বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ, ইতিহাস বিকৃতকারীদের রুখে দেওয়া, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নেওয়া, গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়, সব যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর, দেশবিরোধী সব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে উন্নত-সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় গতকাল শনিবার শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করেছে দেশবাসী। শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের কণ্ঠে ছিল ক্ষোভও। বুদ্ধিজীবী দিবসের ঠিক একদিন আগে যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লাকে ‘শহিদ’ বলায় তারা তীব্র নিন্দা জানিয়েছে দৈনিক সংগ্রামের প্রতি। সেইসঙ্গে সংগ্রামের প্রকাশনা বন্ধের দাবিও ছিল তাদের কণ্ঠে। এদিকে একাত্তরে প্রাণ হারানো সেই সূর্য সন্তানদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদসন্তান ও মুক্তিযোদ্ধারা। পাশাপাশি এখনও ঘাপটি মেরে থাকা একাত্তরের ঘাতক ও তাদের দোসরদের চেহারা উন্মোচনের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা :সকালে মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তারা সেখানে কিছুক্ষণ নিরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে। পরে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলীয় প্রধান হিসেবে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে স্মৃতিসৌধে আরেক বার পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের খোঁজ-খবর নেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী ধানমন্ডিতে যান এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। প্রধানমন্ত্রী সেখানেও কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান ।
এদিকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ হলে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সংগঠন ও সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের বেদি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এ সময় বিভিন্ন সংগঠন সারিবদ্ধভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এসময় একে একে শ্রদ্ধা জানায় কেন্দ্রীয় ১৪ দল, শহীদ পরিবারের সন্তান ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় পার্টি, গণফোরাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ (ইনু), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন দল, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান।
বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পুষ্পস্তবক অর্পণকালে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকসহ মন্ত্রী পরিষদ সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যগণ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এবং উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনকালে অন্যান্যের মধ্যে দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু, ড. আব্দুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বুদ্ধিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা দাবি : গতকাল দিনভর আবাল-বৃদ্ধ-বণিতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লাখো মানুষ জড়ো হয়েছিল মিরপুর আর রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধে। তাদের হাতে ছিল ফুল, কণ্ঠে ছিল সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকরের দাবি। রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা জানাতে এসে বুদ্ধিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা না হওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন দুই শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তান ডা. নুজহাত চৌধুরী ও শমী কায়সার। শহীদ চিকিত্সক আব্দুল আলীম চৌধুরীর মেয়ে নুজহাত চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের মায়েরা চলে যাচ্ছেন, সাক্ষীরা চলে যাচ্ছেন। তাই বুদ্ধিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা দরকার।’ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, দৈনিক সংগ্রাম আব্দুল কাদের মোল্লাকে ‘শহিদ’ বলে ঘৃণ্য কাজ করেছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। একইসঙ্গে দৈনিক সংগ্রামে বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দাবি :মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের দাবি এসেছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে। গতকাল সকালে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, মুক্তিযুদ্ধ-৭১ এর মহাসচিব হারুন হাবীব এই দাবি জানিয়ে বলেন, ‘গণহত্যার জাতীয় স্বীকৃতি এসেছে। এখন জাতিসংঘের স্বীকৃতি আদায়ের দাবি জানাচ্ছি।’
জেপির শ্রদ্ধা : শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষ্যে সকাল সাড়ে ৬টায় জাতীয় পার্টি-জেপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দলের সকল কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। সকাল ৭টায় জেপির পক্ষ থেকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ এবং সকাল ৮টায় রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। এসময় জেপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলামের নেতৃত্বে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মফিজুল হক বেবু, এজাজ আহমেদ মুক্তা, নির্বাহী সম্পাদক সাদেক সিদ্দিকী, ভাইস চেয়ারম্যান আজিজ বাঙাল, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক এম.সালাহ উদ্দিন আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল খায়ের সিদ্দিকী আবু ও জাতীয় যুব সংহতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এনামুল ইসলাম রুবেল। এসময় শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘জাতিকে মেধাশূন্য করার জন্য বিজয়ের পূর্বলগ্নে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল। সেইসব হত্যাকারীদের বিচারের ব্যবস্থা করে জাতিকে কিছুটা হলেও কলঙ্কমুক্ত করেছে সরকার।’
এদিকে সভাপতি আবুল খায়ের ও সাধারণ সম্পাদক দীপু সারোয়ারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন (ক্র্যাব) নেতৃবৃন্দ মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে জাতির সূর্য সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।