ঠাট্টায় ঠাট্টায় ম্যালা বছর

 

ইকবাল খন্দকার

 

সালটা মনে নেই। ইত্তেফাক অফিস তখন নিজস্ব মোড়ে। নিজস্ব মোড় বলতে ইত্তেফাক মোড় আরকি। আর আমি তখন হলে। হলে বলতে পরীক্ষার হলে না কিন্তু। আবার সিনেমা হলেও না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে। এককথায় তখন আমি ছাত্র। ক্লাস শেষ করেই চলে যেতাম ইত্তেফাক অফিসে। রোজ রোজ না। সপ্তাহে একদিন বা দুদিন। লেখা নিয়ে যেতাম। তখনো কম্পিউটার বা ইন্টারনেট আবিষ্কার হয়নি, ব্যাপারটা এমন না। আবিষ্কার ঠিকই হয়েছে, শুধু আমার ছিল না, এই যা। যে কারণে আমি বাসে চড়ে লেখা নিয়ে যেতাম। ও ভালো কথা, আমার কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ছিল না, কিন্তু নিজস্ব বাস ছিল, আর তাতে চড়ে অফিসে যেতাম—বিষয়টা একদমই এমন ছিল না। বাসে চড়তাম ভাড়ার বিনিময়ে। চেষ্টা করতাম হাফ ভাড়া দেওয়ার জন্য। তবে যেদিন জাঁদরেল কন্ডাকটরের মুখোমুখি হতাম, সেদিন স্বীকারই করতাম না আমি ছাত্র। ফুল ভাড়া তো দিতামই, বাড়তি দু-চার টাকাও দিয়ে ফেলতাম। ভীতু হলে যা হয়! তো আমি ভীতু হলেও থিতু হতে পেরেছিলাম ইত্তেফাকে। নানান বিষয়ে তখন ‘ন ডরাই’ মনোভাব নিয়ে লিখতাম ইত্তেফাকে। জেল হবে না ফাঁসি হবে, এইসব চিন্তা মাথায়ই নিতাম না রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে লেখার সময়। তবে লেখাগুলো কিন্তু ইত্তেফাকের ‘ঠাট্টা’ পাতায় ছাপা হতো না। ছাপা হতো ‘রসগোল্লা’য়। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, ঠাট্টা নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ‘রসগোল্লা’র কথা কেন টেনে আনলাম। আমি ব্যক্তিগতভাবে রসগোল্লা পছন্দ করি, এই জন্য কি না। অথবা ডায়াবেটিস রোগীদের লোভ দেখানোর জন্য কি না। আসলে এই ধরনের কোনো ব্যাপার না। ব্যাপার হচ্ছে, ‘ঠাট্টা’র প্রকাশটা শুরু হয়েছিল মূলত ‘রসগোল্লা’কে কেন্দ্র করে। আরো পরিষ্কার করে যদি বলি, 'ঠাট্টা' হচ্ছে ইত্তেফাকের পুরনো বিভাগ ‘রসগোল্লা’র সম্প্রসারিত রূপ। ছাত্রজীবনে ভাবসম্প্রসারণ করেছেন না? ঠিক এভাবেই ‘রসগোল্লা’কে সম্প্রসারণ করে বানানো হয়েছে ‘ঠাট্টা’। তখন পাতাটি দেখভাল করতেন মোর্শেদ নাসের টিটো। এরপর যখন ‘ঠাট্টা’ সশরীরে বাজারে চলে এলো,

পাতাটির দায়িত্ব নিলেন সুমন্ত আসলাম। এর কিছুদিন পর দায়িত্ব পেলেন সাইফুল ইসলাম জুয়েল। তবে কে দায়িত্ব নিলেন আর কে ছাড়লেন, ওইসব নিয়ে আমি মাথা ঘামাতাম না। কারণ, এমনিতেই আমার মাইগ্রেনের সমস্যা। মাথা ঘামাতে গেলে সমস্যাটা বাড়তে পারে, এমন একটা ভয় কাজ করত। মাথা ঘামলে ঠান্ডা লাগবে, এমন একটা ভয় তো ছিলই। আমার কাজ ছিল লিখে যাওয়া। এবার আমার কম্পিউটারও হলো, ইন্টারনেটও হলো। আবার ইত্তেফাক অফিসও চলে এলো বাসার কাছাকাছি। কাওরানবাজার। অতএব লেখার পাশাপাশি মাঝেমধ্যে এসে আড্ডা দেব, এমন একটা জায়গার নিশ্চয়তাও পেয়ে গেলাম। এরপর সময় বাড়ল, মাথায় পাকা চুলের পরিমাণ বাড়ল, আর বাড়াল ‘ঠাট্টা’য় প্রকাশিত আমার লেখার সংখ্যা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, প্রতি সপ্তাহে ঠাট্টা বের হতো আর আমার মনে পড়ে যেত বিয়ের আসরের কথা। কেন জানেন? কারণ, বিয়ের আসরে বসে আমি কবুল বলেছিলাম তিনবার। আর প্রতিসপ্তাহে ঠাট্টায় আমার লেখাও ছাপত তিনটি করে। সেই ঠাট্টা এখন পৌঁছে গেছে ৫০০তম সংখ্যায়। চাট্টিখানি কথা? চাট্টিখানি না, বরং পাঁচটিখানি কথা। যেহেতু ৫০০তম সংখ্যার ব্যাপার স্যাপার। এর মধ্যে কত ফান ম্যাগাজিন এলো, গেল। কিন্তু ঠাট্টা রয়ে গেল আগের মতোই। আর পাঁচশতম সংখ্যা বের করতে পারার কারণে ঠাট্টা চলে গেল অন্য এক উচ্চতায়। এই যে ঠাট্টা এমন উচ্চতায় চলে গেল, কিছু কিছু অবিশ্বাসী এটা বিশ্বাস নাও করতে পারেন। হিংসা, সবই হিংসা। তো যাদের বিশ্বাস হচ্ছে না, তারা চলে আসুন কাওরানবাজারে। দু কলম লিখে দিয়ে বলতে পারি, এত উচ্চতায় বাংলাদেশের আর কোনো ফান ম্যাগাজিন অবস্থান করছে না। ভবনের বারোতলা। কম কথা না কিন্তু। ঠাট্টার জন্য বিস্তর শুভ কামনা।

 

 [ লেখক : কথাসাহিত্যিক ও বিভাগীয় সম্পাদক, প্যাঁচআল

(অধুনা বিলুপ্ত), দৈনিক সমকাল ]