মুক্তিযুদ্ধে জনপ্রতিরোধ :ঘোলখার পঞ্চায়েত কমিটি

মামুন সিদ্দিকী

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বহুমাত্রিকতায় পরিপূর্ণ। এখনো অজানা রয়ে গেছে কত না কথা, কথকতা। জনগণের প্রতিরোধ-চেতনা থেকেই যে মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়েছিল এই সত্য বারবার করে উঠে আসছে। প্রতিরোধের লক্ষ্যে সেদিন গ্রামে গ্রামে গঠিত হয়েছিল পঞ্চায়েত কমিটি। সাধারণ জনগণ বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে গড়েছিল দুর্বার প্রতিরোধ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলা। বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল দরুইনে যুদ্ধরত অবস্থায় শহিদ হন, এখানেই তাঁর সমাধি-সৌধ। এর দক্ষিণ-পশ্চিমে গঙ্গাসাগর গণকবর। এই সড়ক ধরে আরো পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেলে কুমিল্ল­া-সিলেট মহাসড়কে ধরখার বাসস্ট্যান্ড। বাসস্ট্যান্ড থেকে পশ্চিমে বরাবর তিনটি গ্রাম ধরখার, রাণীখার, ঘোলখার। উত্তর দিকে বিস্তীর্ণ বিল। বাসস্ট্যান্ডের পাশেই উজানিসার ব্রিজ।

মুক্তিযুদ্ধকালে তন্তর, ছতুরা ও ধরখার (উজানিসার ব্রিজের নিচ দিয়ে) দিয়ে অনেক মানুষ ভারতে পাড়ি জমাতো। ছতুরা গ্রামে সিএন্ডবি রোডে তন্তর বাসস্ট্যান্ডে ছিল রাজাকারদের চেকপোস্ট। উজানিসারের ব্রিজের দক্ষিণ পাশে রয়েছে অনেক গণকবর। ওখানে নানা সময় পাকিস্তানি বাহিনী বাস থামিয়ে অনেক বাঙালিকে হত্যা করে। এজন্য মুক্তিযোদ্ধারা এই ব্রিজটি ভেঙে ফেলে, যেন কুমিল্ল­া-সিলেট রোডে পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিঘ্নে চলাফেরা না করতে পারে। এই ব্রিজের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে তিতাস নদী। মহাসড়ক থেকে দেখা যায় অদূরে একটি গ্রাম—ঘোলখার। সিএন্ডবি থেকে ডা. ইয়াকুবুর রহমান ভূঞার বাড়িটি তখন দেখা যেত।

অনেক গ্রামের মতো মুক্তিযুদ্ধের সময় এ গ্রামেও গড়ে উঠেছিল প্রবল প্রতিরোধ। জনগণ আত্মরক্ষার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছিল। এলাকাটি সীমান্তবর্তী। কাছেই আখাউড়া রেলজংশন ও স্থলবন্দর। তাই স্থল ও জলপথে আগরতলায় পাড়ি দিয়েছে হাজারো শরণার্থী। ঢাকার অনেক বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ এই গ্রাম হয়ে কিংবা এই গ্রামের পাশ দিয়ে বিলের ওপর দিয়ে সীমান্তে পাড়ি দিয়েছেন। নানাজনের স্মৃতিচারণায় এই এলাকার লোকজনের সহযোগিতার কথা জানা যায়। তাদেরকে আশ্রয় ও সহযোগিতা দিয়ে গ্রামবাসী সেদিন মানবতার জয়গান করেছিলেন।

একাত্তরের জুলাই মাসে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ গ্রামে গ্রামে পঞ্চায়েত কমিটি গঠনের আহ্বান জানান। এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিরোধ ও মুক্তিবাহিনীকে সহযোগিতার আহ্বান জানান। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে অবরুদ্ধ দেশের নানা গ্রামে গড়ে ওঠে পঞ্চায়েত কমিটি।

ঘোলখার গ্রামে ‘ঘোলখার পঞ্চায়েত কমিটি’ গঠিত হয় ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১-এ। যদিও এর আগেই শুরু হয়েছিল এর কার্যক্রম। গ্রামের কতিপয় গণ্যমান্য ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল এই কমিটি, যার কর্ণধার ছিলেন ডা. ইয়াকুবুর রহমান ভূঞা (১৯৩৩-২০১৯)। পঞ্চায়েত কমিটির সংরক্ষিত দলিলে দেখা যায়, তাদের ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘জয় স্বাধীন বাংলা, জয় মুজিব। আমাদের গ্রামবাসী পঞ্চায়েত ভাইয়েরা আপনাদের প্রতি সর্ব্বশক্তিমানের নামে এই বলিয়া শপথ রহিল যে আপনারা নিম্নের শর্তানুযায়ী বাংলাদেশ প্রশ্নটি গ্রামবাসীর প্রতি তুলিয়া ধরিবেন— ১. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আত্মবিশ্বাস জাগাইয়া তোলা ও তাঁহার আদেশ ও আদর্শকে অনুপ্রাণিত করা, ২. স্বাধীন বাংলা সম্পর্কে মানুষকে বুঝানো এবং স্বাধীনতা জিনিসটা কি তাহার মর্ম বুঝানো, ৩. মুক্তিবাহিনী গ্রামে আসিলে গ্রামের লোকজন যাহাতে সর্ব্ব প্রকার সাহায্য করে তাহা গ্রামের লোকজনকে বুঝানো, ৪. গ্রামে যাহাতে দালাল ও দুষ্কৃতিকারী থাকতে না পারে তাহার ব্যবস্থা করা এবং এই সম্পর্কে গ্রামবাসীকে সজাগ করাইয়া দেওয়া, ৫. গ্রামে পাঞ্জাবী আসিলে তাহাদের সহযোগিতা না করা, ৬. দেশীয় সম্পদ নষ্ট না করা, ৭. পশ্চিমা জিনিস বর্জন— এই সম্পর্কে মানুষকে বুঝানো, ৮. আমাদের অর্থনীতি গঠন করা এবং পশ্চিমাদের অর্থনীতি পঙ্গু করা, ৯. গ্রামে শান্তি স্থাপন করা।’

তারপর বলা হয়—‘আমরা B.F-এর আদেশে সর্বশক্তিমানের নামে শপথ নিয়াছি যে, আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে ও উদ্দেশ্যে অনুপ্রাণিত ও আগ্রান্বিত (আগ্রহান্বিত) হইয়া বাংলাদেশের প্রতি উদ্বেগী (উদ্যোগী) হইলাম এবং উপরিউক্ত শর্তগুলি মনেপ্রাণে গ্রহণ করিলাম।’ এই ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন সাজিদুর রহমান ভূঞা, মো. তাজুল ইসলাম, আলী নোয়াব খাঁ, মো. মোছলেহ উদ্দিন আহাম্মদ, আবদুস ছামাদ, আমির হোসেন ভূঞা, আপ্তাব মিয়া, ডা. ইয়াকুবুর রহমান ভূঞা, চুন্নু ভূঞা, আবদুল অদুদ ভূঞা, লুতু ভূঞা, আবদুস ছামাদ, তিতু কাজী—যারা গ্রামের বিশিষ্টজন। কিন্তু নেতৃত্বের মূল শক্তি ছিল তরুণরা।

এই গ্রামে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যাও ছিল অনেক। এখানে কমান্ডার ছিলেন মাহবুবুল আলম ভূঁইয়া (পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্রনেতা এবং আখাউড়া উপজেলা চেয়ারম্যান), আরো ছিলেন হাসন ভূঁইয়া, হেবজু মিয়া, রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, রুকনউদ্দিন ভূঁইয়া, অলিউর রহমান ভূঁইয়া, রফিকুল ইসলাম, জয়নাল আবেদিন, মুরাদ ভূঁইয়া, আনন্দ ভূঁইয়া, হান্নান ভূঁইয়া প্রমুখ।

কার্তিক মাসের দিকে ঘোলখার বাজারে রাজাকার আসে। সে বাজারের ব্যবসায়ী গোলাপ খাঁকে গ্রেফতার করে। একপর্যায়ে গ্রামের অবুঝ ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কামাল কাজীকে রাইফেল দিয়ে আঘাত করে। দোকানিদের জিনিসপত্র লুট করে অরাজকতা তৈরি করে। তখন মুক্তিবাহিনী ও পঞ্চায়েত কমিটির তরুণ সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে মেরে ফেলা হবে। কিন্তু পঞ্চায়েত কমিটির বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যরা বললেন, রাজাকারটিকে মেরে ফেললে পাকিস্তানি বাহিনী পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দেবে। তারচেয়ে বরং তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে গ্রামের বাইরে পার করিয়ে দেওয়া ভালো। পঞ্চায়েত কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডা. ইয়াকুবুর রহমান ভূঞা গ্রামের পুবদিকের সীমানা শোভার খাল পাড় করে দেওয়ার পর রাজাকারটিকে পথ দেখিয়ে চলে যেতে বলেন। সে কিছুদূর অগ্রসর হয়ে পাশের অন্য একটি বাড়িতে গিয়ে গৃহস্থের হাঁস-মোরগ জোর-জবরদস্তি করে হস্তগত করে। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। কিন্তু ইয়াকুব ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গে থাকায় তা পারছিল না। মূল সড়কের কাছে ফটিকের বাড়ির পুলের কাছাকাছি আসতেই সৈয়দ এমদাদুল বারীর ভাগনে-সহ ওত পেতে থাকা মুক্তিকামী তরুণরা তাকে গুলি করে হত্যা করে। সেটি ছিল রাণীখার গ্রামের সীমানা।

সন্ধ্যা হয় হয়। কারা যেন রাজাকারটির লাশটি ঘোলখার গ্রামের সীমানায় এনে ফেলে রাখে। আবার সেই ভয়। পাকিস্তানি বাহিনী যদি দেখে! পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দেবে। এই আশঙ্কায় সন্ধ্যার আঁধারে ডা. ইয়াকুবুর রহমান ভূঞা, পঞ্চায়েত কমিটির কয়েকজন, আশু কাজী, ইউনুসসহ কয়েকজন মিলে নৌকায় করে জিদ্দিনাগরের দিকে বোয়ালজুরের কাছে তিতাসে ভাসিয়ে দেন। লাশটিকে পানিতে নিক্ষেপের সময় প্যান্টের বেল্ট মনে করে তিনি যেই টান দেন, একটা ভীতিকর শব্দ হয়ে তাঁর হাতে উঠে আসে গুলির বেল্ট। কৌতূহলবশত এটি তিনি বাড়ি নিয়ে আসেন, কিন্তু পরে অনেকটা ভয়ে সবার অলক্ষে মাটিতে পুঁতে ফেলেন। বছর কয়েক আগে বাড়িতে ইমারত গড়তে গিয়ে মাটি খননের সময় গুলির বেল্টটি পাওয়া যায়।

মুক্তিযুদ্ধে আখাউড়া অঞ্চলে তত্পর ছিলেন কমান্ডার হাবিলদার আবদুল হালিম। একপর্যায়ে তিনি ডা. ইয়াকুবুর রহমান ভূঞাকে খবর দিয়ে নিয়ে যান পার্শ্ববর্তী গ্রাম মান্দারপুরে। চারগাছ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মান্নান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক ব্যক্তি। নির্দিষ্ট দিন তিনি মান্নান মাস্টারের বাড়িতে গিয়ে শুনলেন পাশের ঘরে বেদম প্রহারের শব্দ। তিনি ভয় পেয়ে যান। পরে তাঁর পরিচয় পেয়ে কমান্ডার আবদুল হালিম তাঁর বসার ব্যবস্থা করলেন। তখন তিনি আশ্বস্ত হন। পরে বুঝলেন মুক্তিবাহিনীর কয়েকজন সদস্যকে ভুলের জন্য তিনি শায়েস্তা করছিলেন। কমান্ডার হালিম বললেন, আপনার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমি শুনেছি। যারা ভারতে আসা-যাওয়া করছে আপনি তাদের সহায়তা করছেন। আপনার কাজে আমরা খুশি। এখন থেকে যোগাযোগ ও কাজের সুবিধার্থে ৫ জন ভিত্তি বাহিনী আপনার সঙ্গে কাজ করবে। পরবর্তীকালে তারা খবরা-খবর আনা নেওয়া করত। এভাবে পঞ্চায়েত কমিটি ও স্থানীয় মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে রচিত হয়েছিল শক্তিশালী যোগসূত্র। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছিলেন তিনি।

হাবিলদার আবদুল হালিম মুক্তিযুদ্ধে কসবা এলাকায় ২ ডিসেম্বর বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে পাকিস্তানিদের গুলিতে শহিদ হন। স্থানটি কসবা সদর উপজেলা থেকে আড়াই মাইল উত্তর-পূর্ব দিকে সীমান্তবর্তী একটি গ্রাম চকচন্দ্রপুরে। তাঁর বাড়ি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার চান্দ্র্রা ইউনিয়নের শকধি গ্রামে। (সূত্র : শামসুদ্দীন আহমদ, ‘একাত্তর আমাদের অহঙ্কার’, ২০১৪, ঢাকা, পৃ. ১২০-১২৪)। কমান্ডার হালিম যুদ্ধ করছিলেন ক্যাপ্টেন আইনুদ্দিনের অধীনে। তাঁর সম্পর্কে মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আইনুদ্দিন বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে আমি অনেকের সাথে কাজ করেছি, অনেক সাহসী মুক্তিযোদ্ধা দেখেছি কিন্তু হাবিলদার আবদুল হালিমের মতো এতো সাহসী মুক্তিযোদ্ধা আমি আর দেখেনি।’ (সূত্র : শাহজাহান সাজু, ‘মুক্তিযুদ্ধ এবং আশুগঞ্জ’, ঢাকা, ২০০৩, পৃ. ৪১৭)। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বীর বিক্রম খেতাব দেওয়া যায়।

মুক্তিযুদ্ধে বিলোনিয়া, শালদা নদী, আখাউড়া—এসব শব্দ গণমাধ্যমে, লোকমুখে বারবার উচ্চারিত হতো। আখাউড়ায়, গঙ্গাসাগরে হয়েছে তুমুল যুদ্ধ। উজানিসারে প্রতিনিয়ত হয়েছে গণহত্যা। সেই বিপদের দিনে, সংগ্রাম-সংঘর্ষের এত কাছে থেকেও গ্রামবাসী, বিশেষ করে ইয়াকুবুর রহমান ভূঞা এরকম প্রয়াস নিয়েছিলেন তা বিস্ময়কর।

এসব কর্মকাণ্ডের ফলে ডা. ইয়াকুবুর রহমান ভূঞা স্থানীয় শান্তি কমিটির কোপানলে পড়েন। ২১ নভেম্বর ১৯৭১-এ ধরখার ইউনিয়ন শান্তি কমিটির সীলমোহরযুক্ত ও কমিটি-প্রধানের স্বাক্ষরযুক্ত এক চিঠিতে বলা হয়, ‘ডা. ইয়াকুবুর রহমান ভূঞা, সাং ঘোলখার— সময় বেলা ১০টা, তন্তর অফিস— এতদ্বারা আপনাকে জানান যাইতেছে যে, উর্দ্ধতন অফিস হইতে আমার নিকট অভিযোগ আসিয়াছে যে আপনার নিকট হিন্দুর জাল আছে। এই নোটীশে আপনাকে জানান যাইতেছে যে আমার নোটীশ পাওয়া মাত্র লিখিতভাবে তাহার জবাব দিবেন এবং আমার অফিসে জাল ফেরত্ দিবেন। যদি জাল দিতে না পারেন তবে তাহার উপযুক্ত ব্যবস্থা হইবে। আগামী বৃহস্পতিবার দিন অবশ্যই অফিসে আসিয়া তাহার মীমাংশা করিয়া নিবেন।’ এ ছিল ছুঁতো মাত্র। কী করে তাঁকে ঘায়েল করা যাবে, কী করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কর্মতত্পরতা বন্ধ করা যাবে এই ছিল অপকৌশল। শান্তি কমিটির অফিসে যাওয়ার দিন সবাই কান্নায় ভেঙে পড়ে। কারণ ওখান থেকে ফিরে আসার সম্ভাবনা ছিল ক্ষীণ। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান সেদিন বাড়িতে না থাকায় তাঁকে নির্দিষ্ট অন্য একটি দিন আসতে বলা হয়। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর ৬ ডিসেম্বর আখাউড়া শত্রুমুক্ত হয়।

মুক্তিযুদ্ধে গ্রামীণ প্রতিরোধের অনন্য উদাহরণ ঘোলখার পঞ্চায়েত কমিটি। কমিটি কখন সভা করেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কত টাকা কোন খাতে খরচ হয়েছে, কখন কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ইত্যাদির বিবরণ রয়েছে কমিটির দলিলপত্রে। শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস যেসব অন্যায় ও নিপীড়ন হয়েছিল তারও বিচার করেছে কমিটি। এভাবে সেদিন সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিল। পঞ্চায়েত কমিটির সার্বিক কার্যক্রমের ৩১টি দলিল, শান্তি কমিটির সেই চিঠি দীর্ঘ চার দশক ধরে যক্ষের ধনের মতো সংরক্ষণ করেছেন ডা. ইয়াকুবুর রহমান ভূঞা; গুলির বেল্টটিও রেখেছেন সযত্নে। ১৩ ডিসেম্বর ২০১০-এ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ছিল এক অনাড়ম্বর মুক্তিযুদ্ধের স্মারক গ্রহণ অনুষ্ঠান। কবি আসাদ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহূত তাঁর নোটবুক, সাংবাদিক আবু সাঈদ খান একাত্তরে মুজিবনগর থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক উত্তাল পদ্মা’র কপি, শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর তাঁর অগ্রজ কবি সিকান্দার আবু জাফরের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে স্বকণ্ঠের আবৃত্তি ক্যাসেট এবং ডা. ইয়াকুবুর রহমান ভূঞা তাঁর এলাকার মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিজাগানিয়া মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, সেগুলো এখানেই সংরক্ষিত থাক—এই প্রত্যাশা থেকে তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সেদিন দলিলপত্র ও স্মারক প্রদান করেন। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের রক্তিম সূর্যের এও যেন একটি রশ্মি। সেই রশ্মি স্নাত করুক বাঙালির ইতিহাসকে, ঐতিহ্যকে।

 

লেখক :তরুণ মুক্তিযুদ্ধ গবেষক