্রিটেনের অখণ্ডতার ওপর চাপ তৈরি করবে এই ফলাফল। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নারী প্রার্থী জয় পেয়েছেন। খবর বিবিসি, ব্রিটিশ টেলিগ্রাফ ও দ্য গার্ডিয়ান ও ডয়চেভেলের
কে কত আসন পেল
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমন্সের মোট আসন ৬৫০। গতকাল পর্যন্ত ৬৪৯টি আসনের ফল ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে বরিস জনসনের কনজারভেটিভ পার্টি ৩৬৪, লেবার পার্টি ২০৩, স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি) ৪৮, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস ১১, ডিইউপি ৮, সিএন ফেইন ৭, প্লেইড সিমরু ৪, এসডিএলপি ২ এবং দ্য গ্রিন পার্টি ও অ্যালায়েন্স পার্টি একটি করে আসন পেয়েছে। কনজারভেটিভরা গতবারের চেয়ে ৪৭টি আসন বেশি ও লেবার পার্টি ৫৯ আসন কম পেয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৩২৬টি আসনে জয়। ১৯৩৫ সালের পর সবচেয়ে কম আসনে জয় পেল লেবার পার্টি। করবিনের দলের বিপর্যয় এতটাই যে, একাধিকবার জেতা প্রার্থীরাও এবার পরাস্ত হয়েছেন। বরিস তার অক্সব্রিজ আসনে ২৫ হাজার ৩৫১ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার বিরোধী লেবার পার্টির প্রার্থী আলী মিলানি পেয়েছেন ১৮ হাজার ভোট।
সরকার গঠনের প্রস্তুতি
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় বরিস জনসন। ১৯৮৭ সালে মার্গারেট থ্যাচার যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে শেষ এত বড়ো জয় পেয়েছিলেন। গতকালই প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বাকিংহাম প্যালেসে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় সময় গতকাল বিকালে বরিসের ভাষণ দেওয়ার কথা। ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের সূত্রে জানা গেছে, আগামী সোমবার বরিসের মন্ত্রিসভায় সামান্য পরিবর্তন হতে পারে। আর এমপিদের সামনে ব্রেক্সিট বিল পেশ করা হবে আগামী শুক্রবার।
অখণ্ড ব্রিটেনের ওপর চাপ
বিবিসির রাজনৈতিক সংবাদদাতা ক্রিস মেসনের মতে, এই ফলাফল একটা অখণ্ড দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের টিকে থাকার ওপর চাপ তৈরি করবে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে স্কটল্যাণ্ডের জন্য নির্ধারিত যে ৫৯টি আসন রয়েছে তার ৮১ শতাংশ অর্থাত্ ৪৮টি আসনে প্রধান দল ও স্বাধীনতাপন্থি এসএনপি জিতেছে। আগের চেয়ে দলটি ১৩টি আসন বেশি পেয়েছে। স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টারজিওন বলেছেন, ‘স্কটল্যান্ডকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ব্রিটেনে রাখা যাবে না। ইচ্ছা না থাকলেও প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে স্বাধীনতার জন্য দ্বিতীয় গণভোটের ক্ষমতা আমাকে দিতে হবে।’ এরপর আছে উত্তর আয়ারল্যান্ড। এই প্রথমবারের মতো ব্রিটেনের সঙ্গে থাকতে চায় এমন দলগুলো থেকে জাতীয়তাবাদী দলগুলো বেশি আসন পেয়েছে। এটা এখন সবাই জানে যে, ইউরোপ ছাড়তে প্রধানমন্ত্রী বরিস যে ব্রেক্সিট চুক্তি করেছেন, তাতে ইইউর সঙ্গে উত্তর আয়ারল্যান্ডের যে সম্পর্কের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে তা যুক্তরাজ্যের অন্যান্য অংশের চেয়ে আলাদা। বরিস প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণের সময় নিজেকে বর্ণনা করেছেন ‘অখণ্ডতার পক্ষের মন্ত্রী’ হিসেবে। সেটা তিনি করেছেন সংগত কারণেই অর্থাত্ ব্রিটেন ভেঙে যেতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই। কাজেই ব্রিটেনকে একসঙ্গে রাখা অর্থাত্ ইংল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের অখণ্ডতা টিকিয়ে রাখার চাপটা খুবই বাস্তব।
৩১ জানুয়ারির মধ্যেই ইইউ ত্যাগ
বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ী হওয়ার পর লন্ডনে এক বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বরিস বলেছেন, এই জয়ের মাধ্যমে তিনি ব্রিটেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বের করে আনবেন। বরিস বলেছেন, ভোটারদের আস্থার প্রতিদান দিতে তিনি রাত-দিন কাজ করবেন। এখানে কোনো ‘যদি, কিন্তু’ নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। যারা প্রথমবারের মতো কনজারভেটিভকে ভোট দিয়েছে তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে জনসন বলেন, তারা পরিবর্তন চায়। তাদের হতাশ করা উচিত নয়, হতাশ করব না। উল্লেখ্য, আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিচ্ছেদ ঘটাতে ব্রিটেনকে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল ইইউ।
ইইউর প্রতিক্রিয়া
বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ২৭টি দেশের নেতারা এক সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। সেখানে তারা ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিসের দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে স্বাগত জানিয়েছেন। নেতৃবৃন্দ আশা করছেন, সফট ব্রেক্সিট হবে। তারা মূলত ব্রেক্সিটের পরে দুই পক্ষের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়েই বেশি চিন্তিত। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট চার্লস মাইকেল আশা প্রকাশ করে বলেছেন, ইইউ ত্যাগের জন্য সপ্তাহের মধ্যেই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিল পাশ হবে। তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব এটা করা হবে এবং ইইউ সেজন্য প্রস্তুত। তিনি বলেন, ইইউ ব্রিটেনের সঙ্গে কিভাবে ভবিষ্যতের সম্পর্ক গড়ে তুলবে সেই বিষয়ে সমঝোতাই এখন আলোচনার মূল ইস্যু। ইইউ নেতৃবৃন্দ মনে করছেন, ব্রিটিশরা ভোটের মাধ্যমে বরিসকে ইইউর সঙ্গে সমঝোতার প্রচুর ক্ষমতা দিয়েছেন। ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লায়েনও বলেন, ব্রিটেনের সঙ্গে সমঝোতার জন্য প্রস্তুত ইইউ।
সবচেয়ে বেশি নারী প্রার্থীর জয়
এবার সবচেয়ে বেশি নারী (২২০) প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। বিরোধী লেবার পার্টি থেকে ১০৪ নারী প্রার্থী জয় পেয়েছেন। এদের মধ্যে চার জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী প্রার্থী আছেন। কনজারভেটিভ থেকে ৮৬ জন নারী প্রার্থী জয়লাভ করেন। ২০১৭ সালের নির্বাচনে দলটি থেকে ৬৭ নারী এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অর্থাত্ এবার এক তৃতীয়াংশের বেশি নারী পার্লামেন্টে গেলেন। ৪০ বছর আগে অর্থাত্ ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে ব্রিটেনে একজন নারী প্রার্থীও জয় পাননি।
বরিসকে অভিনন্দন ট্রাম্পের
নির্বাচনে জয়ের জন্য বরিস জনসনকে অভিনন্দন জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইটার বার্তায় লিখেছেন, ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনভাবে নতুন একটি বড়ো ধরনের বাণিজ্য করতে পারবে। ট্রাম্প উল্লেখ করেন, বাণিজ্য চুক্তি অনেক বড়ো এবং আকর্ষণীয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত পাঁচ বছরে যুক্তরাজ্যে তৃতীয়বারের মতো পার্লামেন্ট নির্বাচন বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবারেই নির্বাচনের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠেছে ব্রেক্সিট। এবার জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও প্রচারের মূল ইস্যু ছিল ব্রেক্সিটিই। সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট বিল পাশ করাতে বারবার ব্যর্থ হওয়ার কারণেই প্রধানমন্ত্রী বরিস আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন।