শাহাদাত ফাহিম
৫০০ টাকার ভাংতি-বিড়ম্বনায় না পড়ার ইনসান এই যুগে পাওয়া নাও যেতে পারে। কপালগুণে সমাজ রক্ষার সুখস্মৃতি রয়েছে আমারও। একবার নয়, দুইবার নয়। লেটেস্ট স্মৃতি গুলিস্তানের। পণ্য ক্রয়ের পর ৫০০ টাকার নোট দোকানিকে দিলে যে বিড়ম্বনায় দোকানি পড়েছিল, তার চেয়ে ঢের পড়েছিলাম আমি। কারণ, না টাকা রেখে আসতে পারছি, না পণ্য নিয়ে স্থান ত্যাগ করতে পারছি। আর এই বিড়ম্বনা যখন কপালে থাকে, তখন আশপাশের সব দোকানের ক্যাশবক্সে একসঙ্গে ভাংতি টাকার দুর্ভিক্ষ লেগে যায়। ফলে দোকানি এই দোকান থেকে ওই দোকানে ছুটে বেড়ায়। অন্যদিকে আমিও এখান থেকে ওখানে ছোটাছুটি করি। শেষ পর্যন্ত ওই এলাকার এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয়ের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে ত্বরিত দাম শোধ করে এলাকা ত্যাগ করতে সমর্থ হই। সেখান থেকে রিকশাযোগে এলাম নিউ মার্কেট। বিধিবাম। রিকশাওয়ালার কাছেও ৫০০ টাকার ভাংতি নেই। ফলে সেই ৫০০ টাকার ভাংতি-বিড়ম্বনা চলল আরো পৌনে এক ঘণ্টা। পরে অবশ্য এক কেজি লবণ কিনে ৫০০ টাকার ভাংতি জোটাতে পেরেছিলাম।
কপালে অবশ্য সব সময় সবকিছু জোটে না। কথায় কথায় বাজি ধরে ফেলার অভ্যাস অনেকেরই আছে। এ রকম বাজি ধরার ক্ষেত্রে সকলেরই পছন্দ ৫০০ টাকা। তার নমুনা এই, ‘যদি ঘটনা এই হয়, তাহলে তুই দিবি আমারে পাঁচশত টেকা। আর যদি না হয়, তাহলে আমি দিমু তোরে পাঁচশত টেকা।’ ঠিক এমনই আরকি। তবে এ রকম বাজি সব সময় কার্যক্ষেত্রে বাস্তবায়ন হয় না। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে যে বাস্তবায়ন হয় না, তা কিন্তু নয়। এ ক্ষেত্রে পাঁচশত টাকা জেতার জন্য কপালের দরকার।
এ ছাড়াও ‘৫০০’-এর বহুল ব্যবহার দেখা যায় ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে। সেটি অনেকটা এ রকম, ‘আজকে না হয় তোকে ক্ষমা করে দিলাম, কিন্তু কাল যদি হোমওয়ার্ক না করে আসিস, তাহলে পাঁচশতবার তোকে কান ধরে উঠবস করাব।’ যদিও শেষ পর্যন্ত কখনোই শিক্ষক তার ছাত্রকে পাঁচশতবার গুনে গুনে কান ধরে উঠবস করান না। বড়োজোর গোটা বিশবারে খেল খতম।
খেলার মাঠেও ‘৫০০’-এর ব্যবহার রয়েছে। পাড়া-মহল্লায় এলাকাভিত্তিক টুর্নামেন্ট হয়। এসব টুর্নামেন্টের অন্যায়-অপরাধ অথবা অনিয়মের জন্য জরিমানা ধার্য করা হয় ৫০০ টাকা। পুরোনো জামাইদের অভিযোগ, তারা এখনো শ্বশুর বাড়ির গেট পাস হিসেবে ৫০০ টাকার সওদা ছাড়া ঢুকতে পারছে না। এর জন্য অবশ্য তারা ফল-ফলাদির মূল্য বৃদ্ধিকেই দায়ী করছেন। অবশ্য তাদের এই অভিযোগের মধ্যে এটিও রয়েছে, তারা বিভিন্ন উপলক্ষে শ্বশুরবাড়ির তরফ থেকে পাওয়া বখশিশ হিসেবে ৫০০ টাকার কোটাতেই রয়ে গেছেন।
অবস্থাভেদে ঘুষের বিভিন্ন ক্যাটাগরি থাকলেও পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের রয়েছ অন্যরকম এক স্বস্তি। তার কারণ হলো পুলিশ ভেরিফিকেশনে স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানায় মাত্র পাঁচশত টাকা করে ঘুষ প্রদান করে কার্য হাসিল করতে পারছে এখনো। পেঁয়াজ ও লবণের দাম নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড অনুযায়ী এই উভয় ঠিকানায় ঘুষের পরিমাণ হওয়া উচিত ছিল যথাক্রমে পাঁচ লাখ টাকা করে।
বাড়িয়ে বলার ক্ষেত্রে ‘৫০০’-এর ব্যবহার বেশ পুরোনো। বাবা তার মেয়ের উদ্দেশে এভাবে বলে থাকেন, ‘তোকে ৫০০ বার বলেছি ওই ছেলের দিকে তাকাবি না। তবুও তুই আমার কথা শুনিস না।’ বাবা মেয়েকে ওই ছেলের দিকে তাকাতে মূলত পাঁচ-সাতবার নিষেধ করলেও অবাধ্য মেয়েটি দৈনিক ৫০০-এর কম তাকায় না ছেলেটির দিকে।
‘এখানে পেশাব করিবেন না। করিলে ৫০০ টাকা জরিমানা’র কথা কে না জানে। ‘দুর্ঘটনা রোধে শিকল টানুন। অযথা টানিলে ৫০০ টাকা জরিমানা’র কথা অবশ্য ট্রেনে ভ্রমণকারী ছাড়া অন্যরা নাও জানতে পারে।
একটা সময় কাজের অভাবে খই ভাজতে থাকা পত্রিকার কন্ট্রিবিউটরদের বেশ সুদিন ছিল! বিলের পরিমাণ ছিল ডাবল বিয়ে করার জন্য পর্যাপ্ত। আর এখন বিয়ে তো দূরের কথা, নিম্নমানের একটা প্রেম করার মতো খরচটাও পাওয়া যায় না বলে খই কারিগরদের অভিযোগ। এক পৃষ্ঠার জন্য ৫০০ টাকা বিল পাওয়ার নজির বহুত। বিপরীতে সাইফুল ইসলাম জুয়েল পাওনাদার কর্তৃক পরিচালিত সুপার অ্যাকশন ‘ঠাট্টা’র যে আচরণ, তা কারো জন্য তাজিমের হলেও কারো কারো জন্য বাস্তবিকই ঠাট্টা-মশকরার। এই মশকরা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিশ্বটেরর গোষ্ঠীকে এগিয়ে আসতে হবে এবং হাতে হাত ও পায়ে পা রেখে একযোগে কাজ করে যেতে হবে।
৫০০তম সংখ্যায় ঠাট্টাকে ৫০০ গোলাপের শুভেচ্ছা।