দেশকে ভালোবাসতে হবে নিঃস্বার্থভাবে

রোকসানা সুইটি

আমি আমার দেশকে ভালোবাসি, এ কথাটা যখন বলি তখন কথাটার মধ্যে একটা অন্য রকম ভালোলাগা কাজ করে। মনটা ভরে যায় এক অজানা আনন্দে। দেশের প্রতি মমত্ববোধ কাজ করে খুব বেশি। স্কুলজীবনে যখন স্বদেশপ্রেম রচনাটি পড়তাম, তখনকার একটি কথা মনে গেঁথে আছে। স্বদেশপ্রেম ঈমানের অংশ। যখন পড়তাম দেশের জন্য অনেক বীর আত্মাহুতি দিয়েছেন,তখন ভাবতাম সময় হলে আমিও দেব। যদি প্রয়োজন হয় আমিও জীবন বাজি ধরে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ব। আমাদের সময়ের ভাবনাগুলোও আমাদের মতো ছোটো ছিল। নিজের দেশকে ভালোবাসে না এমন লোক পৃথিবীতে বিরল।

দেশকে ভালোবাসাই সবার মনে জাগ্রত হওয়া উচিত, তাই তো! এই ভেবে কিছুদিন আগে যখন ছাত্ররা আন্দোলন করেছিল, ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা নিরাপদ সড়ক চাই বলে জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল, তখন আমার মধ্যে যেন সেই স্বদেশপ্রেম জেগে উঠল। প্রথম কয়েকদিনের আন্দোলন দেখে আমি দিশেহারা হয়ে যাই। শুধুই ভালো লাগা আর ভালোবাসা কাজ করছিল মনে। তারা যখন স্কুল ড্রেসে রাস্তায় নেমে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করছিল, তখন আমার বয়সটা যেন তাদের বয়সের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিল, তাদের বয়সের কোটায় নেমে তাদের সঙ্গে শামিল হয়ে গেল। বিবেক খু্ব করে বলছিল—যাও নারী, যাও! সময় এসেছে নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার।

দেশের উত্তাল অবস্থা দেখে কেমন যেন অন্য রকম আমাকে আবিষ্কার করলাম। ফেসবুকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাদের আন্দোলনের ভিডিওগুলো দেখে কেমন যেন অবাক হতে লাগলাম। এত ছোটো তারা, অথচ কত বড়ো বড়ো ভাবনা তাদের কচি মনে, কেমন দেশাত্মবোধ তাদের হূদয়ে দানা বেঁধে উঠেছে। তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় অতি স্বল্প সময়ে কেমন গুছিয়ে ফেলছিল যেন দেশটাকে। ছেলেমেয়ে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। একতাবদ্ধ হয়ে তারা কাজ করেছে একে অন্যের পরিপূরক হয়ে। মেয়েরা যে এখন আর আগের মতো পিছিয়ে নেই, তা আমরা তখন বুঝতে পেরেছি। ছল ছল চোখে তাকিয়ে দেখেছি, আর গর্বিত হয়েছি তাদের দেশাত্মবোধ দেখে। বর্তমানে যেমন আমাদের দেশপ্রধান একজন নারী। ঠিক ছোট্ট শিশুকন্যারা যেন তারই উত্তরসূরি হয়ে ভবিষ্যত্ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করছে।  তাদের ছোটো ছোটো হাতগুলো এক হয়ে অনেক কঠিন কাজকে তারা সহজ করে ফেলেছিল।

এবার আসল কথায় আসি। ঐদিনের তাদের ভিডিওগুলো দেখি আর আমি সেগুলোকে শেয়ার দিই, লাইক কমেন্ট করি কোনো কিছুর জন্য না, শুধুই ভালো লাগা আর তাদের প্রতি ভালোবাসা থেকে। শেয়ার করেই যাচ্ছি, করেই যাচ্ছি। হঠাত্ আমার ইনবক্সে কয়েকজন কাছের বন্ধু বলল, এগুলো যেন শেয়ার না করি। আমি তো অবাক! জানতে চাইলাম কেন? সে উত্তর তারা দেয়নি। তখনই এক ফেসবুক ফ্রেন্ড এবং আমার খুব পরিচিত একজন বলল সরাসরিই, আমি নাকি সরকারবিরোধী আন্দোলন করছি!

আমি তো অবাক! কেমনে কী! কখন! কিভাবে! কবে! বলল, এসব শেয়ার থেকে বোঝা যায়। প্রথমে অনেক তর্ক করেও তাকে বোঝাতে পারলাম না যে আমি অতি সাধারণ। এসবে নেই। সে বুঝেই না। আমি ব্যর্থ হয়ে তাড়াতাড়ি আমার প্রোফাইলে ঢুকে এক এক করে এক নিঃশ্বাসে সব ডিলিট করলাম। তারপর ঐ মহান ব্যক্তিকেও ব্লক করলাম নিজের নিরাপত্তার জন্য। তারপর কিছুক্ষণ পরপর দেখি আমার আইডি ঠিক আছে কি না। আবার ভাবতে থাকি প্রযুক্তি তো অনেক উন্নত, না জানি কী থেকে কী হয়। এমনি নানা দুশ্চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। ভাবতে ভাবতে দেখি আমি আছি, সব ঠিকই আছে। ভিডিওগুলো যখন ডিলিট করছিলাম, তার একটা ভিডিও আমার খুব রাখতে মন চেয়েছিল, সেখানে গানটা ছিল:‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম / মোরা ঝরনার মতো চঞ্চল / মোরা বিধাতার মতো নির্ভয়’ আসলেই তো আমরা তাই! তবে বড়ো হতে হবে যে আগে। দেশটা তো অনেক বড়ো, সে তুলনায় আমাদের হাতগুলো যে ছোটো। বড়ো হয়েও যেন আমাদের মানসিকতা এমনই সত্ থাকে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে বজ্র কঠিন হাতে। এ দেশটাকে যে আমাদেরই গড়তে হবে নতুনভাবে।

n লেখক :সাবেক শিক্ষার্থী, নোয়াখালী

সরকারি মহিলা কলেজ