শারফিন শাহ
হাসিঠাট্টা আর প্রতিভা সমার্থক। যিনি যতখানি প্রতিভাবান, তিনি ততখানি হাস্যরসিক—সুলুক সন্ধান করলে এমন সত্য গটগট করে বেরিয়ে আসবে। উদাহরণ টানতে গেলে বিদেশ যেতে হয় না, বঙ্গদেশেই ভুরি ভুরি মেলে। বিদ্যাসাগরের কথাই ধরা যাক, লেখাজোকায়, ভাবে-স্বভাবে তার মতো রসিক বিরল। তার পর আসে বঙ্কিমের নাম; হাস্যরসকে যিনি দার্শনিক মাত্রা দিয়েছেন। নিজের রচনায় শুধু নয়, বন্ধুবর দীনবন্ধু মিত্রের সঙ্গে ব্যক্তিগত রসালাপেও বঙ্কিম অতুল্য ছিলেন। তারপর আসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কথা। আর কিছু দরকার নেই, শুধু মৈত্রেয়ী দেবীর ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ পড়লেই টের পাওয়া যায় রসসৃষ্টিতেও তিনি কেমন গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথের পর আরেকজন গুরুর কথা বলা যায়, যিনি সুকঠিন পরিস্থিতিতেও ঠাট্টা-মশকরা ছড়াতে পারদর্শী ছিলেন; তিনি আর কেউ নন, ভাষাগুরু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। আর যে নজরুলকে বাঙালি বিদ্রোহী কবি বলে একঘরে করে রেখেছে, তার রসিকতার খবর কেউ নিয়েছে কী? নজরুল বলেছিলেন, তিনি জাহান্নামের আগুনে বসে পুষ্পের হাসি হাসবেন—কী দুঃসাহস রে বাবা! জাহান্নামের আগুনে বসবেন না শুধু, হাসবেনও; সেই হাসি আবার পুষ্পের! এমন মানুষ কতটা রসিক তার প্রমাণ পেতে বেশিদূর যেতে হবে না, হিরন্ময় ভট্টাচার্যের ‘রসিক নজরুল’ বইখানা পড়লেই হবে।
এবার বলি, সত্যপীর সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা রসস্রষ্টা হিসেবে যার নাম স্বর্ণাক্ষরে অক্ষয় হয়ে থাকবে। এমন প্রতিভা ধরায় যুগে যুগে আসে না। রামগরুড়ের ছানা বাঙালির ঘরে ঘরে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন তার নানা স্বাদের রসগোল্লা। সৃষ্টি করেছেন অফুরান রসভান্ডার। এককথায় তিনি বাঙালিকে হাসতে শিখিয়েছেন এবং হাসিঠাট্টাকে শিল্পোত্তীর্ণ করেছেন।
লেখকদের লেখক হিসেবে খ্যাত আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে সিরিয়াস লেখকরূপেই আমরা মাথায় তুলে রাখি। তিনিও কি রসিকতায় কম যান? তিনি তার বন্ধু কবি আসাদ চৌধুরীকে যেসব চিঠি লিখেছেন সরস ভাষায় তাতেই তো তার রসজ্ঞান ফুটে ওঠে।
তবে বাংলা সাহিত্যে রসসৃষ্টিতে যিনি অভিনব দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি হুমায়ূন আহমেদ। তার রচনা পড়া মানেই হাস্যরসে ডুব দেওয়া। বাংলা সাহিত্যে সর্বকালের সেরা রসিক হিসেবে তার নাম উপরের দিকেই থাকবে আশা করা যায়।
হুমায়ূনের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তার ছোটভাই আহসান হাবীবকেও কি ভুলে থাকার উপায় আছে? তিনি তো দেশের মানুষকে হাসানোর দায়িত্ব স্বেচ্ছায় তুলে নিয়েছেন নিজের কাঁধে, ‘উন্মাদ’ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে। তার বিপুলসংখ্যক জোকসের বই বিষাদে হরিষ এনে দিতে একরকম ওষুধের মতোই কাজ করে যাচ্ছে।
উপরের কথামালায় এটাই প্রমাণিত যে, প্রকৃত প্রতিভা অবশ্যই হাসিঠাট্টার উদ্রেক করবে। কিন্তু সেই প্রতিভা অধুনা কোথায়? রম্যলেখক, রম্যরচনা, রম্য ম্যাগাজিন যেন সোনার হাঁড়িতে পরিণত হচ্ছে। এমন রসের আকালে ইত্তেফাকের ঠাট্টার পাঁচটি সেঞ্চুরি হাঁকানো কম অর্জন নয়। ঠাট্টা এভাবেই আরো একের পর এক সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে যাক, ৫০০তম জন্মদিনে এটাই আমার চাওয়া।