মাইক্রোসফট অফিসের সেরা যত বিকল্প

মোজাহেদুল ইসলাম

 

মাইক্রোসফট অফিস হচ্ছে মাইক্রোসফটের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সবচেয়ে সফল প্রোডাক্টগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ওয়ার্ড ডকুমেন্ট তৈরি, পাওয়ারপয়েন্ট স্লাইড তৈরি কাজের জন্য মাইক্রোসফটের অফিস সুইট সবচেয়েকে জনপ্রিয় সল্যুশন। প্রোফেশনালিটির দিক থেকে মাইক্রোসফটের অফিস সুইটের থেকে ভালো আর কোনো সফটওয়্যার বা সফটওয়্যার ফ্যামিলি নেই। তবে মাইক্রোসফট অফিস তুলনামূলকভাবে একটু ভারী প্রোগ্রাম এবং লো অ্যান্ড পিসিতে এটি ভালোভাবে রান করে না।

এছাড়া বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাইক্রোসফট অফিস কিনে ব্যবহার করা একটু কষ্টকর এর দামের কারণে। তবে আপনি চাইলে মাইক্রোসফট অফিসের কিছু অলটারনেটিভ অফিস প্রোগ্রাম ব্যবহার করতে পারেন, যেগুলো মাইক্রোসফট অফিসের মতো এত ভালো না হলেও অফিস সুইটের সব ধরনের কাজ করে ফেলার জন্য যথেষ্ট ভালো এবং একই সঙ্গে মাইক্রোসফট অফিসের থেকে লাইটওয়েট এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফ্রি অথবা মাইক্রোসফট অফিসের থেকে অনেক অনেক কম দামের। আজকে মাইক্রোসফট অফিসের এমন পাঁচটি অলটারনেটিভ অ্যাপ/প্রোগ্রাম নিয়েই আলোচনা করব।

 

গুগল অফিস সুইট (Google Office Suite)

মাইক্রোসফট অফিসের বেস্ট অলটারনেটিভ বলতে গেলে এটাই। আপনি যদি অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন ইউজ করেন তাহলে অনেক ক্ষেত্রে গুগলের অফিস সুইট অ্যাপসগুলো আপনার জন্য মাইক্রোসফট অফিসের থেকে বেটারও হতে পারে। গুগলের ডক, শিটস এবং স্লাইডস এডিটরে আপনি হয়তো মাইক্রোসফট অফিসের মতো এত বেশি ফিচারস পাবেন না, তবে যতটুকু পাবেন তা আপনার প্রায় সব ধরনের অফিস সুইটসংক্রান্ত কাজ করে ফেলার জন্য যথেষ্ট। তবে গুগলের অফিস সুইটের সবচেয়ে হাইলাইটেড ফিচার হচ্ছে, এটি ক্লাউড বেজড এবং সম্পূর্ণ ফ্রি। আপনার একটি অ্যাক্টিভ ইন্টারনেট কানেকশন এবং একটি অ্যাক্টিভ গুগল অ্যাকাউন্ট থাকলেই আপনি গুগলের অফিস সুইটের সব প্রোডাক্ট ব্যবহার করতে পারবেন। এ ছাড়া ক্লাউড বেজড হওয়ায় আপনি পিসির যে কোনো মডার্ন ব্রাউজারের সাহায্যেই গুগলের অফিস সুইট অ্যাক্সেস করতে পারবেন।

এছাড়া গুগল অফিস সুইটে অ্যাক্সেস করার জন্য গুগলের নিজের তৈরি আলাদা আলাদা ডেডিকেটেড অ্যাপসও পাবেন আপনার স্মার্টফোনের জন্য, যাতে আপনি যে কোনো সময় আপনার ক্রিয়েট করা যে কোনো কনটেন্ট যে কোনো জায়গায় এডিট এবং রিড করতে পারেন। এছাড়া ক্লাউড বেজড হওয়ায় আপনার প্রত্যেকটি ডিভাইসের মধ্যে সিংক হবে আপনার কনটেন্টগুলো। আপনি আপনার তৈরি করা ডকস, স্লাইড এগুলো সবকিছু আপনার গুগল অ্যাকাউন্টে লগড ইন থাকা যে কোনো ডিভাইস থেকে অ্যাক্সেস করতে পারবেন। এছাড়া আপনি যে কোনো ডকস এবং অন্য যে কোনো কনটেন্টকে অফলাইন করেও রাখতে পারবেন, যাতে সেগুলো অ্যাক্সেস করার জন্য আপনার ইন্টারনেট কানেকশনের দরকার না পড়ে। এছাড়া আপনি চাইলে আগে থেকে ক্রিয়েট করে রাখা কোনো ডক ফাইল আপনার গুগল ড্রাইভে আপলোড করে সেটিকে এডিটও করতে পারবেন।

 

লিবার অফিস (Libre Office)

এই অফিস সফটওয়্যারটি একটি সম্পূর্ণ ফ্রি এবং অ্যাড-ফ্রি অফিস প্রোগ্রাম যেটি একই সঙ্গে ফিচারস এবং স্ট্যাবিলিটির দিক থেকে অনেক উন্নত। গুগল ডকের সঙ্গে এই অফিস সুইটটির পার্থক্য হচ্ছে, গুগল ডক শুধু একটি অনলাইন সার্ভিস এবং একটি ওয়েব অ্যাপলিকেশনের মতো কাজ করে। সেখানে LibreOffice হচ্ছে মাইক্রোসফট অফিসের মতো একটি ফুল ফিচারড ডেস্কটপ অ্যাপ যেটি আপনি আপনার পিসিতে ন্যাটিভলি একটি অফিস প্রোগ্রাম হিসেবে ইনস্টল করতে পারবেন এবং ব্যবহার করতে পারবেন। এই LibreOffice সম্পূর্ণ ফ্রি এবং ওপেন-সোর্স একটি প্রোগ্রাম। আপনি যদি লিনাক্স ইউজার হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার জন্য একমাত্র চয়েজ হচ্ছে LibreOffice যদি আপনি একটি অফলাইন ফুল ফিচারড অফিস সুইট এক্সপেরিয়েন্স উপভোগ করতে চান।

 

ডব্লিউপিএস  অফিস (WPS Office)

মাইক্রোসফট অফিসের অলটারনেটিভ হিসেবে এটি অনেক বিখ্যাত এবং মোটামোটি জনপ্রিয় একটি অফিস প্রোগ্রাম। মাইক্রোসফট অফিসের সবচেয়ে কাছাকাছি এক্সপেরিয়েন্স পেতে চাইলে এই অফিস প্রোগ্রামটিই আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো হবে। এছাড়া এই অফিস প্রোগ্রামটি ক্রস প্ল্যাটফরম। এর অর্থ এই প্রোগ্রামটি আপনি উইন্ডোজ পিসি/ল্যাপটপ, ম্যাকবুক, আইফোন/আইপ্যাড, অ্যান্ড্রয়েড ট্যাবলেট, লিনাক্স সব জায়গায় ব্যবহার করতে পারবেন। এই WPS অফিস অ্যাপটির ইউজার ইন্টারফেস প্রায় মাইক্রোসফট অফিসের নতুন ভার্শনগুলোর মতোই কালারফুল এবং স্টাইলিশ। এছাড়া যেমনটা আগেরগুলোর ক্ষেত্রেও বলেছি, আপনার অফিস সুইটের সব ধরনের চাহিদা এই লিস্টের যে কোনো প্রোগ্রামই ভালোভাবেই পূরণ করতে পারবে।

তবে WPS অফিসে আপনি কিছু এক্সট্রা ফিচারসও পাবেন, যেমন—পিডিএফ ক্রিয়েটর, ডক-পিডিএফ কনভার্টার ইত্যাদি। এছাড়া ওয়ার্ড এডিটর, প্রেজেন্টেশন ক্রয়েটর, স্প্রেডশিট ক্রিয়েটর এগুলো তো আছেই। তবে WPS অফিসের সবচেয়ে বড়ো অসুবিধাটি হচ্ছে, অ্যাডস। হ্যাঁ, এই প্রোগ্রামটি অ্যাডফ্রি নয়। তবে আপনি যদি ২৫ ডলার প্রতি বছর হিসেবে এটির প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন নেন, তাহলে আপনি এসব অ্যাডস থেকে মুক্তি পাবেন। এছাড়া আরো এক্সট্রা অনেক ফিচার, যেমন—ক্লাউড স্টোরেজ, ক্লাউড সিংক, একসঙ্গে ৯ টি ডিভাইস সিংক করার সুবিধা এবং এই ধরনের আরো এক্সট্রা সুবিধা পাবেন। আর হ্যাঁ, এই সম্পূর্ণ অফিস সুইটটি মাইক্রোসফট অফিসের থেকে অনেক লাইটওয়েট।

 

মাইক্রোসফট অফিস অনলাইন (Microsoft Office Online)

নাম শুনেই বুঝতে পারছেন যে এটা মাইক্রোসফট অফিসেরই একটি অনলাইন ভার্শন। এটাকে গুগলের অফিস সুইটের মতোই বলতে পারেন, তবে পার্থক্য হচ্ছে ওটা গুগলের তৈরি এবং এটা মাইক্রোসফট অফিসের নির্মাতা মাইক্রোসফটেরই তৈরি। আরেকটি পার্থক্য হচ্ছে মাইক্রোসফট অফিস অনলাইনে আপনি গুগল ডকসের থেকে অনেক ফিচারস বেশি পাবেন এবং এমনকি ফুল ফিচারড মাইক্রোসফট অফিসের প্রায় সব ফিচারসই আপনি মাইক্রোসফট অফিস অনলাইনে পাবেন। আরেকটি পার্থক্য হচ্ছে, মাইক্রোসফট অফিসের ফুল ফিচারড ডেস্কটপ প্রোগ্রামটি লিগ্যালি ব্যবহার করতে চাইলে আপনাকে সাবস্ক্রিপশন কিনতে হবে, যেখানে মাইক্রোসফট অফিস অনলাইন বিনা মূল্যে ব্যবহার করা যাবে।

মাইক্রোসফট অফিস অনলাইন ব্যবহার করতে হলে আপনার জাস্ট দরকার হবে একটি মডার্ন ওয়েব ব্রাউজার যেমন গুগল ক্রোম বা ফায়ারফক্স বা মাইক্রোসফট এজ এবং একটি অ্যাক্টিভ মাইক্রোসফট অ্যাকাউন্ট। তাহলেই আপনি মাইক্রোসফট অফিস অনলাইন ব্যবহার করে আপনার প্রায় সব অফিস সুইটের কাজ করে ফেলতে পারবেন। আপনি যদি মাইক্রোসফট অফিসের পারমানেন্ট ইউজার হয়ে থাকেন এবং মাইক্রোসফটের ইকোসিস্টেমের অনেকটা ভেতরে থাকেন, তাহলে আপনার জন্য মাইক্রোসফট অফিস অনলাইন ব্যবহার করাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হবে। এছাড়া গুগল ডকসের মতো আপনি ওয়ানড্রাইভে যে কোনো ডক ফাইল আপলোড করে সেটিকেও এডিট করতে পারবেন এর সাহায্যে। এছাড়া আপনি আপনার স্মার্টফোনেও মাইক্রোসফটের অফিস অ্যাপ্লিকেশনগুলো ডাউনলোড করে আপনার অফিস কনটেন্টগুলো অ্যাক্সেস করতে পারবেন।

 

ড্রপবক্স পেপার (Dropbox Paper)

এই লিস্টের এটা একটু ব্যাতিক্রমধর্মী অফিস প্রোগ্রাম। সম্পূর্ণ অফিস প্রোগ্রাম বললে ভুল হবে, এটা জাস্ট একটি ওয়ার্ড এডিটর বা ডক প্রোগ্রাম। নাম শুনেই নিশ্চই বুঝতে পারছেন, এটি বিখ্যাত ক্লাউড স্টোরেজ প্রোভাইডার ড্রপবক্সের তৈরি একটি প্রোগ্রাম। আর হ্যাঁ, এটিও একটি ক্লাউড বেজড সার্ভিস, কোনো ফুল ফিচারড ডেস্কটপ প্রোগ্রাম নয়। এটিকে অ্যাক্সেস করতে হলেও দরকার হবে একটি মডার্ন ওয়েব ব্রাউজার এবং একটি ড্রপবক্স অ্যাকাউন্ট। এই প্রোগ্রামটি মূলত কোলাবোরেশন টাইপের কাজের জন্য তৈরি করা।

আপনি যদি আপনার টিমমেটদের সঙ্গে কোনো ধরনের প্রোজেক্টের অন্তর্ভুক্ত থাকেন এবং সেই কারণে কয়েকজন মিলে একসঙ্গে একটি ওয়ার্ড ডক টাইপ করার দরকার পড়ে, সেক্ষেত্রে এই প্রোগ্রামটি কাজে দিতে পারেন আপনার। ড্রপবক্স পেপার ব্যবহার করে আপনি এবং আরো কয়েকজন ইউজার মিলে কোলাবোরেশনের মাধ্যমে একটি ওয়ার্ড ডকে কাজ করার সুবিধা পাবেন। এটা খুব কাজের কোন জিনিস নয়, তবে অনেক সময় কাজে দিতে পারে।